গন্ডামারার পথে ঈদ: স্মৃতির ঝাঁপি

অলংকরণ: মাসুক হেলাল

সারা বছরের ব্যস্ততা ভুলে পুরো পরিবারের এক হওয়ার উপলক্ষ যেন ঈদ। কাজ, পড়াশোনা, শহরের কোলাহল—সব পেছনে ফেলে একসঙ্গে গ্রামের পথে যাত্রা। রুপালি ইলিশখ্যাত তিন নদীর মোহনার পাড়ে চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলার গন্ডামারা গ্রামে মিলিত হয় সবাই। চাচাতো–ফুফাতো ভাইবোন, চাচা–চাচি, ফুফুরা—সবাই মিলে যেন এক অন্য রকম উৎসব। ঈদের ছুটির আগেই সবাই পরিকল্পনা করে রেখেছিল কবে গ্রামে যাওয়া হবে। ফুয়াদ, ইরফান, নজরুল আর মেহেরাব কয়েক দিন ধরেই গ্রামে যাওয়ার উত্তেজনায় ছিল। সদরঘাটের লঞ্চঘাটে পৌঁছানোর আগের রাতেও ওরা ফোনে কথা বলছিল, পরিকল্পনা করছিল গ্রামে গিয়ে কী কী করবে। সকালে বাসা থেকে বেরিয়ে যখন লঞ্চঘাটে পৌঁছাল, তখন পুরো সদরঘাট যেন এক বিশাল জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। চারদিকে মানুষের ব্যস্ততা, হকারদের হাঁকডাক ও লঞ্চের সাইরেনের শব্দ মিলিয়ে এক অন্য রকম উৎসবের পরিবেশ।

লঞ্চ ছাড়তেই পদ্মা–মেঘনার বাতাস গায়ে এসে লাগল। ফুয়াদ আর ইরফান রেলিং ধরে নদীর ঢেউ দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। ওরা দুজনই গ্রামের পরিবেশের জন্য উন্মুখ হয়ে ছিল। অন্যদিকে নজরুল যথারীতি ফোনে ডুবে ছিল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঈদ নিয়ে মজার পোস্ট দিতে ব্যস্ত। মেহেরাব ওর ফোন কেড়ে নিতে গেলে শুরু হলো ধাক্কাধাক্কি, নজরুল চিৎকার দিয়ে উঠল, ‘এই! ঈদের দিনেই আমাকে কাঁদাবি নাকি?’ ইরফান হেসে বলল, ‘ঈদের দিন নয়, এখনো এক দিন বাকি!’ চারপাশের যাত্রীরাও ওদের মজার কথাবার্তা শুনে হাসছিল।

চাঁদপুর পৌঁছানোর পর সিএনজিচালিত অটোরিকশায় হাইমচর হয়ে গন্ডামারা গ্রামে পৌঁছাতেই শুরু হলো আসল আনন্দ। গ্রামের মাটির সোঁদা গন্ধ, বাতাসে ধানখেতের দোলানো শিষ, বাড়ির উঠানে গাছের ছায়া—সবকিছু একসঙ্গে মিলিয়ে যেন এক স্বর্গীয় অনুভূতি। চাচা–চাচিরা আদর করে বুকে টেনে নিল। ফুফুরা বলল, ‘এবার একটু মিষ্টি করো দেখি!’ আর ভাইবোনেরা শুরু করল পুরোনো দিনের গল্প আর নতুন দুষ্টুমি।

চাঁদরাতের আগের দিন সবাই মিলে ইফতার করল, তারপর বাজারে বেরোল। ইরফান আর মেহেরাব মাংসের দরদামে এমন লাগল যে দোকানদারও হাসতে লাগল। মেহেরাব বলল, ‘ভাই, এই মাংস এক কেজি বলছ, কিন্তু আমরা তো দেখছি ৯০০ গ্রাম!’ দোকানদার হেসে বলল, ‘ঈদের দিন ছাড় দিছি, নেন, আর ১০০ গ্রাম দিয়ে দিলাম!’ এভাবে দরদাম করতে করতেই বাজারে সময় কাটিয়ে দিল ওরা।

সকালে ঈদের নামাজ শেষে পুরো গ্রামে উৎসবের আমেজ। সবাই কোলাকুলি করে, মিষ্টি বিনিময় হয়। ঠিক তখনই নজরুলের ফোন হাত থেকে পড়ে স্ক্রিন ফেটে গেল। মুহূর্তেই ওর মুখটা মলিন হয়ে গেল। ফুয়াদ হেসে বলল, ‘এবার ঈদটা মাটি!’ ইরফান বলল, ‘না ভাই, এবার আসল ঈদ শুরু হবে!’ দুপুরে স্কুলের মাঠে ফুটবল খেলায় ইরফান দুর্দান্ত গোল দিল, কিন্তু নজরুল আর মেহেরাব ধাক্কাধাক্কিতে গড়িয়ে পড়ল। খেলার মাঠে গ্রামের ছেলেরাও যোগ দিল, একেবারে প্রতিযোগিতার মতো খেলা শুরু হলো।

বিকেলে সবাই মিলে নদীর পাড়ে ঘুরতে গেল। ছোটরা নদীতে পা ভিজিয়ে দিল, কেউবা কাঠের নৌকায় চড়ে হালকা দুলুনি খেল। গ্রামের প্রবীণেরা বসে গল্প করছিল, একসময়ের নদীর বিশালতা আর ইলিশের সুদিনের কথা বলছিল। ফুয়াদ, ইরফান, নজরুল আর মেহেরাব নদীর পাড়ে বসে সূর্যাস্ত দেখছিল, চারপাশে শান্ত বাতাস বইছিল। এ যেন প্রকৃতির এক বিশাল উপহার!

রাতের খাবার শেষে নজরুল বলল, ‘হাওলাদার বাজারের দই না খেলে কি ঈদ জমে?’ সবাই একসঙ্গে অটোরিকশায় চড়ে বেরিয়ে পড়ল। বাজারে গিয়ে এক হাঁড়ি দই সাবাড় করল ওরা। দইয়ের স্বাদ ছিল এতটাই অসাধারণ যে সবাই মুগ্ধ হয়ে গেল। এদিকে বাড়িতে সবাই খোঁজাখুঁজি শুরু করে দিয়েছে! ফিরেই চাচুর ধমক, ‘তোমরা গেলে কোথায়?’

অলংকরণ: মাসুক হেলাল

নজরুল মুচকি হেসে বলল, ‘ঈদ মানে খুশি, ঈদ মানে দই! এ জন্যই গিয়েছিলাম।’

সারা দিনের আনন্দ শেষে রাতের আকাশের নিচে সবাই একসঙ্গে বসে গল্প করছিল। গ্রামের বাতাসে অন্য রকম প্রশান্তি। ছেলেবেলার স্মৃতিচারণা, পুরোনো গল্প আর হাসাহাসির মধ্যেই রাত গভীর হতে লাগল। ঈদ কেবল একটা দিন নয়, এ যেন এক আবেগ, ভালোবাসা আর পরিবারের সঙ্গে কাটানো অমূল্য মুহূর্তের নাম। গ্রামের আকাশে তারা ঝলমল করছিল, দূর থেকে ভেসে আসছিল বাঁশির সুর। এই ঈদ, এই মুহূর্ত, এই ভালোবাসাই সারা জীবন মনে থাকবে ওদের।

*লেখক: শিক্ষার্থী, কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ মিডিয়া কমিউনিকেশন অ্যান্ড জার্নালিজম ডিপার্টমেন্ট

‘নাগরিক সংবাদ’-এ নানা সমস্যা, জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]