default-image

আবির বিছানা ছেড়ে উঠে জানালায় গিয়ে দাঁড়ায়। জানালা থেকে চাঁদ দেখা যায়। চাঁদের দিকে সে হাত বাড়ায়। আজকের চাঁদটাকে খুব কাছেই মনে হয়। এই তো হাত বাড়ালেই ছুঁতে পারবে। একদম হাতের মুঠোয়। চাঁদকে স্পর্শ করার ব্যর্থ চেষ্টা করে সে। চাঁদ শত শত মাইল দূরে থেকে তাকিয়ে তার কাণ্ড দেখে। একদম স্থির হয়ে। কোনো সাড়াশব্দ নেই। নড়াচড়া নেই। কোথাও যাওয়ার কোনো তাড়া নেই। নিজেকে চাঁদের মতোই একা এবং নিঃসঙ্গ লাগে।

মায়মূনা। আবিরের মেয়ে। বয়স আর কত হবে। এই ধরুন নয় কিংবা দশ। ওর অনেক বুদ্ধি। মিষ্টি করে হাসতে জানে। মনভোলানো হাসি। ওই হাসিতে আবির বেঁচে আছে। মেয়েটি হাসলে আবিরের পৃথিবী হাসে। এই মেয়েটির জন্যই হয়তো সে বেঁচে আছে। এই অসুস্থ শহরে। চার দেয়ালে আবদ্ধ ‘শান্তিনিকেতন নীড়ে’।

এই বাড়ির নামটা কত সুন্দর। শান্তিনিকেতন। অথচ শান্তির ছিটেফোঁটাও নেই এই শান্তিনিকেতনে। শান্তিনিকেতনজুড়ে হাজারো অশান্তির বসবাস!

বিজ্ঞাপন
default-image

মায়মূনার হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায়। ঘুম ঘুম চোখে বিছানায় তাকায় সে। বাবা বিছানায় নেই। চোখ কচলাতে কচলাতে বাবার পাশে দাঁড়ায়। ‘বাবা ঘুমোবে না’—এই কথাটি বলতে গিয়ে থেমে যায়। সেকি, বাবার চোখে জল! আবির চোখের জল মুছতে মুছতে পেছনে ফিরে দেখে তার মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
‘একি আম্মু, তুমি এখনো ঘুমাওনি?’
মাথা নেড়ে সে বলে, ‘হুঁ, ঘুমিয়ে ছিলাম। কিন্তু তোমাকে বিছানায় না দেখে...’
‘ও আচ্ছা। চলো। তোমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিই।
ঘুমপাড়ানি মাসি–পিসির দেশে পাঠিয়ে দিই।’
‘উঁহু, আমি তোমার সঙ্গে জেগে থাকব। চাঁদ দেখব।’
‘ছোটদের চাঁদ দেখতে হবে না। চাঁদ ছোটদের দেখলে খুব বকবে। রাগ করে বলবে, এই বাচ্চা মেয়ে, সকালে তোমার বুঝি স্কুল নেই। খুব ভোরে উঠতে হবে না? যাও। বাবার সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়ো।’
‘হিহিহিহি। বাবা তুমি অনেক বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলতে পারো। চাঁদ এসব বলতে পারে না।
হিহিহিহি। আমি জানি।’
আচ্ছা, বেশ। আর বানিয়ে বলব না কেমন!
‘বাবা, তোমাকে একটা কথা বলি। সত্যি সত্যি বলবে? আমি তোমাকে প্রায় সময় লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদতে দেখি। তোমার চোখের জল মুছতে দেখি। তোমাকে কাঁদতে দেখলে আমারও ভীষণ কাঁদতে ইচ্ছে করে। তুমি কাঁদলে কি আমার ভালো লাগে, হ্যাঁ!’
আবির ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি ঝুলিয়ে বলে, ‘আমার আম্মুটার বেশ বুদ্ধি হয়েছে দেখি।’

default-image

ওর নিষ্পাপ চেহারায় তাকিয়ে মনে মনে বলে, এই তো সেদিন না মেয়েটাকে তার মায়ের পেট কেটে হাসপাতাল থেকে নিয়ে এলাম।
আজ কত্ত বড় দেখাচ্ছে। আমার মায়ের মতো। মা হয়তো ছোটবেলায় আমার মেয়ের মতোই ছিল। মেয়েরা কলাগাছের মতো দ্রুত বেড়ে যায়।
আচ্ছা বাবা, তুমি তো কখনো বলোনি আমার আম্মু কোথায় গিয়েছে। যখনই জিজ্ঞাস করি, তুমি বলো, কয় দিন পর ফিরে আসবে। খুব ব্যস্ত সে। যখন আসবে তোমার জন্য ইয়া বড় বড় আইসক্রিম, চকলেট আরও কত কিছু নিয়ে আসবে! তুমি খুব মজা করে খাবে।
কই, এত দিন হয়ে গেল। এখনো আসছেন না ক্যান?’
‘আসবে, কদিন পর। তোমার মা আমার ওপর বড্ড অভিমান করে দূরে কোথাও চলে গেছে।’
আবির কথাগুলো বলে অন্যদিকে ফিরে নিশ্বাস ফেলে। আজকাল নিশ্বাস নিতেও কষ্ট হয় তার।
‘সেই দূর কত দূর, বাবা? তাহলে চলো। আমরা খুঁজে আনি। সেই ছোট্ট থেকেই তোমার বিষণ্ন মুখ দেখে বড় হচ্ছি। আমার বুঝি ভালো লাগে! সত্যি বলো, আম্মু কি আসবে না? সারা জীবন আম্মুর জন্য আমারও কাঁদতে হবে?’

‘আচ্ছা মা, আজ না অন্য কোনো দিন!’
মায়মূনা নাছোড়বান্দা। উঁহু, আজই বলো এবং সেটা এক্ষুনি।
বাধ্য হয়ে আবির বলতে শুরু করে—তুমি পেটে থাকতেই তোমার আম্মুর অসুখ হয়।ভয়াবহ অসুখ। অনেক ডাক্তার দেখিয়েছি। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি।

মেয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কাঁদে। খুব কাঁদে। ওদের কান্না দেখে দূরের চাঁদটাও হয়তো কাঁদে। কেউ যেন চাঁদের কান্না দেখতে না পায়, সে জন্য সে খানিক সময় মেঘের আড়ালে লুকিয়ে থাকে

যেদিন তুমি পৃথিবীতে এলে, সেদিন সে পরপারে পাড়ি জমাল।
সেদিন আমার জন্য দু–দুটি সংবাদ ছিল।
একটা সুখের, অন্যটা শোকের!
আমি সেদিন কাঁদতে ভুলে গিয়েছিলাম। বহু চেষ্টা করেছি চোখ দিয়ে দুফোঁটা জল ফেলতে কিন্তু...
যখন তাকে নিজ হাতে কবরে রাখি। তখন কতটুকু যন্ত্রণা হচ্ছিল বলে বোঝাতে পারব না। তোমার আম্মুকে শেষবার দেখার পর বড্ড অভিমান করে বলেছিলাম,
‘চলে যেতে চাইছ, তবে যাও
নোঙর তোলে ভাসিয়ে দিচ্ছি নাও।’
আবির আর বলতে পারে না। চোখের পাতা ভারী হয়ে ওঠে। নিশ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। পুরো পৃথিবী থমকে যায়। চারদিকে পিনপতন নীরবতা বিরাজ করে।

মেয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কাঁদে। খুব কাঁদে। ওদের কান্না দেখে দূরের চাঁদটাও হয়তো কাঁদে। কেউ যেন চাঁদের কান্না দেখতে না পায়, সে জন্য সে খানিক সময় মেঘের আড়ালে লুকিয়ে থাকে।

মেয়েটা আজ কাঁদছে। বহুদিন পর। কাঁদুক। হৃদয়ের সব দুঃখ-কষ্ট চোখের জলের সঙ্গে বের হয়ে যাক। এই কান্না থামানোর কোনো সান্ত্বনার বাণী আবিরের জানা নেই। মেয়েটা বাবার বুকে মাথা গুঁজে বলে, ‘তুমিই আমার বাবা। তুমিই আমার মা। তুমিই আমার সব!’

বিজ্ঞাপন
নাগরিক সংবাদ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন