default-image

হাসপাতালে ভর্তির হওয়ার পর থেকে প্রায় দিনই সহকর্মীদের সঙ্গে কথা হয়, উনি এখন কেমন আছেন? অনেক দিন তো হাসপাতালে থাকলেন। মৃত্যুর দিন দুপুরের দিকে অফিসের নিচে দেখা আবুল হাসনাত, শেখ তানভীর সোহেল ও নাইর ইকবাল ভাইয়ের সঙ্গে। তানভীর সোহেল ভাই মিজান ভাইকে রক্ত দেওয়ার জন্য গিয়েছিলেন। আমার সঙ্গে থাকা এক ভাই তানভীর ভাইয়ের কাছে জানতে চাইলেন, ‘মিজান ভাই এখন কেমন আছেন?’ উত্তরে তিনি বললেন, ‘বেশি ভালো না।’ তখন আমি বললাম, ‘তাহলে ওনার পরিস্থিত নিয়ে এটা নিউজ করে দিলে মনে হয় ভালো হবে।’ আবুল হাসনাত ভাই বললেন, ‘হু। সেটা দেওয়া উচিত। কথা বলে দেখতেছি।’

তারপর আমরা দুজন চলে গেলাম চায়ের দোকানে। মিজানুর রহমানের সম্পর্কে টুকটাক আলোচনা। অফিসে শেষ লালবাগের বাসায় পৌঁছামাত্রই জানতে পারলাম, তিনি আর নেই। খবরটা একেবারে অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল। এর মধ্যে ফেসবুকে ছেয়ে গেছে তাঁর মৃত্যুর খবর।

মিজান ভাই আমাদের দেখা সেরা এক মানুষ। সারাক্ষণ যাঁকে দেখেছি পড়াশোনা করতে, কাজের মধ্যে ডু্বে থাকতে। ওনার সঙ্গে আমার পরিচয়টা বেশ পুরোনো।

বিজ্ঞাপন

সালটা হবে ২০০৫-এর শেষের দিকে। তখন বন্ধুসভায় কাজ করতাম। অনেক অনুষ্ঠানে বন্ধুদের অনুপ্রেরণার জন্য বক্তব্য দিতেন। একবার গাজীপুরের অবস্থিত ঢাকা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (ডুয়েট) বন্ধুসভার অনুষ্ঠানে মিজান ভাই সপরিবার গেলেন। তখন শাদমান, আফসারা ও আনান অনেক ছোট। ভাবি কোলে করে নিয়ে গিয়েছিলেন ছোট্ট আনানকে। সেখানে তিনি প্রাণবন্ত ও সাহসী লম্বা বক্তব্য দিলেন, যা বন্ধুদের অনেক অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।

বিনয়ী, সৎ, নিষ্ঠাবান মিজান ভাইয়ের সঙ্গে আরও কয়েক জায়গায় যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। সম্ভবত ২০০৭ সালের শেষের দিকে হবে। সিডরে দক্ষিণাঞ্চল বিধ্বংস। আমি তখন সিডরে কাজ করতাম ঝালকাঠি, পিরোজপুর, খুলনার কয়রা, গলাচিপা, চরফ্যাশন, পটুয়াখালীসহ উপকূল অঞ্চলে। পটুয়াখালীর পাতাবুনিয়া বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের ছাত্রীনিবাসের কাজ পুরোপুরি শেষ হলে ঢাকায় ফিরে আসি। ঢাকায় এসে জানলাম, আবারও যেতে হবে ছাত্রীনিবাসটা উদ্বোধন করার জন্য। মিজানুর রহমান খান ভাই সেটা উদ্বোধন করবেন। আমি যেহেতু কাজটার সঙ্গে পুরোপুরি ছিলাম তাই মিজান ভাইয়ের সঙ্গে আমাকেই পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

পটুয়াখালী লঞ্চে করে যাব। মিজান ভাই, আমি আর তাঁর বড় ছেলে শাদমান। লঞ্চের মধ্যে মিজান ভাইয়ের হাতে পুরোনো একটা ইংরেজি বই। বইয়ের নামটা ভুলে গেছি।

default-image

বিষয়বস্তু ছিল বাকেরগঞ্জের ইতিহাস নিয়ে। বরিশাল অঞ্চলটার নাম যে বাকেরগঞ্জ, সেটা সেদিন প্রথম জানলাম। বইটা আমিও একটু পড়ে দেখালাম। অন্ধকার রাতে লঞ্চ ছুটছে আর আমার চোখে মিজান ভাইয়ের আলোই জ্বলছে। জানতে পারছি অনেক অজানা তথ্য। মিজান ভাইকে এক ফাঁকে বলে ফেললাম, ‘আপনি কীভাবে সাংবাদিকতায় এলেন?’ উনি বলেছিলেন, বরিশালে যখন ‘দৈনিক বিপ্লবী বাংলাদেশ’, ‘দক্ষিণাঞ্চল’ পত্রিকা বের হয়, সেখানে তিনি লেখা শুরু করেন। এভাবে ‘দৈনিক খবর’, ‘বাংলাবাজার’, ‘নিউ নেশন’, ‘মানবজমিন’, ‘মুক্তকণ্ঠ’, ‘যুগান্তর’, ‘সমকাল’...তারপর প্রথম আলোসহ নানা পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেন। আশ্চর্য হয়েছিলাম যখন জানতে পারি, তিনি বরিশালের একটি কলেজে হিসাববিজ্ঞানে পড়াশোনা করেছেন। অথচ, আইন ও সংবিধানের একজন তুখোড় বিশেষজ্ঞ। হয়তো প্রচণ্ড আগ্রহের কারণে তাঁর এই পাণ্ডিত্য অর্জন সম্ভব হয়েছে।

রাত গভীর হতে লাগল। লঞ্চও চলছে গন্তব্যে। আমাদের কথাও শেষ হচ্ছে না। একটার পর একটা কথা চলতে থাকে। এখন স্মৃতি ঝাপসা হয়ে গেছে। সেই দিন তিনি ল্যাপটপে দেখান বিদেশে অংশ নেওয়া বহু সেমিনারের ছবি। দেখতে দেখতে লঞ্চ পৌঁছায় পটুয়াখালীতে। তারপর আমাদের প্রথম আলোর প্রতিনিধি শংকরদা আমাদের স্পিডবোটে করে নিয়ে যান সেই ছাত্রীনিবাসে। সেখানে অনেক মানুষের ভিড়। মিজান ভাই উদ্বোধন করলেন। কাজ শেষ করে আবার ফিরে এলাম। শীতের সময় ছিল। উনি বাসায় গিয়ে আমার খোঁজ নিলেন, আমি ঠিকমতো আমার বাসায় পৌঁছেছি কি না? এমন বেশ কিছু স্মৃতি জড়িয়ে আছে তাঁর সঙ্গে।

আরেকটা ঘটনা বলি, ‘দ্য লাস্ট রাজা অব ওয়েস্ট পাকিস্তান’ বইয়ের সহলেখক হিসেবে কাজ করেছিলাম একসময়। রাজা ত্রিদিব রায়ের জীবনীমূলক বই। বইটির মূল লেখক লন্ডনের প্রিয়জিৎ সরকার দেব। বাংলাদেশের অংশটা আমি করতাম। তখন রাজা সম্পর্কে নানা তথ্য সংগ্রহের কাজ করছি। একদিন জানতে পারি, রাজা ত্রিদিবের একমাত্র সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মিজানুর রহমান খান ভাই। শুনে বেশ উচ্ছ্বসিত হয়ে গেলাম। ওনার কাছে গিয়ে বলি ত্রিদিব রায়ের কথা। উনি বলেন, একটা সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছিলেন। তারিখটা ঠিক মনে করতে পারছিলেন না। আমার মোবাইল নম্বরটা নিলেন। তারপর তিনি নিজেই খুঁজে বের করে আমাকে জানিয়ে ছিলেন। সেদিনও খুব অবাক হয়েছিলাম।

বিজ্ঞাপন

চলাফেরায় দেখা হতো । টুকটাক কথাবার্তা হতো। কোনো কোনো উৎসবে বা আয়োজনে এক ফাঁকে ছবিও তোলো হতো। আর কোনো দিন সেটা হবে না। ছবি হয়ে তিনি আমাদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন আজীবন। তিনি সব সময় ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করতেন। মানুষকে সম্মান দেওয়া ছিল তাঁর অনেক গুণের মধ্যে একটি। তাই হয়তো আজ আমরা তাঁর মৃত্যুতে শোকাহত, তাঁকে সম্মানিত করার জন্য ব্যাকুল।

মৃত্যুর দিন দুপুরে আবুল হাসনাত ভাই বলেছিলেন, নিউজটা করার ব্যাপারে কথা বলবেন। সত্যি, সত্যি তাঁকে নিয়ে যে পত্রিকার পাতা ভরে নিউজ করতে হবে, সেটা কি তিনি জানতেন!

পরম শ্রদ্ধা, ভালোবাসায় আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন শ্রদ্ধেয় মিজান ভাই।

*লেখক: আবু সাঈদ, টিম লিডার, ডিজিটাল কনটেন্ট ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, প্রথম আলো; যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, প্রথম আলো বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদ

মন্তব্য করুন