আলোচনা সভা: পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি প্রবল
পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সামাজিক স্বীকৃতি নেই। পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি প্রবল। শ্রম আইনে তাঁদের স্বীকৃতি নেই। তাঁদের পর্যাপ্ত সুরক্ষাসামগ্রী সরবরাহ করতে হবে। এর পাশাপাশি শোভন কর্মপরিবেশ, মর্যাদা ও সম্মানজনক মজুরি নিশ্চিতকরণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দায়িত্বশীল হতে হবে।
‘পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কাজের নিশ্চয়তা, মজুরিবৈষম্য ও সামাজিক মর্যাদা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব পরামর্শ দেন আলোচকেরা।
নাগরিক উদ্যোগ ও বাংলাদেশ স্যানিটেশন ওয়ার্কার্স ফোরাম যৌথভাবে এই আলোচনা সভার আয়োজন করে। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর সিরডাপের শামসুল হক মিলনায়তনে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। নাগরিক উদ্যোগের এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে ছিলেন শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ।
নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন।
সভায় লালমনিরহাট, মৌলভীবাজার, খুলনা এবং ভোলা জেলায় পরিচালিত গবেষণাকর্মের ফলাফল উপস্থাপন করেন ফারহান হোসেন। গবেষণাকর্মে মোট ১৬৬ জন (পুরুষ ৯১, নারী ৭৫) স্যানিটেশন কর্মীর কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। প্রতিবেদনে জেলাভিত্তিক পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের মজুরি, জীবনমান, কর্মপরিস্থিতি, কাজের ধরন এবং চুক্তির কাঠামো, সুরক্ষামূলক সরঞ্জাম, মজুরি ও জাতীয় গড় আয়ের তুলনা, স্বাস্থ্যসেবা, উৎসব ও অবসরকালীন ভাতা, বাসস্থান, জীবনযাত্রার খরচ, আয়বৈষম্য, স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়গুলো উঠে আসে।
গবেষণায় সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের পর্যাপ্ত সুরক্ষাসামগ্রী সরবরাহ, বেতন ও মর্যাদা বৃদ্ধি, দলিত কলোনিতে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র স্থাপন, স্বাস্থ্যবিমা চালু, আউটসোর্সিং বন্ধ, বর্জ্য অপসারণে আধুনিকায়নের সুপারিশ তুলে ধরা হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমাদের সবাইকে ঔপনিবেশিক ধারণা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। শ্রম সংস্কার কমিশন তার জায়গা থেকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব ও আন্তরিকতার সঙ্গে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সংশ্লিষ্ট দাবি ও সুপারিশ বিবেচনা করবে। একই সঙ্গে তাঁদের জায়গা থেকে যৌক্তিক ও ন্যায্য দাবি আদায়ে মাঠের আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। আশা করছি, পরিচ্ছন্নতাকর্মী তথা দলিত-হরিজনদের প্রতি বিদ্যমান বৈষম্য ও বঞ্চনার অবসান হবে।’
সেফটি অ্যান্ড রাইটস সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক সেকেন্দার আলী মিনা বলেন, পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি প্রবল। তাঁদের পর্যাপ্ত সুরক্ষাসামগ্রী সরবরাহের পাশাপাশি শোভন কর্মপরিবেশ, মর্যাদা ও সম্মানজনক মজুরি নিশ্চিতকরণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অধিকতর দায়িত্বশীল হতে হবে।
বেসরকারি সংগঠন ব্লাস্টের পরিচালক (লিগ্যাল) মো. বরকত আলী বলেন, পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সামাজিক স্বীকৃতি নেই। পুনর্বাসন ছাড়া তাঁদের উচ্ছেদ করা যাবে না। চলতি বেতন স্কেলের ২০তম গ্রেডে ৮,২৫০/- মূল বেতন, আনুষঙ্গিক মিলে প্রায় ২০ হাজার টাকা পান একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। অথচ পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা যে নামমাত্র মজুরি বা বেতন পান, তাঁর সঙ্গে এটির আকাশ-পাতাল তফাত। সরকারি আইনগত সহায়তা সংস্থার মাধ্যমে তাঁদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা যেতে পারে।
বাংলাদেশ হরিজন ঐক্য পরিষদের সভাপতি কৃষ্ণা লাল বলেন, ‘আমরা এখনো অনেকটা দাস হিসেবে আছি। পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে নিযুক্ত করলেও আমাদের দিয়ে কুলির কাজও করানো হয়।’
ওয়াটার এইড বাংলাদেশের প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর (ইউনিভার্সাল অ্যাকসেস) মো. মামুন চৌধুরী বলেন, ‘নারী পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কর্মপরিবেশ ও স্বাস্থ্যসুরক্ষা নিয়েও আমরা কাজ করছি, যেটি আরও গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা উচিত। তাদের সর্বস্তরে অভিগম্যতা নিশ্চিত করতে হবে।’
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতার আলোকে তাঁদের বঞ্চনা ও অবহেলা প্রত্যক্ষ করেছি। অদূর ভবিষ্যতে চলমান সমস্যাগুলোর সমাধান করা হবে। প্রথমত “ক্লিনার”, পরে “পরিচ্ছন্নতাকর্মী” হিসেবে উল্লেখ করে তাঁদের মর্যাদা নিশ্চিতের চেষ্টা করা হয়েছে।’
সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সভাপতি রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, শ্রম আইনে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা অনুপস্থিত, স্বীকৃতিহীন। দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা ও প্রজনন স্বাস্থ্যের বিষয়টিও আলোচনায় আনতে হবে।
পরিচ্ছন্নতাকর্মী প্রতিনিধিদের মধ্যে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ স্যানিটেশন ওয়ার্কার্স ফোরামের সমন্বয়কারী গগন লাল, বাংলাদেশ দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠী অধিকার আন্দোলনের (বিডিইআরএম) সাধারণ সম্পাদক শিপন কুমার রবিদাস, লালমনিরহাটের ঘুগলু বাবু বাঁশফোর, খুলনার কার্তিক রাম রাউত, ভোলার স্বপন কুমার দে, মৌলভীবাজারের ধ্রুব বাঁশফোর, ঢাকার পঙ্কজ বাঁশফোর।