এবার বিশ্বকাপ কি লাতিন আমেরিকায় যাচ্ছে

বিশ্বকাপের দুই ফেবারিট দল ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনাইনস্টাগ্রাম

বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাস বলে, প্রতিটি আসরেরই একটি নিজস্ব গল্প থাকে। কোথাও ইউরোপের আধিপত্য, কোথাও লাতিন আমেরিকার শৈল্পিক ও ছন্দময় ফুটবলের জয়গান। ২০২৬ বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের শুরুতেই যে চিত্র ফুটে উঠছে, তা নতুন করে একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে—এবারও কী বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি লাতিন আমেরিকাতেই ফিরবে?

ফুটবল কেবল পরিসংখ্যানের খেলা নয়; এটি আত্মবিশ্বাস, ঐতিহ্য, ছন্দ ও মুহূর্তকে কাজে লাগানোর শিল্প। তবু পরিসংখ্যান ভবিষ্যতের সম্ভাবনা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়। এবারের বিশ্বকাপে রাউন্ড অব ৩২-এ অংশ নেওয়া লাতিন আমেরিকার ছয়টি দলের মধ্যে পাঁচটিই পরবর্তী ধাপে জায়গা করে নিয়েছে। অংশগ্রহণের তুলনায় এই সাফল্যের হার ইউরোপের তুলনায়ও বেশি। এটি নিছক কাকতালীয় নয়; বরং লাতিন আমেরিকার ফুটবলের গভীরতা ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতারই প্রতিফলন।

বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি জার্মানিও এবার নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। টানা দুই ম্যাচে তারা লাতিন আমেরিকার প্রতিপক্ষের কাছে পরাজিত হয়েছে। একসময় ইউরোপীয় শক্তির প্রতীক হিসেবে পরিচিত দলগুলোর বিপক্ষে লাতিন আমেরিকার এই ধারাবাহিক সাফল্য বিশ্বফুটবলের শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে।

এদিকে ব্রাজিল ও প্যারাগুয়ে ইতিমধ্যে রাউন্ড অব ১৬-এ নিজেদের জায়গা নিশ্চিত করেছে। বিশেষ করে ব্রাজিল ধীরে ধীরে তাদের চিরচেনা ছন্দে ফিরছে। ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের গতি, মাতেউস কুনিয়ার আক্রমণাত্মক দক্ষতা এবং দলের সামগ্রিক ভারসাম্য ব্রাজিলকে আবারও শিরোপার অন্যতম দাবিদারে পরিণত করেছে। অন্যদিকে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা অভিজ্ঞতা, কৌশল ও মানসিক দৃঢ়তায় এখনো বিশ্বের সবচেয়ে পরিণত দলগুলোর একটি। লিওনেল মেসির নেতৃত্ব ও প্রভাব এখনো প্রতিপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ফুটবলের জাদুকর ইতিমধ্যে একটা হ্যাটট্রিকসহ সর্বোচ্চ গোলদাতা।

ইতিহাসও লাতিন আমেরিকার পক্ষে কথা বলে। ১৯৮৬ সালে মেক্সিকোর মাটিতে দিয়েগো ম্যারাডোনার জাদুকরি নৈপুণ্যে আর্জেন্টিনা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। ১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে শিরোপা জিতেছিল ব্রাজিল। এবারের বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা। বাস্তবতা হলো, আয়োজক তিন দেশের কোনোটিই শিরোপার প্রধান দাবিদার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না। ফলে উত্তর আমেরিকার মাটিতে ইতিহাস যেন আবারও লাতিন আমেরিকার পক্ষে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মাঠের পরিচিতি। লিওনেল মেসি দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাব ফুটবলে খেলছেন। সেখানকার আবহাওয়া, স্টেডিয়াম ও দর্শক-সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর পরিচিতি আর্জেন্টিনার জন্য মানসিক সুবিধা তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে ব্রাজিলও নতুন প্রজন্মের প্রতিভাবান ফুটবলারদের নিয়ে আত্মবিশ্বাসী এক দল হিসেবে নিজেদের পুনর্গঠন সম্পন্ন করেছে।

কেউ কেউ বলছে এবার কাপ যাবে ইউরোপে। কারণ, ফ্রান্স খুব ভালো খেলছে। কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে অসাধারণ খেলছে। তাদের টিমের প্রায় প্রতিটি প্লেয়ার ছন্দে আছে। যতটুকু বিশ্বকাপের খেলা মাঠে গড়িয়েছে তার মধ্যে সবদিক বিবেচনায় ফ্রান্স সবচেয়ে এগিয়ে। স্পেনও ভালো খেলে শিরোপার দাবি জোরালো করেছে। অবশ্য অন্যতম শিরোপার দাবিদার জার্মানি ও নেদারল্যান্ডস ইতিমধ্যে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছে। তাই বিশ্বকাপ কখনোই কেবল সম্ভাবনার সমীকরণে সীমাবদ্ধ থাকে না। একটি ভুল, একটি অসাধারণ গোল কিংবা একটি অনুপ্রেরণাদায়ী পারফরম্যান্স মুহূর্তেই সব হিসাব বদলে দিতে পারে।

তাই এখনই নিশ্চিত করে বলা যাবে না যে ট্রফি লাতিন আমেরিকাতেই যাচ্ছে। কিন্তু এটুকু বলা যায়—বর্তমান পারফরম্যান্স, ইতিহাস, আত্মবিশ্বাস এবং ফুটবলীয় শক্তির বিচারে ২০২৬ বিশ্বকাপে লাতিন আমেরিকার সম্ভাবনা সবচেয়ে উজ্জ্বল। শেষ পর্যন্ত ট্রফি আর্জেন্টিনার হাতে উঠবে, নাকি ব্রাজিলের—তার উত্তর দেবে সময়। তবে বিশ্ব ফুটবলের বাতাস যে এখন লাতিন আমেরিকার দিকেই বইছে, সেই বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ খুব কম।

লেখক: খালিদ ফেরদৌস, শিক্ষক ও সহকারী প্রক্টর, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]