বিলাসিতা বনাম চা–শ্রমিকের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতি

ছবি: লেখক

চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠতে উঠতে কখনো–বা প্রিয়জনের সঙ্গে সময় কাটানো, কখনো–বা রাজনৈতিক আলাপ—সবই আজ আমাদের সংস্কৃতির অংশ। প্রচণ্ড গরমেও চা পান না করলে অনেকের চলেই না। চা পানেও লেগেছে আভিজাত্যের ছোঁয়া। নামীদামি রেস্তোরাঁয় পাওয়া যাচ্ছে হরেক রকমের চা, দামও তার আকাশচুম্বী। যে চা দিয়ে আমরা আভিজাত্যের সংস্কৃতি পালন করি, কখনো কি চিন্তা করে দেখেছি, সেই চা–শ্রমিকদের জীবনযাপন কেমন? তাঁরা নিজেরা নিজেদের সংস্কৃতি পালন করতে পারেন কি না?

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীরা সেটা জানার আগ্রহ থেকেই পাড়ি দিয়েছেন প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দূরে, সঙ্গে ছিলেন সম্মানিত শিক্ষকেরা। ‘দ্য সোশ্যাল লেন্স’ টিমের ১৪ সদস্য কাজ করেছেন উপমহাদেশের প্রাচীনতম মালনীছড়া চা–বাগানে, জানার চেষ্টা করেছেন চা–শ্রমিকের জীবন ও সংস্কৃতি। আমরা জেনেছি, তাঁদের অনুভূতি ও প্রত্যাশার কথা। বইয়ের তাত্ত্বিক জ্ঞানের বাইরে আমরা শিখেছি, বাস্তবিক অভিজ্ঞতা। আমাদের ছোট এই গবেষণা হয়তো তাঁদের জীবনে খুব একটা পরিবর্তন আনতে সম্ভব হবে না, কিন্তু আমরা তাঁদের এটা অনুভব করানোর চেষ্টা করেছি যে বাংলাদেশের কোনো না কোনো প্রান্তের মানুষ তাঁদের নিয়ে ভাবে, তাঁদের জীবনমান উন্নত করতে ও তাঁদের সংস্কৃতি–ঐতিহ্য বজায় রাখতে আওয়াজ তোলে।

চা–শ্রমিকদের মধ্যে বহুত্ববাদী ধর্মীয় পরিবেশ বিদ্যমান। হিন্দু শ্রমিকেরা যেখানে পালন করেন তাঁদের হিন্দুধর্মীয় উৎসব, যেমন দুর্গাপূজা, শ্যামাপূজা, সরস্বতীপূজাসহ অন্য উৎসব, তেমনি মুসলিম শ্রমিকেরা পালন করেন ঈদ। ধর্মীয় উৎসব পালনের পাশাপাশি সিলেটে চা–শ্রমিকের নিজস্ব সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত ঝুমুর নাচ বা ঝুমুর গান। সাধারণত করম পূজাকে কেন্দ্র করে ঝুমুর নাচ ও গান হয়। চা–শ্রমিকেরা নিজেদের সম্পত্তি রক্ষার জন্য এই পূজার আয়োজন করে থাকেন। চা–শ্রমিকেরা বিয়েতেও ঝুমুর গানের আয়োজন করে থাকেন। বিয়েতে তাঁরা পালন করেন ‘পান–সুপারি’ রীতি নামে একটা সংস্কৃতি, যেখানে বিয়ের প্রস্তাব চূড়ান্ত করতে পান–সুপারি দেওয়া হয়। তা ছাড়া পালিত হয় ‘কন্যমূল্য’ নামে এক রীতি, যেখানে বরপক্ষ কন্যাপক্ষকে পোশাক, অলংকার ও প্রয়োজনীয় জিনিস প্রদান করে, যা আমাদের প্রচলিত যৌতুক প্রথার বিপরীত। চা–শ্রমিকেরা জানান, তাঁরা ‘মরা মৌসুমে’ (শুষ্ক বা কাজের চাপ কম থাকে, এমন মৌসুমে) তাঁদের অনুষ্ঠান বেশি পালন করেন। চা–শ্রমিকদের আছে আবার নিজস্ব ভাষা। পঞ্চাশোর্ধ্ব এক নারী চা–শ্রমিক জানান, তিনি ও তাঁর পরিবার ছিল নেপালে, কথা বলতেন গোড়কা ভাষায়। এ ছাড়া অন্য শ্রমিকেরা কথা বলেন সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায়।

প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছি, তাঁরা চান পরবর্তী প্রজন্মে তাঁদের সংস্কৃতি বজায় থাকুক। তাই বিয়েও হয় নিজেদের গোত্রের মধ্যে। তবে চা–শ্রমিকদের সংস্কৃতিতে লেগেছে সূক্ষ্ম আধুনিকতার ছোঁয়া। চা–বাগানগুলোয় পর্যটকের আগমন, সঙ্গে পারস্পরিক কথাবার্তা থেকে ভাষায় এসেছে পরিবর্তন। শুদ্ধ বাংলা বলার পাশাপাশি অনেকে কথা বলতে পারেন টুকটাক ইংরেজিতেও। মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারে তরুণ প্রজন্ম জানতে পারে অন্যদের সংস্কৃতি সম্পর্কে, এমনকি অন্য গোত্রে বিয়ে করার প্রবণতা বাড়ছে, তাই ঘটছে সংস্কৃতির সংমিশ্রণ। তবে তাঁরা বলছেন, তাঁদের সংস্কৃতি বিলুপ্তির প্রধান কারণ সংস্কৃতির সংমিশ্রণ নয়; বরং দারিদ্র্য। কাজের ভরা মৌসুমে সুযোগ হয় না তাঁদের উৎসব পালনের। দিনরাত কাজ করলেও সেই পরিমাণ অর্থ পান না, ছুটি হয় না তাঁদের নিজেদের উৎসব পালনে। যেখানে তিনবেলা খেয়ে জীবনযাপন করা কষ্ট, সেখানে উৎসব পালন তো বিলাসিতা। বিয়েতেও থাকে না তেমন আয়োজন, ডাল, ভাত ও সবজির মতো সাধারণ খাবারের আয়োজন হয়। আবার ভালো খাবারের আয়োজন করতে হলেও নিতে হয় ঋণ। সন্তানদের উচ্চশিক্ষিত করা তো দূরে থাক, কোনোভাবে প্রাথমিক শিক্ষাও সম্পন্ন করতে পারেন না। বাড়তি উপার্জনের উদ্দেশ্যে পরিবারের সব সদস্য মিলে চা–বাগানে কাজ করেন। কিছু তরুণ চা–শ্রমিক নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের আশা দেখেন। তাঁর সন্তানদের চা–বাগানে আনেন না। স্বপ্ন দেখেন, সন্তান হবে বড় কোনো অফিসার। কিন্তু আর্থিক সংকটের টানাপোড়েনে তাঁদের স্বপ্ন কখন চুরমার হয়ে যায়, সে ভয়ে ক্ষীণ হয়ে থাকে হৃদয়। আমাদের একাডেমিক কাজের অংশ হিসেবে করা এই গবেষণাপত্র পত্রিকায় প্রকাশ করার অন্যতম উদ্দেশ্য চা–শ্রমিকদের সংস্কৃতি, অধিকার ও জীবনমান উন্নয়নে সবাইকে সচেতন করে তোলা।

শুধু আর্থিক সংকটের কারণ চা–শ্রমিকদের অলিখিত ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ভাষা হারিয়ে না যাক। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে আমাদের করা ছোট এ গবেষণায় হয়তো তাঁদের জীবনের সবদিক তুলে ধরা সম্ভব হয়নি। তবে আমরা চাইলে চা–শ্রমিকের স্বপ্ন পূরণের সঙ্গী হতে পারি। আসুন, সবাই মিলে চা–শ্রমিকের অধিকার আদায়, সংস্কৃতি সংরক্ষণ ও জীবনমান উন্নয়নে আওয়াজ তুলি।

*লেখক: নুসরাত সুলতানা, শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]