default-image

শিক্ষা ক্ষেত্রে এখন ক্রান্তিকাল চলছে। করোনা মহামারির কারণে গত বছরের ১৭ মার্চ থেকে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। ৩০ মার্চ খোলার কথা আছে। দেশ ও জাতি যখন অশিক্ষার অভিশাপ মুক্তির আশা করছে, ঠিক তখনই বৈশ্বিক মহামারির আঘাত থেকে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ রাখতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়। বিষয়টি নিয়ে নানা লোকের নানান কথা ভেসে আসে বাতাসে। অনলাইনেও মন্তব্যের অভাব নেই। পত্রিকায় নানা মতের লেখা ছাপা হয়। তবে অনেকে ভার্চ্যুয়াল ক্লাসের কথা বলেন। আজকের ডিজিটাল যুগে বিষয়টি বাস্তবায়নের সুযোগ অবারিত। তারপরও প্রশ্ন থেকে যায়। যেখানে বিদ্যালয়, উচ্চবিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পড়া আদায় করতে শিক্ষকেরা হিমশিম খান, সেখানে ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভার্চ্যুয়াল ক্লাস করে কীভাবে পড়া আদায় করা সম্ভব?

বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কোচিং সেন্টারে পাঠ্যবইয়ের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ল্যাপটপ ও স্মার্টফোন। খোলা হয় ফেসবুক পেজ। আপলোড করা হয় উত্তরপত্রসহ প্রশ্ন। কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জুমে প্রশ্ন ও উত্তরপত্র পাঠায়। শিক্ষার্থী তার মর্জিমতো ডাউনলোড করতে পারে। এই হলো ভার্চ্যুয়াল ক্লাসে শিক্ষার্থীদের প্রাপ্তি। স্বশিক্ষিত কিংবা স্বল্পশিক্ষিত অভিভাবকেরা এমন যান্ত্রিক শিক্ষা নিয়ে বিপাকে পড়ছেন। শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীর কাছে বিষয়টি যান্ত্রিক খেলার সামগ্রী বলে মনে হয়। এ মাধ্যমে অমনোযোগিতার কারণে শিক্ষকের বকুনি কিংবা চোখরাঙানি ও পড়া আদায়ের ভয় নেই। এমন শিক্ষা কত দিন বজায় রাখা সম্ভব, তা একমাত্র ভবিষ্যৎই বলতে পারে। তারপরও নিরাশ হয়ে লাভ নেই। করোনার বিষাক্ত ছোবল থেকে বেঁচে থাকার জন্য শিক্ষার বিকাশে বিকল্প পদ্ধতি হিসেবে শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা এ পথেই হাঁটছেন। করোনার ছোবলে অসংখ্য শিশু-কিশোরের জীবনে নেমে এসেছে এমন অমানিশা। এদিকে অটো পাসের প্রভাবে শিক্ষার্থীরা পড়ার টেবিলছাড়া। কেউ আহ্লাদে আটখানা, কেউবা ভবিষ্যৎ অন্ধকার ভেবে দিশেহারা। উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি-ইচ্ছুক শিক্ষার্থীরা ভর্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিতে হিমশিম খাচ্ছেন। শিক্ষার গতিশীলতা ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক শিক্ষাব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়েছে। করোনার কারণে কোনোভাবেই শিক্ষার মূল স্রোতোধারা ফেরানো যাচ্ছে না। এতে শিক্ষার্থীদের অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে।
কেউ কেউ বৃদ্ধ মা-বাবা, ভাই-বোনের মুখে অন্ন তুলে দিতে পেশা পরিবর্তন করে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে কাঁচামাল, কাপড় কিংবা অন্য কোনো পণ্য ফেরি করে বিক্রি করছেন। কেউ লোকলজ্জার ভয়ে পরিচিত গণ্ডির বাইরে গিয়ে দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে কাজ করছেন। অনেক কর্মহারা মা-বাবা তাঁদের সন্তানের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে চিন্তিত। কেউ কেউ বাসা ছেড়ে গাঁয়ের পথে পা বাড়িয়েছেন। এমন স্থান পরিবর্তনে কর্মহারা মা-বাবার সন্তানদের শিক্ষার ধারাবাহিকতা ধরে রাখা কঠিন হবে। এ ধরনের শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার আশঙ্কাই বেশি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যতীত সবকিছুই সচল।

বিজ্ঞাপন
default-image

শিক্ষার এমন ক্রান্তিকাল স্বাধীনতার পর আর কখনো আসেনি। মাদ্রাসা খোলা রেখে অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখায় শিক্ষার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন জাগছে। বিষয়টি উচ্চমহল খতিয়ে দেখে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নেবে, এটাই প্রত্যাশা। বৈশ্বিক মহামারির কারণে শিক্ষা কার্যক্রম যদি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকে, তাহলে প্রতিটি দেশ ও জাতির জন্য নতুন প্রজন্ম বোঝায় পরিণত হবে বলে মনে করেন বিজ্ঞজনেরা। কারণ শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। বিশ্বের প্রতিটি দেশ ও জাতির ক্ষেত্রেই এটি প্রযোজ্য। তাই জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় পরিকল্পিতভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু করে নতুন প্রজন্মকে অশিক্ষার অভিশাপ থেকে মুক্তির পথ খুঁজে বের করা জরুরি বলে শিক্ষক, অভিভাবক ও বিজ্ঞজন মনে করেন।

লেখক: সিনথিয়া সুমি, শিক্ষার্থী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ।

নাগরিক সংবাদ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন