default-image

চলে গেলেন বাংলাদেশের সংস্কৃতিজগতের কিংবদন্তি নক্ষত্র, অনন্য নাট্যব্যক্তিত্ব আলী যাকের (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

সে কয়েক মাস আগের কথা। কয়েকবার যোগাযোগ করেছিলাম নাট্যব্যক্তিত্ব আলী যাকেরের সঙ্গে। আমাদের ‘মুক্ত আসর’ থেকে আবু সাঈদের সম্পাদনায় একটি অনন্য সংখ্যা বের হলো। সংখ্যাটি ছিল ‘মুক্তিযুদ্ধে রেডিও’।

একাত্তরে মার্চের শেষ দিকে শুরু হলো ভায়াবহ যুদ্ধ। যুদ্ধের প্রায় শুরুতে আলী যাকের কলকাতায় গেলেন। তখন কলকাতার বালিগঞ্জ ছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ঠিকানা। দেশের প্রতি ঋণ শোধের তাগিদে সেদিন তিনি ছুটে গিয়েছিলেন বালিগঞ্জ রেডিও স্টেশনে। স্বাধীনতাযুদ্ধের দীর্ঘ ৯ মাস এ কেন্দ্রে সংবাদ সংগ্রহ, সংবাদ সম্প্রচারসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

বিজ্ঞাপন

‘মুক্ত আসর’ নামের আমাদের একটি সংগঠন আছে। আবু সাঈদের নেতৃত্বে এ সংগঠন থেকে ‘মুক্তিযুদ্ধে রেডিও’ নামে একটি সংখ্যা বের করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

নাট্যব্যক্তিত্ব আলী যাকেরকে বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো মুক্তিযুদ্ধে রেডিও নিয়ে একটি লেখা দেওয়ার জন্য। উনি সঙ্গে সঙ্গেই রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু প্রবল ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও লিখে আর দিতে পারছিলেন না। আবার না-ও করছিলেন না। কণ্ঠস্বরেই বোঝা যেত যে শরীরটা তেমন ভালো নেই। একদিন সারা যাকের আপার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বললেন। তারপর আপার সঙ্গে যোগাযোগ। সারা আপাকে সব বুঝিয়ে বললাম।

কয়েক দিনের মধ্যেই ‘যে রেডিও যুদ্ধ জয়ের স্বপ্ন দেখিয়েছিল’ শিরোনামে একটি অসাধারণ লেখা দিয়েছিলেন। সব কাজ শেষ করে একদিন ‘মুক্তিযুদ্ধে রেডিও’ সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়। এটি হাতে নিয়ে প্রথম যাঁর কথা মনে হয়েছিল, তিনি অভিনয়জগতের কিংবদন্তি আলী যাকের। প্রথমেই আমরা চেয়েছিলাম তাঁকে একটি সংখ্যা পৌঁছে দিতে। একপর্যায়ে এটি দ্রুত শেষ হয়ে যায়। তারপর বিভিন্ন ব্যস্ততার মধ্যে ডুবে যাই। আবার যখন হাতে পাই, তখনো ভেবেছি সংখ্যাটি দিয়ে আসব। সেই যাই যাই করে আর যাওয়া হলো না।

রেডিও সংখ্যায় যেভাবে শুরু করেছিলেন তাঁর এক জীবনের কথা, ‘আমার বাল্যকাল আর দশজন মধ্যবিত্ত বাঙালির ছোটবেলা থেকে ভিন্নতর ছিল না। একজন মধ্যবিত্তের সন্তান হিসেবে বেড়ে উঠেছি আমি নানা রকম মূল্যবোধ নিয়ে। আমার বাবা সরকারি চাকরি করতেন। ছোটবেলায় রোমাঞ্চকর সময় কেটেছে। দুই-এক বছর পরপরই পরিবারের সঙ্গে যেতে হতো অন্য এক নতুন শহরে। এটা ছিল অনেকটা স্বপ্নের মতো। তবে ফেনী শহর ছিল আমার জীবনের প্রথম স্মৃতি।’

নাট্যব্যক্তিত্ব আলী যাকের সেই লেখায় লেখেন, ‘১৯৬০ সালে ম্যাট্রিকুলেশন শেষ করি আমি। নটর ডেম কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করি ১৯৬২ সালে। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞানে পড়াশোনা শুরু। এ সময় ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত ছিলাম।

রাজনৈতিক দল ছিল ছাত্র ইউনিয়ন। অনার্স শেষে ১৯৬৭ সালে করাচি যাই চাকরিসূত্রে। ২ বছর পর ১৯৬৯ সালে ঢাকায় ফিরে আসা। তখন আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে তুমুল গণ-আন্দোলন চলছে। তারপর এল সত্তরের নির্বাচন। বঙ্গবন্ধু নিরঙ্কুশভাবে বিজয়ী হলেন। ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে শুরু হলো টালবাহানা। ’৭১-এর ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দিলেন। তার ফল ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী বর্বর গণহত্যা চালায় বাংলাদেশে। শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ।… ১৯৭১ সালের মে মাসে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে যুক্ত হলাম। কলকাতায় আমির আলী অ্যাভিনিউ দিয়ে হাঁটছি। হঠাৎ পেছন থেকে কে যেন কাঁধে হাত রাখল। ঘুরে দেখলাম আলমগীর ভাই। মানে আলমগীর কবির। তিনি একাধারে সাংবাদিক, গবেষক, চলচ্চিত্রনির্মাতা, বুদ্ধিজীবী। আমাদের এক ধরনের অভিভাবকের মতো। একটু মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করলেন, “কী ব্যাপার, কী করছো?” বললাম, ট্রেনিং নিচ্ছি। বললেন, “ট্রেনিং নিয়ে কী করবে?” বললাম, যদি সুযোগ পাই, যুদ্ধ করব। তিনি বললেন, “তুমি আমার সঙ্গে এসো। তোমার সঙ্গে আমার কথা আছে।” বলেই পাশের মিষ্টি-কাম চায়ের দোকানটাতে ঢুকে পড়েন আলমগীর কবির। তারপর বললেন, “মুজিবনগর সরকার একটা দায়িত্ব দিয়েছে। দায়িত্বটা হলো স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করার। আমরা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে ইংরেজি বিভাগ চালু করেছি। এই সার্ভিসটা আমি দেখি। আমার একার পক্ষে সবকিছু সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তোমার সাহায্য চাই। ইংরেজি ভাষার ওপর তো তোমার দখল ভালোই। তুমি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দাও না কেন? আমরা দুজনে একসঙ্গে হলে We can take them no” কিন্তু আমি যে যুদ্ধে যাব?, বললাম আমি। কবির ভাই বললেন, “আহা, সবাইকে কি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করতে হবে? এও তো যুদ্ধ এবং অত্যন্ত প্রয়োজনীয় যুদ্ধ। শব্দসৈনিক!...আমার দায়িত্ব হবে সংবাদ ভাষ্য তৈরি করে পাঠ করা। এই সময় আমি একটি ছদ্মনাম ব্যবহার করতাম। নামটি ছিল, আবু মুহম্মদ আলী।…’

বিজ্ঞাপন
default-image

নাট্যব্যক্তিত্ব আলী যাকের রেডিও সংখ্যায় লেখেন, ‘৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে দেশ স্বাধীন হলো। ফিরে এলাম প্রিয় জন্মভূমিতে। ফিরে গেলাম আমার পূর্বের পেশায়, বিজ্ঞাপনী সংস্থা এশিয়াটিকে কাজ শুরু করলাম এবং যোগ দিলাম “আরণ্যক” নাট্যদলে। ১৯৭২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ‘কবর’ নাটকে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে আমার নাট্যজীবনের শুরু। এরপর যুক্ত হই নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ে। নাটকের জগতে আমার একমাত্র এবং শেষ ঠিকানা হলো নাগরিক। স্বাধীন বাংলাদেশে জীবনকে বহুমাত্রিকভাবে যুক্ত করে ফেলি। মঞ্চ, রেডিও, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে কাজ করেছি।

কিছু মৌলিক নাটক লিখেছি, কিছু অনূদিত ও রূপান্তরিত নাটকও রয়েছে আমার। পাশাপাশি পত্রপত্রিকায় কলাম লিখেছি। কয়েকটি বইও বেরিয়েছে আমার জীবন, ভ্রমণ-অভিজ্ঞতা আর পত্রপত্রিকায় লেখা কলাম নিয়ে। জীবন থেমে থাকে না। আমার বিজ্ঞাপনী সংস্থা, এশিয়াটিক থ্রি সিক্সটি গ্রুপের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। আজীবন ট্রাস্টি হিসেবে দায়িত্বে আছি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরেরও। নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ে একাদিক্রমে ৪৬ বছর ধরে আমি সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং কাজ করে চলেছি। যুক্তরাজ্যের “রয়্যাল ফটোগ্রাফিক সোসাইটি”র পূর্ণ সদস্য আমি। বিভিন্ন সময়ে একুশে পদক, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার, বঙ্গবন্ধু সম্মাননা, মুনীর চৌধুরী পদক, নরেন বিশ্বাস পদক, ডেইলি স্টার আজীবন সম্মাননা, মেরিল-প্রথম আলো আজীবন সম্মাননাসহ বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। আমার স্ত্রী অভিনেত্রী সারা যাকের, পুত্র ইরেশ যাকের এবং কন্যা শ্রিয়া সর্বজয়াকে নিয়ে আমার সংসার।’

নাট্যব্যক্তিত্ব আলী যাকের সেই লেখায় আরও লেখেন, ‘দেশের স্বাধীনতার প্রায় ৫০ বছর হতে চলেছে। এত দিন পরেও মনে হয় এক ধরনের যুদ্ধের মধ্যেই আছি। এই সময়ের তরুণদের মধ্যে দেশপ্রেমটা কীভাবে আছে, তারা দেশকে নিয়ে কী ভাবে, সেটি এখন অনেক বড় প্রশ্ন। তবে এই প্রজন্মের যদি কোনো স্খলন ঘটে থাকে, সেটা আমাদের প্রজন্মের দোষ। সবকিছু নিয়ে একটা একক চেতনার দরকার ছিল। যে চেতনার জন্য বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল, সেই ভিত্তির ওপরই বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। কিন্তু সেই একক চেতনা তৈরি করতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। ফলে আজকের কোনো তরুণ যদি বিভ্রান্ত হয়, সে দোষ তাদের নয়, দোষটা আমাদের।’

আজ আমার ভীষণ অপরাধবোধ কাজ করছে। ‘রেডিও’ সংখ্যাটি তাঁকে আর দিতে পারলাম না। কিন্তু সংখ্যাটি যে দেব, এটি প্রায় নিশ্চিত ছিল। আর এখন তিনি এমন জায়গায় চলে গেলেন, শত চেষ্টা করেও আর কোনো দিন তাকে দিতে পারব না।

শুধু এটুকু বলি, প্রিয় ব্যক্তিত্ব, প্রিয় মানুষ যেখানেই থাকুন, আপনার আত্মা যেন শান্তিতে থাকে। শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে আপনাকে স্মরণ করি নিরন্তর।

*লেখক: সাংবাদিক ও সংগঠক

মন্তব্য করুন