কিন্তু লক্ষ করলে দেখবেন, বাংলাদেশে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সমর্থকদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। পরিসংখ্যান বা জরিপ অবশ্য হয়নি, তবে সামাজিক মাধ্যম, পাড়া-মহল্লায় পতাকার আধিক্য কিংবা টিম কিটের বিকিকিনি দেখে এটাই অনুমেয় হয়। র‌্যাঙ্কিংয়ে অন্য দলগুলোর সমর্থক যে একেবারেই নেই, সেটা অবশ্য নয়। তবে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার মতো এতটা সমর্থন দেখা যায় না। এমন নয় যে এ দুই দলই সবচেয়ে ভালো খেলে বা ভালো খেলার ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে।

র‌্যাঙ্কিংয়ের প্রথম দিকে থাকা বেলজিয়াম, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, ইতালি, উরুগুয়ের মতো দলগুলো নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়েই এই পর্যায়ে এসেছে। তারাও সুন্দর ফুটবলের বিজ্ঞাপন হয়েই মুগ্ধতা ছড়ানোয় সমান পারদর্শী। তাহলে কেন দুটো দল ঘুরেই এমন উন্মাদনা? শুধু যে উন্মাদনা তা তো নয়, দুই দলের সমর্থকগোষ্ঠী রীতিমতো সংঘর্ষেও জড়ায় বিশ্বকাপ কিংবা কোপা আমেরিকার মতো বড় আয়োজনগুলো চলাকালে। এ সমর্থন কীভাবে জায়গা করে নিল দেশের ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে? এটি কি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে?
ঠিক কবে থেকে এই উন্মাদনার শুরু, সেটিতে একটুখানি চোখ ফেরানো যাক। বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো টেলিভিশনে বিশ্বকাপ ফুটবল দেখানো হয় ১৯৮২ সালে। বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে এমন তথ্যই এসেছে। ধারণা করা হয়, বাংলাদেশে বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে ব্যাপক উন্মাদনার শুরুটা তখন থেকেই।

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে এসেছে, আশি-নব্বইয়ের দশকে এ দেশের স্কুলের পাঠ্যবইয়ে পেলের বিষয়ে পড়ানো হতো। সে সময়কার শিক্ষার্থীরা পেলে সম্পর্কে জানতে গিয়ে জেনেছে ব্রাজিলকে, পরিচয় ঘটিয়েছে ব্রাজিলের নান্দনিক ফুটবলের সঙ্গে। ব্রাজিলের সমর্থক তৈরি হয়েছে দুটো প্রজন্মকে ঘিরে। প্রথমটি পেলের যুগ, ষাটের দশকে অনেকেই পেলের খেলার কারণে ব্রাজিল সমর্থন করতেন, কিন্তু তখন প্রচার বেশি ছিল না। তাই মাতামাতি কম ছিল।

এরপর নব্বইয়ের দশকে ফুটবল অঙ্গনে ব্রাজিলের উত্থান বড় ভূমিকা রাখে সমর্থকগোষ্ঠী তৈরিতে। আর আর্জেন্টিনা বাংলাদেশের মানুষের হৃদয় কেড়েছে ১৯৮৬ বিশ্বকাপে। সেটা ডিয়েগো ম্যারাডোনার জাদুতে ভুলে। ম্যারাডোনার ব্যক্তিত্ব, খেলার ধরন ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে আলোড়ন তৈরি করে। ম্যারাডোনাই আর্জেন্টিনার এত বড় সমর্থকগোষ্ঠী তৈরির অন্যতম প্রভাবক। বাংলাদেশে টেলিভিশনে বিশ্বকাপ দেখানোর পর থেকে টানা ৫টি বিশ্বকাপ আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের দাপট থাকার কারণেই এই সমর্থকগোষ্ঠী তৈরি হয়।

জার্মানি বা ফ্রান্সও তখন ভালো খেলত, কিন্তু ব্রাজিল অথবা আর্জেন্টিনার মতো তারকা খেলোয়াড় ছিল না। তাই ব্রাজিল–আর্জেন্টিনাতেই আটকে গিয়েছিল মানুষের ভালো লাগা। সময়ের সঙ্গে তারকা বদলেছে দুদলেই, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সেটি এসে ঠেকেছে মেসি-নেইমারে।

দুই দলের সমর্থকগোষ্ঠী তৈরি হতে শুরু করে আশির দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে। বর্তমানে দুই দলের যে সমর্থকগোষ্ঠী রয়েছে সেটির সিংহভাগই তৈরি হয়েছে বংশানুক্রমিকভাবেই। তাই নান্দনিক ফুটবল কিংবা ভালো খেলার ব্যাপারগুলো সমর্থক তৈরিতে এখন প্রভাব রাখছে খুব কমই। তাই সমর্থনকৃত দল খারাপ খেললেও তার পক্ষে সাফাই গাইতে রীতিমতো ঝগড়ায় জড়াতে দেখা যায় মানুষকে। শ্রেষ্ঠত্বের দাবি নিয়ে সমর্থকদের মধ্যে একটা দ্বন্দ্বও তৈরি হয়ে যায়। কখনো এটা খুনসুটির পর্যায়ে থাকলেও, মারামারির মতো গুরুতর ঘটনাও ঘটেছে গ্রাম থেকে শহরে। ফুটবল খেলায় সমর্থনের জের ধরে দুই দলের অন্ধ ভক্তদের মধ্যে সংঘাতের ঘটনা অবশ্য বাংলাদেশে নতুন নয়।

ঘরোয়া ক্লাব ফুটবলে একসময় দুই বড় ক্লাব আবাহনী ও মোহামেডান সমর্থকদের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটত নিয়মিতই। তবে ক্লাব ফুটবল জনপ্রিয়তা হারানোর পর সমর্থকদের মধ্যে ফুটবলসংক্রান্ত দ্বন্দ্বটা পরিবর্তিত হয়ে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের সমর্থকদের যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, আমরা কেন বহু দূরের দুটি দেশের সমর্থন ঘিরে নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি করছি? কেন সংঘর্ষে জড়িয়ে হতাহতের ঘটনা ঘটাতে হচ্ছে আমাদের?

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ধারার সুষ্ঠু বিকাশ ব্যাহত হওয়ার কারণে মানুষের মধ্যে দিন দিন বিদ্বেষমূলক মনোভাব তৈরি হচ্ছে। এটি ভূমিকা রাখছে সমর্থকগোষ্ঠীর মধ্যে উগ্র আচরণ তৈরিতে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক জিনাত হুদা ওয়াহিদ বলছেন, ‘আমরা স্বীকার করি আর না করি, বাংলাদেশ তার আদি রাজনৈতিক দর্শন, সামাজিক বন্ধন ও ধর্মীয় অনুশাসন থেকে বিচ্যুত হয়েছে। নাগরিকদের মধ্যে জাতীয়তাবোধের অভাবও এর অন্যতম প্রধান কারণ বলে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন।

জাতীয়তাবোধের অভাব আমাদের ক্রীড়া, সংস্কৃতি, পোশাক-আশাক সব ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে। সেটির প্রভাব ছুঁয়েছে ব্রাজিল–আর্জেন্টিনা সমর্থনের নামে উগ্র আচরণের ক্ষেত্রেও। সমর্থনের নামে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ কারোরই কাম্য নয়। কিন্তু বিশ্বকাপ এলে এ দেশে তা নিয়মিত ঘটে থাকে। ফলাও করে সেটি প্রচার হয় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও। এতে করে সমর্থনের নামে আমাদের উগ্র আচরণটাই দেখে বিশ্ববাসী। তাতে কি সম্মান বাড়ে বলে মনে হয় আমাদের?

লেখা: তানভীর মাহতাব আবীর, প্রাবন্ধিক