করোনাভাইরাস মহামারি সারা বিশ্বকে পাল্টে দিয়েছে। ২৫ লাখের বেশি মানুষ মারা গেছেন এই প্রাণঘাতী ভাইরাসে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে প্রথম করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। এরপর আস্তে আস্তে বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। ২০২০ সালের ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। এরপর সময় যত গড়িয়েছে সংক্রমণ তত বেড়েছে। তত দিনে পুরো বিশ্ব করোনার আঘাতে টালমাটাল।

বিশ্বের সব মানুষের একমাত্র আরাধ্য বস্তু তখন টিকা। সবাই মুখিয়ে ছিল কখন আবিষ্কৃত হবে করোনার টিকা। অবশেষে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ২০২০ সালের শেষের দিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনাভাইরাসের টিকার অনুমোদন দেয়। এরপর ধনী রাষ্ট্রগুলো করোনাভাইরাসের টিকা কিনে নেওয়ার জন্য হন্যে হয়ে ওঠে। এমনকি অনেক ধনী রাষ্ট্র তৈরির আগেই অগ্রিম টিকা কিনে রাখে। এমন তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যেও বাংলাদেশের মতো একটি ক্ষুদ্র দেশ টিকার স্বপ্ন দেখা শুরু করে শুধু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে। টিকা কেনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর সর্বাত্মক প্রচেষ্টা যেন জনগণের ভালোবাসার প্রতিদান। আর তাই তো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা টিকাপ্রাপ্তির জন্য অগ্রিম চুক্তি স্বাক্ষর করেন এবং টাকা পরিশোধ করেন, যাতে টিকা এলেই বাংলাদেশের জনগণ তা পায়। ফলে ২১ জানুয়ারি ভারতের দেওয়া উপহার হিসেবে ২০ লাখ ডোজ করোনার টিকা বাংলাদেশে এসে পৌঁছায়। এর পরপরই ২৩ জানুয়ারি চুক্তির ৩ কোটি ডোজ টিকার প্রথম ২০ লাখ বাংলাদেশে এসে পৌঁছায়। এখন পর্যন্ত (২৫ ফেব্রুয়ারি) মোট ৯০ লাখ ডোজ টিকা বাংলাদেশে এসে পৌঁছেছে।

টিকা বাংলাদেশে এসে পৌঁছানোর পরপরই জনমনে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় যে কীভাবে এই টিকা মানুষের মধ্যে প্রয়োগ করা হবে। জনমনের সব বিভ্রান্তি দূর করে বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও প্রযুক্তি বিভাগ Surokkha.gov.bd নামের একটি ওয়েবসাইটের উদ্বোধন করে, যা করোনাভাইরাসের টিকা প্রদানের জন্য অনলাইন সিস্টেম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। রয়টার্সের তথ্যমতে, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত প্রায় ৪০ লাখের মতো মানুষকে করোনাভাইরাসের টিকা প্রদান করা হয়েছে। এত বৃহৎ জনগোষ্ঠীর টিকা প্রদানের জন্য সুরক্ষা প্ল্যাটফর্মটি দারুণভাবে পুরো বিষয়টিকে নিয়ন্ত্রণ করছে।

বিজ্ঞাপন

সুরক্ষা একটি সরকারি ওয়েবসাইট। টিকা গ্রহণে আগ্রহীরা এই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে তাঁদের জাতীয় পরিচয়পত্র ও ফোন নম্বর ব্যবহার করে নিবন্ধন করবেন। অনলাইনে নিবন্ধনের পর একটি টিকা কার্ড প্রদান করা হবে, সেটি প্রিন্ট করে নিজের কাছে সংরক্ষণ করতে হবে এবং টিকা গ্রহণের সময় সেটি প্রদর্শন করতে হবে। এরপর অনলাইনে নিবন্ধনকৃত তথ্য যাচাইপূর্বক পর্যায়ক্রমে টিকা প্রদানের তারিখ ও কেন্দ্রের নাম উল্লেখপূর্বক মুঠোফোনে বার্তা পাঠানো হচ্ছে। বার্তা প্রাপ্তি সাপেক্ষে নির্ধারিত তারিখে টিকাদান কেন্দ্রে গিয়ে করোনার টিকা গ্রহণ করবেন। এভাবে খুব সহজে একজন ব্যক্তি সুরক্ষা ওয়েবসাইটে নিবন্ধনের মাধ্যমে টিকা গ্রহণ করতে পারছেন। নিঃসন্দেহে অনেক বড় একটি অর্জন, যা বিশ্বের দরবারে তুলে ধরার মতো।

পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য–উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সুশীল সমাজের টিকা গ্রহণোত্তর উচ্ছ্বাস দেখেই বোঝা যাচ্ছে এই ব্যবস্থাটি কত সুশৃঙ্খল এবং কার্যকরভাবে কাজ করছে। সুশীল সমাজের নাগরিকদের প্রায় সবাই উল্লেখ করেছেন টিকাদান কেন্দ্রে যাওয়ার পর কোনো ধরনের হয়রানি বা ধাক্কাধাক্কির শিক্ষার না হয়ে সুশৃঙ্খল পরিবেশে তাঁরা টিকা গ্রহণ করেছেন, বিশেষত ডাক্তার ও নার্সদের আন্তরিক মনোভাব সবাইকে মুগ্ধ করেছে।

অনেকেই বলছেন, সরকারের সবচেয়ে স্বচ্ছ এবং সুশৃঙ্খল একটি সেবা হচ্ছে এই করোনা টিকাদান সেবা। যেখানে কোনো ধরনের ঝামেলা বা হয়রানির শিক্ষার না হয়েই টিকা গ্রহণ করা সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশ প্রযুক্তিবিদদের ধারণার ওপর ভিত্তি করে এই অসাধারণ সুরক্ষা নামের ওয়েবসাইটটি তৈরি করা হয়েছে। যার মাধ্যমে সুশৃঙ্খলভাবে টিকা প্রদান করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে এত সুন্দর ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশে সচরাচর আর কোথাও দেখা যায়নি নিকট অতীতে।

গত ২৭ জানুয়ারি রুন ভোরোনিকা কস্তা নামের একজন নার্সকে টিকা প্রদানের মাধ্যমে বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের টিকা কার্যক্রম শুরু হয়। এখনো পর্যন্ত এই পুরো প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা পরিলক্ষিত হয়নি।

সুরক্ষা প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে জনগণের দোরগোড়ায় টিকা প্রদানের মতো এত বড় একটি জটিল বিষয়কে খুব সহজভাবে পৌঁছে দেওয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশাল একটি অর্জন। শুধু তাঁর সঠিক নেতৃত্ব ও সময়োচিত পদক্ষেপের কারণেই আজ বাংলাদেশের মানুষ বিনা মূল্যে টিকা গ্রহণ করছে। যেখানে অনেক ধনী রাষ্ট্রে টিকার জন্য হাহাকার চলছে।

সুরক্ষা প্ল্যাটফর্ম প্রমাণ করে দিয়েছে ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে সরকারি সেবা সহজীকরণ ও দুর্নীতিমুক্ত করা সম্ভব। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায় সুরক্ষা ওয়েবসাইটটি এবং টিকা প্রদানের পুরো প্রক্রিয়াটি বাংলাদেশে সরকারি সেবা সহজীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণের একটি অনন্য উদাহরণ এবং রোল মডেল। আমার বিশ্বাস, বিশ্বের অন্যান্য দেশ বাংলাদেশের সাফল্যকে তাদের পথচলার পাথেয় হিসেবে ব্যবহার করবে এবং টিকাদান প্রক্রিয়াকে আরও সরলীকরণ করবে।

এভাবে স্বচ্ছ পদ্ধতিতে বাংলাদেশের গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে পৌঁছে যাক করোনাভাইরাসের টিকা, বাংলাদেশ হোক করোনাভাইরাসমুক্ত। করোনাভাইরাসমুক্ত পৃথিবীতে আরও একবার মাথা উঁচু করে জেগে উঠুক জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ। বাংলাদেশ সরকারের প্রতিটি সেবা ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে খুব সহজে কোনো ধরনের ভোগান্তি ছাড়াই পৌঁছে যাক জনগণের দোরগোড়ায়, এই প্রত্যাশা সব সময়।

*লেখক: মো. বিল্লাল হোসেন, শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ

বিজ্ঞাপন
নাগরিক সংবাদ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন