ট্রফি তাদের, উৎসব আমাদের

প্রথম আলো ফাইল ছবি

ফুটবল বিশ্বকাপ কেবল একটি সাধারণ ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; এটি পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের আবেগ, স্বপ্ন, আনন্দ ও ভালোবাসার এক বিশ্বজনীন মহামিলন। চার বছর পরপর যখন বিশ্বকাপের উদ্বোধনী বাঁশি বাজে, তখন গোটা পৃথিবী যেন থমকে দাঁড়ায় একটি বলের দিকে তাকিয়ে। আর এই উন্মাদনার ঢেউ যখন বাংলাদেশের সীমানায় এসে আছড়ে পড়ে, তখন গ্রাম থেকে শহর, অলিগলি থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস—সবখানেই শুরু হয় এক ভিন্নমাত্রার উৎসব। যদিও বাংলাদেশ এখনো ফুটবল বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি, তবু বিশ্বকাপকে ঘিরে এ দেশের মানুষের যে আবেগ, যে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস, তা বিশ্বের অনেক অংশগ্রহণকারী দেশের জন্মগত সমর্থকদের আবেগকেও হার মানায়। আমরা মাঠে নেই, কিন্তু গ্যালারির উত্তাপ, আমাদের হৃদয়ের স্পন্দন আর উন্মাদনা প্রমাণ করে ট্রফিটা হয়তো তাদের, কিন্তু উৎসবটা একান্তই আমাদের।

বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশের আকাশে-বাতাসে যেন রঙের মেলা বসে। দিগন্তজুড়ে উড়তে থাকে বিভিন্ন দেশের পতাকা। কেউ মনে-প্রাণে সমর্থন করেন লাতিন আমেরিকার ফুটবল জাদুকর ব্রাজিলকে, কেউবা মেতে ওঠেন আর্জেন্টিনার নান্দনিকতায়। আবার কারও–বা পছন্দ ইউরোপিয়ান পরাশক্তি জার্মানি, ফ্রান্স কিংবা স্পেন। খেলা শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকেই চায়ের দোকান, পাড়ার মোড়, বাজার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় শুরু হয়ে যায় তুমুল তর্ক-বিতর্ক। কে সেরা—পেলে না ম্যারাডোনা, মেসি না নেইমার? এসব বিতর্কে কখনো থাকে ধারালো যুক্তি, আবার কখনো থাকে নিখাদ অন্ধ আবেগ। কিন্তু এটাই তো ফুটবলের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য! এটি নানা মতের নানা পথের মানুষকে একসুতায় গাঁথে, আবার ভিন্ন মতের মধ্যেও বন্ধুত্বের এক অদৃশ্য বন্ধন অটুট রাখে।

তবে বিশ্বকাপের এই নির্মল আনন্দ ও উৎসবের ডামাডোলের মধ্যেও আমাদের সমাজের কিছু রূঢ় বাস্তবতা লুকিয়ে আছে, যা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। অতীতে বহুবার দেখা গেছে, সমর্থকদের মধ্যে শুরু হওয়া নিরীহ তর্ক বা বিরোধ কখনো কখনো রীতিমতো সহিংস সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। কে কার চেয়ে বড় পতাকা টাঙাবে, কার প্রিয় দলকে কে কটূক্তি করল এসব তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করে মারামারি, রক্তপাত ও গুরুতর আইনি জটিলতার ঘটনাও ঘটেছে অহরহ। অথচ খেলার মূল শিক্ষাই হলো সহনশীলতা, সৌহার্দ্য, শৃঙ্খলা ও পারস্পরিক সম্মানবোধ। একটি ভিনদেশি দলের জয় বা পরাজয় কখনো নিজের দেশের, নিজের পাড়ার মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করার বা আইন হাতে তুলে নেওয়ার কারণ হতে পারে না।

একজন আইনের শিক্ষার্থী ও সচেতন নাগরিক হিসেবে আমি মনে করি, এসব বিষয়ে আমাদের আইনি দৃষ্টিভঙ্গি ও আইনের শাসন সম্পর্কে আরও বেশি সচেতন হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের আইন এ বিষয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ছড়ানো, সহিংসতায় উসকানি দেওয়া, কিংবা দাঙ্গা ও জনশৃঙ্খলা বিনষ্ট করার মতো কাজ করলে প্রচলিত ফৌজদারি আইনের (Penal Code) আওতায় কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। বিশেষ করে দণ্ডবিধির ১৪১ ধারা অনুযায়ী, বেআইনি সমাবেশ বা জনশান্তি বিঘ্নিত করার মতো অপরাধের শাস্তি নির্ধারিত রয়েছে। এ ছাড়া বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিপক্ষ দলের সমর্থকদের আক্রমণ করে যেসব কুরুচিপূর্ণ ট্রল বা সাইবার বুলিং করা হয়, তা অনেক ক্ষেত্রেই তথ্যপ্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তা আইনের অধীনে অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। আবেগের বশবর্তী হয়ে অনলাইনে করা একটি দায়িত্বহীন মন্তব্য বা মানহানিকর পোস্ট একজন তরুণের জন্য মারাত্মক আইনি ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটিত এসব অপরাধের ক্ষেত্রে সাক্ষ্য আইনের (Evidence Act) আওতায় ডিজিটাল প্রমাণাদিও এখন আদালতে গ্রহণযোগ্য। তাই বিশ্বকাপের আনন্দ উপভোগ করতে গিয়ে ‘মব জাস্টিস’ বা উচ্ছৃঙ্খলতাকে প্রশ্রয় দেওয়া চলবে না; আইনের সীমারেখা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের কথা সর্বদা মনে রাখতে হবে। ফৌজদারি কার্যবিধি (Code of Criminal Procedure) অনুযায়ী, পুলিশ প্রশাসন যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে আগাম ব্যবস্থাও নিতে পারে, তবে সবার আগে প্রয়োজন আমাদের নিজস্ব মানসিকতার পরিবর্তন।

বিশ্বকাপ আমাদের শুধু বিনোদনই দেয় না, আমাদের আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়, স্বপ্ন দেখতে শেখায়। আমরা যখন টেলিভিশনের পর্দায় বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের শৈল্পিক নৈপুণ্য দেখি, তাঁদের দেশের জাতীয় সংগীত বাজার সময় খেলোয়াড়দের চোখের জল দেখি, তখন নিজেদের অজান্তেই মনের গভীরে একটি প্রশ্ন তীব্রভাবে জেগে ওঠে, কবে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকাও বিশ্বকাপের ওই সবুজগালিচায় সগৌরবে উড়বে? কবে আমরা অন্য দেশের বদলে নিজেদের দেশের জার্সি গায়ে জড়িয়ে গলা ফাটাব?

এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথটি কঠিন, তবে অসম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন একটি সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা। তৃণমূল পর্যায়ে খেলাধুলার প্রকৃত উন্নয়ন, মানসম্মত ফুটবল একাডেমি তৈরি, আধুনিক প্রশিক্ষণব্যবস্থার প্রসার এবং সবচেয়ে জরুরি হলো—ক্রীড়া প্রশাসনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা। আফ্রিকা বা এশিয়ার অনেক ছোট দেশ যদি যুগান্তকারী পরিবর্তন এনে বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে পারে, তবে আমরা কেন পারব না? কেবল বিদেশি দলের অন্ধ সমর্থক হয়ে থাকলে চলবে না, নিজেদের ফুটবলের কাঠামোগত উন্নয়নের দাবিও আমাদের জোরালোভাবে তুলতে হবে।

ফুটবল বিশ্বকাপের এক মাস বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে যে ঐক্য, উচ্ছ্বাস ও প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যায়, তা সত্যিই এক অনন্য সামাজিক চিত্র। রাত জেগে দল বেঁধে খেলা দেখা, প্রতিটি গোলের পর পাড়াজুড়ে উল্লাস, পরদিন সকালে বন্ধুদের সঙ্গে খেলার চুলচেরা বিশ্লেষণ, প্রিয় দলের জয়ে আনন্দমিছিল কিংবা অপ্রত্যাশিত পরাজয়ে নীরব দীর্ঘশ্বাস—সবকিছু মিলিয়ে বিশ্বকাপ হয়ে ওঠে আমাদের জীবনের এক স্মরণীয় ও রোমাঞ্চকর অধ্যায়। এই সময়টাতে ধনী-দরিদ্র, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সব ভেদাভেদ ভুলে মানুষ শুধু এক কাতারে এসে দাঁড়ায়।

শেষ পর্যন্ত, বিশ্বকাপের প্রকৃত বিজয়ী কোনো একক দেশ বা দল নয়; বিজয়ী হলো স্পোর্টসম্যানশিপ, মানবিকতা, বন্ধুত্ব ও খেলাধুলার চিরায়ত চেতনা। ফুটবল আমাদের শেখায়, হার-জিত জীবনেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। আজ যে দল পরাজিত হয়ে কাঁদছে, আগামী দিন হয়তো তারাই বিজয়ের মুকুট পরবে। তাই বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের বিভেদ, বিদ্বেষ বা সহিংসতা নয়; বরং সম্প্রীতি, সহনশীলতা ও সৌহার্দ্যের এক সুন্দর সংস্কৃতি গড়ে তোলাই হওয়া উচিত আমাদের প্রধান লক্ষ্য। কারণ, নব্বই মিনিট বা একশ কুড়ি মিনিটের একটি শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচ একসময় রেফারির বাঁশিতে শেষ হয়ে যায়, মেগা ইভেন্টের পর্দা নেমে আসে; কিন্তু মানুষের প্রতি মানুষের সম্মান, ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্ববোধ ও মানবিক মূল্যবোধ চিরকাল বেঁচে থাকে। আসুন, ট্রফির লড়াইটা তাদের হাতেই ছেড়ে দিই, আর আমরা উপভোগ করি এক নির্মল ও ঐক্যবদ্ধ উৎসব।

লেখক: মো. বাইজিদ শেখ, শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]