default-image

শাফী ইমাম রুমী বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের একজন গেরিলা যোদ্ধা। তিনি ছিলেন শহীদ জননী জাহানারা ইমামের বড় ছেলে।
আইএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর ১৯৭১‌ সালের মার্চ মাসে রুমী প্রকৌশল কলেজে ভর্তি হন। এ ছাড়া বিশেষ অনুমতি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ক্লাস করতেন তিনি। ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন তুখোড় বিতার্কিক। তিনি ইলিনয় ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে সুযোগ পেলেও যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ার পর আদর্শগত কারণে দেশকে যুদ্ধের মধ্যে রেখে বিদেশে নিরাপদ আশ্রয়ে নিজের ক্যারিয়ারের জন্য পড়তে যাননি।

default-image

অনেকের মতো রুমীও হয়তো মা-বাবাকে না জানিয়ে লুকিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যেতে পারতেন; কিন্তু লুকিয়ে বা পালিয়ে কিছু করতে নেই। সে শিক্ষা তো মা-ই দিয়েছেন। মাকে বোঝাতে লাগলেন, ‘আম্মা, দেশের এ অবস্থায় তুমি যদি আমাকে জোর করে আমেরিকায় পাঠিয়ে দাও, আমি হয়তো যাব শেষ পর্যন্ত; কিন্তু তাহলে আমার বিবেক চিরকালের মতো অপরাধী করে রাখবে আমাকে। আমেরিকা থেকে হয়তো বড় কোনো ডিগ্রি নিয়ে এসে বড় ইঞ্জিনিয়ার হব; কিন্তু বিবেকের ভ্রুকুটির সামনে কোনো দিনও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব না। তুমি কি তাই চাও, আম্মা?’

ধানমন্ডি রোডের অপারেশনের পর রুমী তাঁর সহকর্মীদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। ১৯৭১ সালের ২৯ আগস্ট তিনি তাঁর নিজের বাড়িতে কাটান এবং এই রাতেই বেশ কিছু গেরিলা যোদ্ধার সঙ্গে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। পাকিস্তানি বাহিনী একটি অজ্ঞাত উৎস থেকে তথ্য নিয়ে বেশ কিছুসংখ্যক যোদ্ধাকে গ্রেপ্তার করে, যার মধ্যে ছিলেন আলতাফ মাহমুদ, আবুল বারক, আজাদ ও জুয়েল। রুমীর সঙ্গে তাঁর বাবা শরীফ ইমাম ও ভাই সাইফ ইমাম জামীকেও ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। জিজ্ঞাসাবাদের স্থানে রুমীকে ভাই, বাবাসহ এক ঘরে আনলে রুমী সবাইকে তাঁর যুদ্ধে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করতে বলেন। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন যে পাকিস্তানি বাহিনী তাঁর কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সচেতন এবং এর সব দায়দায়িত্ব তিনি নিজেই নিতে চান। ৩০ আগস্টের পর রুমী ও তাঁর সহযোদ্ধা বদি ও জুয়েলকে আর দেখা যায়নি।

default-image

ইয়াহিয়া খান ১৯৭১ সালের ৫ সেপ্টেম্বরে সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা দিলে অনেক আত্মীয় তাঁর জন্য আবেদন করতে বলেন। কিন্তু রুমী যে বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ধরা পড়েছেন, তাদের কাছেই ক্ষমা চাইতে রুমীর বাবা মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী, দেশপ্রেমিক শরীফ ইমাম রাজি ছিলেন না।

রুমী খুব বেশি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি। এ প্রসঙ্গে রুমীর সহযোদ্ধা হাবিবুল আলম বলেন, ‘একজন মুক্তিযোদ্ধা কতগুলো অ্যাকশন করেছে, সেটা বড় কথা নয়। যদি একটি অ্যাকশনে সে সাহস এবং বীরত্ব দিয়ে সফল হতে পারে, সেটাই বড় কথা। রুমী ঢাকার অ্যাকশনে অনেক বেশি সাহসের পরিচয় দিয়েছিল।’

পাকিস্তানি জান্তারা রুমীর বাবা, ভাই, বন্ধু, চাচাতো ভাইকে ছেড়ে দিলেও রুমীকে ছাড়ে না। পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে রুমীদের গেরিলা অপারেশনের সব খবরই ছিল। রুমী শুধু ২৫ আগস্ট রাতের অপারেশনের কথা স্বীকার করেন। ভয়ংকর অত্যাচার চালিয়ে ওরা তাঁর কাছ থেকে আর কারও নাম জানতে পারেনি। ছেলের মাথা যাতে হেঁট না হয়, সে জন্য রুমীর প্রাণ ভিক্ষার জন্য সরকারের কাছে আবেদন করেননি মা-বাবা।

অল্প বয়সী এ তরুণ দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবনাহুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর সংগ্রামী জীবনের কথা বিস্মৃত এ প্রজন্ম। শাসকশ্রেণিও তাদের একদলীয় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এ রকম চরিত্রকে আড়াল করছে। তাই শহীদ রুমীর স্বপ্নকে বাস্তবায়নের জন্য তাঁর চরিত্রকে অনুসরণ করে যুবক–তরুণদের চরিত্র গঠনে অণুপ্রাণিত করতেই গড়ে উঠেছে শহীদ রুমী স্কোয়াড। বিজ্ঞপ্তি

নাগরিক সংবাদ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন