বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ইউনিসেফের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে তৃতীয় শ্রেণিতে অধ্যয়নরত শিশুদের মাত্র ৩৪ শতাংশ পড়তে পারার এবং মাত্র ১৮ শতাংশের গুনতে পারার প্রাথমিক দক্ষতা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের অবস্থা আরও খারাপ।

বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি শেলডন ইয়েট বলেন, মহামারির আগেও বাংলাদেশের শিশুরা পড়াশোনার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছিল। কোভিডে বাংলাদেশের শিশুদের পড়াশোনায় যে ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে তাদের জন্য প্রতিকারমূলক শিক্ষাপ্রাপ্তির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এখনই এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হলে তা পরবর্তী প্রজন্মের শিশু ও তাদের পরিবারের সামগ্রিক কল্যাণে ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে।‌

এ চিত্র শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশেরও। ইউনিসেফের প্রতিবেদনে কয়েকটি দেশের শিশুদের ঝরেপড়ার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। লাইবেরিয়ায় ২০২০ সালের ডিসেম্বরে স্কুলগুলো আবার খুলে দিলে দেখা যায়, সরকারি স্কুলের ৪৩ শতাংশ শিক্ষার্থী ফিরে আসেনি। দক্ষিণ আফ্রিকায় ২০২০ সালের মার্চ থেকে ২০২১ সালের জুলাইয়ের মধ্যবর্তী সময়ে স্কুলের বাইরে থাকা শিশুর সংখ্যা তিনগুণ বেড়ে সাড়ে সাত লাখ হয়েছে। উগান্ডায় ২০২২ সালের জানুয়ারিতে স্কুল আবার খুললে দেখা যায়, ১০ শতাংশ শিক্ষার্থী স্কুলে ফেরেনি। কেনিয়ায় ১০-১৯ বছর বয়সী চার হাজার কিশোর-কিশোরীর ওপর পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, স্কুল আবার খোলার পর ১৬ শতাংশ মেয়ে ও ৮ শতাংশ ছেলেশিক্ষার্থী স্কুলে ফেরেনি।

ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথরিন রাসেল বলেন, শিশুরা যখন তাদের শিক্ষক ও সহপাঠীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে না, তখন তাদের শেখার ক্ষতি হয়। যখন তারা একবারেই যোগাযোগ করতে পারে না, তখন তাদের শেখার ক্ষতি স্থায়ী হতে পারে। তিনি আরও বলেন, আমাদের প্রয়োজন একটি নতুন স্বাভাবিক পরিস্থিতি, শিশুদের শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনা এবং তাদের শেখার অবস্থা কী, তা মূল্যায়ন করা।

তারা যা হারিয়েছে, তা পুনরুদ্ধার করার জন্য তাদের প্রয়োজনীয় নিবিড় সহায়তা প্রদান এবং শিক্ষকেরা যাতে তাঁদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও শিক্ষার উপকরণ পান, তা নিশ্চিত করা। এগুলো করতে না পারলে অনেক বেশি ঝুঁকি তৈরি হবে।

যখন একটানা ১৮ মাস স্কুল বন্ধ ছিল, তখন শেষের দিকে এসে ইউনিসেফসহ শিক্ষাবিদেরা সরকারকে স্কুল খোলার বিষয়টি বারবার বিবেচনা করার জন্য অনুরোধ করেছিল। সরকার সবকিছু বিবেচনা করে ২০২১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর স্কুল খুলে দেয়। কোভিড পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে বুঝে আবার ২০২২ সালের ২১ জানুয়ারি দ্বিতীয়বারের মতো স্কুল বন্ধ করে দেয়। একমাস পর টিকাদান সাপেক্ষে ২২ ফেব্রুয়ারি নিম্নমাধ্যমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১৫ মার্চ থেকে প্রাথমিকসহ সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হয়েছে।

১৫ মার্চ থেকে সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার পর, ২২ মার্চ যখন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ২০ রমজান পর্যন্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি পূরণকল্পে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শ্রেণি পাঠদান বিষয়ে নির্দেশনা জারি করা হয়, তারপর থেকে শুরু হয়েছে পবিত্র রমজান মাসে শ্রেণি পাঠদান নিয়ে আলোচনা–সমালোচনা, যা টক অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা–সমালোচনা পিছিয়ে নেই। জয়পুরহাট জেলার ক্ষেতলাল উপজেলার হিন্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক সহকারী শিক্ষককে ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্যের জন্য জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার শোকজ করেছেন। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ থেকে ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত শ্রেণি পাঠদান কার্যক্রম অব্যাহত রাখার বিষয়ে নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষক সমাজের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। রমজান মাসে শ্রেণি পাঠদান বন্ধ চেয়ে উচ্চ আদালতে রিটও করা হয়েছে।

রমজানে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ২০ রমজান পর্যন্ত চলবে। ইতিমধ্যে মাধ্যমিক ও কলেজপর্যায়ে রমজানে সাপ্তাহিক ছুটি দুই দিন ঘোষণা করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলায় খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ৪০-১০% কমে গেছে। রমজানে শিক্ষার্থীরা যদি স্কুলে নিয়মিত না আসে এবং শিক্ষকেরা যদি আন্তরিকভাবে পাঠদান না করেন, তাহলে যে উদ্দেশ্যে নিয়ে রমজান মাসে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করা হচ্ছে তা কতটা পূরণ হবে এ বিষয়ে সংশয় রয়েছে।

লেখক: বেসরকারি সংস্থা ভলান্টিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন ফর বাংলাদেশের সহকারী কান্ট্রি ডিরেক্টর।

নাগরিক সংবাদ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন