কাঁঠাল নিয়ে মজার স্মৃতি

কাঁঠাল আমার খুব প্রিয় ফল। শুধু প্রিয় ফল বললে ভুল হবে—কাঁঠাল যেন আমার জীবনের সঙ্গেই মিশে আছে। ছোটবেলা থেকে কাঁঠালের প্রাচুর্যের মধ্যেই বড় হয়েছি। কখনো নিজের বাড়ির গাছের কাঁঠাল, কখনো আবার নানাবাড়ির উঠানজোড়া কাঁঠালগাছ।

শুরু করি নানাবাড়ির গল্প দিয়ে।

আমার নানাজান ছিলেন এলাকার প্রভাবশালী মানুষ। তাঁর বাড়িটি ছিল টিনের তৈরি। সামনে লম্বা বারান্দা, বারান্দার খোপে খোপে শত শত কবুতর। নানিজান খুব শখ করে কবুতর পুষতেন। কবুতরের খাবারের জন্য মাটির বড় বড় মটকিতে ধান জমিয়ে রাখা হতো। নানাজানের মতো এত বড় টিনের বাড়ি আশপাশে আর কারও ছিল না।

সেই বাড়ির সামনেই ছিল এক বিশাল কাঁঠালগাছ। গাছজুড়ে ঝুলে থাকত অগণিত কাঁঠাল। মানুষ দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে দেখত—একটা গাছে এত কাঁঠাল হয় কীভাবে! শুধু এই গাছই নয়, আরও অনেক কাঁঠালগাছ ছিল। তাই নানাবাড়ি গেলে কাঁঠাল খাওয়ার কোনো সীমা থাকত না।

হয়তো সেই ছোটবেলার অফুরন্ত কাঁঠালই আমাকে আজীবনের কাঁঠালপ্রেমী বানিয়ে দিয়েছে।

নানাবাড়ি না গেলেও নানাজান নৌকা ভর্তি করে কাঁঠাল পাঠাতেন। নদীর ঘাট থেকে মাথায় করে কাঁঠাল বাসায় আনার আনন্দ আজও ভুলতে পারিনি। মা তখন সেই কাঁঠালের একটা বড় অংশ আত্মীয়স্বজন আর প্রতিবেশীদের মধ্যে বিলিয়ে দিতেন। কারণ, কাঁঠাল পাকা শুরু করলে আর সময় নেয় না, দ্রুত খেতে হয়।

আমার কাঁঠালপ্রীতি দেখে একদিন বড় ভাই সিদ্ধান্ত নিলেন পরীক্ষা করবেন—আমি এক বসায় কত কোয়া কাঁঠাল খেতে পারি। কয়েকটা কাঁঠাল সামনে এনে বসিয়ে দেওয়া হলো।

সেদিন আমি ৬৪ কোয়া কাঁঠাল খেয়েছিলাম!

সবাই অবাক হয়ে গিয়েছিল। তখন বয়স কম, খাওয়ার ক্ষমতাও ছিল প্রচুর। কিন্তু আফসোসের বিষয়, এত খেয়েও শরীরে তার কোনো প্রভাব পড়ত না। ছিলাম একেবারে শুকনো-লিকলিকে। মনে হতো, আর একটু স্বাস্থ্যবান হলে কত ভালো হতো!

আমাদের বাড়ির সামনের কাঁঠালগাছের কাঁঠালগুলো ছিল অসাধারণ মিষ্টি। পেকে গেলে কাঁঠাল পাড়া হতো। কখনো পাখিরা আগেভাগে একটু খেয়ে যেত, কখনো পাড়তে গিয়ে নিচে পড়ে ফেটে যেত। ছড়িয়ে পড়া কোয়াগুলো আমরা কুড়িয়ে কুড়িয়ে খেতাম। সেসবের স্বাদ যেন আজও জিবে লেগে আছে।

গ্রামে তখন প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই কাঁঠালগাছ ছিল। আব্বা ধানখেতের মাঝে উঁচু করে বাড়ি করেছিলেন। পাশে চাচাদের বাড়ি। চারদিকে কাঁঠালের সমারোহ।

আমি, রাজীব, মনির, লোকমান আর রানা—আমাদের ছিল এক গোপন মিশন। রাতের আঁধারে কাঁঠাল চুরি!

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

চুরি করা কাঁঠাল আমরা বসার ঘরের টিনের নিচের পার্টিশনের ওপর লুকিয়ে রাখতাম। তারপর প্রতিদিন গোসলের আগে গিয়ে দেখতাম কোনটা পাকল। যে কাঁঠাল পাকত, সেটাই আমাদের সকালের উৎসব।

মুড়ি আর কাঁঠাল ছিল সেই উৎসবের প্রধান আয়োজন। সাম চাচার দোকান থেকে মুড়ি কিনতাম। মাঝেমধ্যে তাঁকেও কাঁঠাল খেতে দিতাম। মসজিদের সামনের পুকুরঘাট ছিল আমাদের আড্ডার কেন্দ্র।

বিভিন্ন জাতের কাঁঠাল—কোনোটার কোয়া শক্ত, কোনোটার নরম।

চাচিরা মাঝেমধ্যে অভিযোগ করতেন, ‘কারা যেন আমার কাঁঠাল চুরি করে!’

আমরা খুব গম্ভীর মুখে বলতাম, ‘চাচি, দেশে চোরে ভরে গেছে। শেষ পর্যন্ত কাঁঠালও রেহাই পাচ্ছে না!’

চাচি মৃদু হেসে চলে যেতেন।

এভাবে কতশত কাঁঠাল যে খেয়েছি, তার হিসাব নেই। টাকার হিসাবে মূল্য হয়তো খুব বেশি ছিল না, কিন্তু আনন্দের হিসাবে ছিল অমূল্য।

একবার সিকদার চাচার বাড়ি থেকে কাঁঠাল আনতে গিয়ে মনির কুকুরের ধাওয়া খেয়েছিল। আরেকবার একজনের পা কেটে গিয়েছিল। তখন এসব ঘটনাও ছিল রোমাঞ্চের অংশ।

গত বছর গ্রামে গিয়ে যাদের কাঁঠাল চুরি করে খেয়েছি, তাদের কাছে মাফ চেয়েছিলাম।

এক চাচি হেসে বললেন, ‘তোমাদের বলতে হবে না। আমরা অনেক আগেই বুঝেছিলাম কাজটা তোমরাই করো। খাবার জিনিস খেয়েছ, মাফ চাইতে হবে না।’

এই সরলতা, এই উদারতা আজকাল কোথায় পাওয়া যায়?

তাঁরা জানতেন, তবু কিছু বলেননি। এখন ভাবলে বুঝি, তাঁদের মন কত বড় ছিল।

এরপর বিয়ে করলাম।

সমস্যা হলো, আমার স্ত্রী কাঁঠাল খেত না। পরে মেয়েও কাঁঠাল খেতে চাইত না। তার অভিযোগ—কাঁঠালের কোয়া নাকি গলায় আটকে যায়!

আমি পড়লাম মহা বিপদে।

কাঁঠাল নিয়ে বাসায় ফিরলেই স্ত্রীর মুখ এমন হয়ে যেত, যেন আমি কোনো বড় বিপদ ডেকে এনেছি। কিন্তু ধীরে ধীরে এক-দুই কোয়া করে খাওয়াতে খাওয়াতে তাকেও কাঁঠালপ্রেমী বানিয়ে ফেললাম।

এখন সে দিব্যি কাঁঠাল খায়।

মেয়েরও আর গলায় আটকে যায় না।

মৌসুম এলে প্রায় প্রতিদিন অফিস থেকে ফেরার পথে কাঁঠাল নিয়ে বাসায় ফিরি। অনেক সময় স্যুট-টাই পরা অবস্থায় হাতে বা কাঁধে কাঁঠাল নিয়ে হাঁটতে হয়। মানুষ দেখে মুচকি হাসে।

তাতে কি!

আমার কাঁঠাল চাই-ই।

মেয়ে আদর করে আমার নাম দিয়েছে—‘কাঁঠাল বাবা’।

তবে কাঁঠাল খাওয়ার পর যে আঠালো ময়লা তৈরি হয়, সেটা নিয়ে স্ত্রীর অভিযোগের শেষ নেই। শেষ পর্যন্ত সেই পরিষ্কারের দায়িত্বও আমার কাঁধেই পড়ে।

কাঁঠালের সঙ্গে একটি দুঃখের স্মৃতিও জড়িয়ে আছে।

কাঁঠালের বিচির ভর্তা আমাদের খুব প্রিয় ছিল। কিন্তু একবার মা বেশি খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। সেই ঘটনার কথা মনে পড়লে আজও মন খারাপ হয়ে যায়।

বাজারে যত নতুন ফলই আসুক, কাঁঠালের জায়গা কেউ নিতে পারবে না।

আমি একজন কাঁঠালপ্রেমী মানুষ।

কাঁঠাল আর আমি—দুজন যেন বহুদিনের সাথি। বয়স বেড়েছে, সময় বদলেছে, মানুষ বদলেছে; কিন্তু কাঁঠালের প্রতি আমার ভালোবাসা আজও ঠিক আগের মতোই রয়ে গেছে।

গ্রীষ্মের দুপুরে পাকা কাঁঠালের গন্ধ পেলেই আমি আজও ফিরে যাই সেই হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোতে—নানাবাড়ির উঠানে, পুকুরঘাটের আড্ডায়, আর রাতের অন্ধকারে বন্ধুদের সঙ্গে কাঁঠাল চুরির সেই সীমাহীন আনন্দে।

* মুনালয়, গ্রাম-দক্ষিণ নাজিরপুর, ডাক ও থানা-বানারীপাড়া, বরিশাল-৮৫৩০