ব্যতিক্রমী একুশের আয়োজন
প্রতিবারের মতো এবারও অমর একুশে ফেব্রুয়ারি ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদ্যাপনের লক্ষ্যে জাতীয় শহীদ মিনারে নানা আয়োজন নিয়ে হাজির হয়েছেন চারুকলা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিল্পী, শিল্প-শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীরা। আয়োজনের অংশ হিসেবে তাঁরা আলপনা এঁকেছেন মিনারের বেদি ও আশপাশের সংযোগ সড়কগুলোতে। তবে এবারের আয়োজন ছিল কিছুটা ব্যতিক্রমী। যেমন এবারের রং নির্বাচনে দেখা গেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। অন্যান্যবারের মতো এবারের নির্বাচিত মোটিফগুলো ছিল—বেদিতে বৃত্তাকার এবং সড়কে সর্পিলাকার। বেদি ও সড়কে যেই মোটিফ অঙ্কিত হয় সেগুলো সাধারণত ফুল, পাতা, জ্যামিতিক আকৃতি ইত্যাদির সংমিশ্রণে আঁকা হয়। এবারও তার পুনরাবৃত্তি দেখা গেছে। তবে রং নির্বাচনে এবার পরিবর্তন দেখা গেছে। বিগত বছরগুলোতে আলপনাগুলো হতো রঙিন; লাল, নীল, হলুদ, সবুজ, কমলা, আকাশি, বেগুনি ইত্যাদি রঙে ফুটে উঠত আলপনার মোটিফগুলো। সাদা বহিঃপার্শ্বরেখার ভেতরে রং দিয়ে ভরাট করে মোটিফগুলোকে রাঙিয়ে তুলতেন শিক্ষার্থীরা। তবে এবার আর সেই সাতরঙা রঙিন আমেজটি দেখা যায়নি। এবারের আলপনার রং ছিল মূলত তিনটি—সাদা বহিঃপার্শ্বরেখার মোটিফের ভেতরে লাল এবং কালো।
২১ ফেব্রুয়ারি মূলত বসন্তের কোলে লালিত ঐতিহাসিক একটি দিন। বসন্তে চারদিকে নানা ফুল ফোটে। রঙে রঙে রঙিন হয়ে ওঠে চারদিক। ফুলের রংকে বিভিন্ন পৃষ্ঠতলে এনে আলপনা এঁকে পরিবেশের মধ্যে নান্দনিক ছন্দ তৈরি করে ঐতিহাসিক এই দিনটিকে সুশোভিত করার যে প্রয়াস, তা বাঙালি সংস্কৃতির নিজস্ব আচার। বসন্তের আমেজের মাঝেও রক্ত ঝরার যে শোক বাঙালির অস্তিত্বে মিশে গেছে, তারই প্রতীকী রূপ শহীদ মিনারের এই সামষ্টিক শিল্পপ্রয়াস। এবারের আলপনার রং কেন এমন জিজ্ঞেস করতেই দায়িত্বরত একজন শিল্পী জবাব দিলেন, ‘২৪–এর থিমকে সাপোর্ট করেই এবার রং মূলত সাদা-কালো-লাল।’ ’৫২–র ভাষা আন্দোলনের যেই স্পিরিট বা মেজাজ তা ’২৪–এর গণ–অভ্যুত্থানে আবার ফিরে এসেছে। ছাত্রদের বুক থেকে যে রক্ত ঝরেছে তাকে শ্রদ্ধা জানাতে এবং সেই ধারণা লালন করতেই এবার লাল, সাদা এবং কালো এই তিনটি রং নির্বাচন করেছে কর্তৃপক্ষ।
এবারের আয়োজনে ব্যতিক্রমী আরও যে অনুষঙ্গ যুক্ত হয়েছে, তা হলো শহীদ মিনারের ঠিক বিপরীতে শহীদ মিনার আবাসিক এলাকার দেয়ালে দেয়ালিকা অঙ্কিত হয়নি। অন্যান্যবার এই দেয়ালের দক্ষিণ পাশে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উক্তি লিখে থাকেন প্রবীণ শিল্পীরা। যেমন শিল্পী শিশির ভট্টাচার্য প্রতিবছর এই দেয়ালে শুধু লাল ও কালো রেখায় লিখতেন ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’ নামক বিখ্যাত লাইনটি। কিন্তু এবার সেই দেয়ালিকা অঙ্কিত হয়নি। এর মূল কারণ হিসেবে রয়েছে ’২৪–এর গণ-অভ্যুত্থানের অঙ্কিত দেয়ালিকা ও গ্রাফিতি। ভাষা আন্দোলনকে উৎসর্গ করে আঁকা দেয়ালিকার ওপর গণ-অভ্যুত্থানের গ্রাফিতি এঁকেছেন শিক্ষার্থীরা। সেই গ্রাফিতি মুছে এবার আর নতুন দেয়ালিকা আঁকা হয়নি। বরং দেয়ালের ওপর পোস্টারের আদলে সেসব উক্তির সন্নিবেশ করা হয়েছে।
শহীদ মিনার আবাসিক এলাকার দেয়ালে দেয়ালিকা অঙ্কন না করার সিদ্ধান্তের প্রতি চারুকলা অনুষদের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। অনেকেই এ বিষয়টি নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট করেছেন। তরীকুল ইসলাম সৈকত নামের একজন প্রাক্তন শিক্ষার্থী লিখেছেন, ‘এবার নাকি শহীদ মিনারে দেয়ালচিত্র করে নাই চারুকলার শিক্ষার্থীরা। অথচ জুলাই অভ্যুত্থানে দেয়ালচিত্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।’ এই সিদ্ধান্তের ব্যাপারে জানার জন্য জিজ্ঞেস করলে চারুকলার ডিন অধ্যাপক আজহার ইসলাম চঞ্চল বলেন, ‘২৪–এর আন্দোলনের গ্রাফিতি না মুছে আমরা নতুনভাবে দেয়ালিকা আকারে ব্যানার ও পোস্টার সন্নিবেশিত করেছি। তবে এতে কোনোভাবে ’৫২–কে অবমাননা করা হয়নি। ’৫২ আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ আন্দোলন। ’৫২ না হলে ’৭১ হতো না, ’৭১ না হলে ’২৪ হতো না।’
*লেখক: নূরুল আম্বিয়া চৌধুরী, প্রাক্তন শিক্ষার্থী, চারুকলা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
নাগরিক সংবাদ-এ জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]