default-image

ইতিহাস পড়লে দেখা যায়, কৃষিবিপ্লবের প্রথম সূচনা হয় ফার্টাইল ক্রিসেন্ট থেকে, যা কৃষির উৎপত্তিস্থল হিসেবে সমধিক পরিচিত। মধ্যপ্রাচ্যের একটি ভূখণ্ডকে বলা হয় ফার্টাইল ক্রিসেন্ট বা উর্বর চন্দ্রকলা, যা দেখতে ঠিক একফালি চাঁদের মতো। বাঁকা চাঁদের আকৃতির এই অঞ্চলটি ছিল পারস্য উপসাগর, আধুনিক জর্ডান, লেবানন, ইরান, ইরাক, সিরিয়া, ইসরায়েল ও মিসরের উত্তর অংশ নিয়ে গঠিত। আব্রাহামিক, যেমন: ইহুদি, খ্রিষ্টান ও মুসলিম ধর্মের ঐতিহ্যের সঙ্গে উর্বর চন্দ্রকলা নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। উর্বর চন্দ্রকলার সুফলা মাটিতে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী এসে চাষাবাদ আরম্ভ করে। আদি মানবসভ্যতা শিকার ছেড়ে কেন চাষাবাদের প্রতি আগ্রহী হলো, তা নিয়ে বেশ কিছু তত্ত্ব আছে।

*ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ সামাল দিতে গিয়ে মানুষের অতিরিক্ত পরিমাণ খাদ্যের চাহিদা দেখা দেয়। বন্য প্রাণী শিকারের মাধ্যমে এই বর্ধিষ্ণু জনগোষ্ঠীর খাদ্যের জোগান দেওয়া ক্রমান্বয়ে অসম্ভব হয়ে পড়ে। তা ছাড়া, শিকার করার জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে সুদৃঢ় হওয়া অত্যাবশ্যক ছিল। তাই শিকারের বিকল্প হিসেবে মানুষ স্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে বন্য প্রাণী পোষ মানানো বা ফলদায়ী গাছ জন্মানোর মতো কিছু কিছু উদ্ভাবনী প্রযুক্তির দিকে ধাবিত হতে শুরু করে। আর এভাবেই প্রাণী ও উদ্ভিদের ডমেস্টিকেশন বা গৃহপালিতকরণের মাধ্যমে কৃষির উৎপত্তি ঘটে।

*মানুষ তার নিজস্ব প্রয়োজনে পশুপাখির মতো উদ্ভিদকেও পোষ মানানো শুরু করে অর্থাৎ উদ্ভিদকে তারা গৃহের পরিবেশ দান করে বড় করা শুরু করে। এতে করে উদ্ভিদও মানুষের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। আর তাই তাদের বৃদ্ধির জন্য বন্য পরিবেশের তুলনায় ভিন্ন ধরনের পরিবেশ প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে।

*আবহাওয়ার পরিবর্তন।

*মানব মস্তিষ্কের উন্নতি সাধন মানুষকে সংঘবদ্ধভাবে বসবাসের অনুপ্রেরণা দিয়েছিল।

কেন এবং কীভাবে মানুষ শিকারবিমুখ হয়ে কৃষিনির্ভর হয়ে উঠতে লাগল, সে প্রশ্ন আজ ব্যাখ্যার দাবিদার হলেও সেই কালে মানুষ ক্রমেই স্থিরভাবে বসবাসের প্রতি মনোযোগী হয়ে উঠেছিল। পৃথিবীর মধ্য-পূর্বাঞ্চলে দুটি জনগোষ্ঠী স্বাধীনভাবে কৃষিকাজ শুরু করে এবং সেখান থেকেই ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা মহাদেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় ধীরে ধীরে কৃষি ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমান ইরান, তুরস্ক, আর্মেনিয়া ও জর্ডানে হাজার হাজার বছর আগে বসবাসকারী ৪৪ জন মানুষের জিনোম বিশ্লেষণ করে এই তথ্য মিলেছে। ইরানের কৃষকরা ছড়িয়ে পড়লেন ভারত ও পাকিস্তান অভিমুখে, আর অন্যদিকে পূর্ব ভূমধ্যাঞ্চলের কৃষকেরা গেলেন আফ্রিকার দিকে।

ধান চাষের সূচনা

ধান Graminae/Poaceae গোত্রের দানাশস্যের উদ্ভিদ। ধান উষ্ণ জলবায়ুতে, বিশেষত পূর্ব-এশিয়ায় ব্যাপক চাষ হয়। প্রাচীন চীনা ভাষার Ou-liz  শব্দটি আরবিতে Oruz ও গ্রিক ভাষায় Oryza হয়ে পরিশেষে Ritz ও Rice হয়েছে। ধান বা ধান্য শব্দের উৎপত্তি অজ্ঞাত। ধানবীজ বা চাল সুপ্রাচীনকাল থেকে লাখো মানুষের প্রধান খাদ্য। চীন ও জাপানের রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রায় ১০ হাজার বছর আগে ধান চাষ শুরু হয়েছিল বলে জানা যায়। ব্যাপক অভিযোজন ক্ষমতার দরুন ধান উত্তর কোরিয়া থেকে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া, এমনকি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২ হাজার ৬০০ মিটার উচ্চতায়ও (জুমলা, নেপাল) জন্মায়।

বোরো ধানে হিটশক, জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন চ্যালেঞ্জ

অতিরিক্ত গরমে মানুষ যেমন হিটস্ট্রোক করে; তীব্র তাপদাহে ধানগাছও এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যেটাকে হিটশক বা হিট ইনজুরি বলে। ৪ এপ্রিল দেশের বিভিন্ন জেলায় বোরো ধানের ক্ষতি হয়েছে এ হিটশকে। এটিকে কৃষিতে জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন চ্যালেঞ্জ বলে দেখছেন ধান গবেষকেরা।

default-image

জানা গেছে, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জের হাওর এলাকা এবং গোপালগঞ্জ, কুষ্টিয়া, রাজশাহী, ময়মনসিংহসহ কিছু অঞ্চলে ৪ এপ্রিলের হিটশকে বোরো আবাদের ন্যূনতম ৫ শতাংশ (ধানগাছ) মরে গেছে। এ ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে প্রাথমিকভাবে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, পুরোপুরি ক্ষতির হিসাব নিরূপণ করা না গেলেও হিটশকে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে ৪৮ হাজার হেক্টর জমি বোরো ধান আক্রান্ত হয়েছে বলে এখন পর্যন্ত জানা গেছে। এর মধ্যে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ আবাদের ক্ষতি হয়েছে। সে হিসাবে ১০ থেকে ১২ হাজার হেক্টর জমির ধান সম্পূর্ণ নষ্ট হতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

জানা গেছে, ৪ এপ্রিল সন্ধ্যার পর সারা দেশের মতো অধিক ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতেও কালবৈশাখীর বাতাস শুরু হয়, তবে এসব এলাকার বাতাস ছিল অতিরিক্ত গরম। দেশের অধিকাংশ এলাকায় এরপর গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি নামে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত সেসব এলাকায় বৃষ্টি হয়নি। পরদিন ৫ এপ্রিল সকালে খেতে গিয়ে কৃষক হতভম্ভ হয়ে পড়েন। ওই দিন দুপুরে সূর্যের খরতাপ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তার স্বপ্নের মতো তরতাজা ধানের শিষগুলো মড়ে শুকিয়ে যেতে থাকে। ক্ষতিগ্রস্ত সব এলাকায় একই ঘটনা ঘটেছে। বিষয়টি কী ঘটেছে, তা কৃষকদের কাছে পরিষ্কার ছিল না, মনে হয় যেন গজব নেমে এসেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে এ ধরনের ঘটনা নতুন না হলেও সাধারণ মানুষের কাছে বেশি পরিচিত নয়। কৃষিতে জলবায়ু পরিবর্তনের এটি একটি নতুন চ্যালেঞ্জ। গাজীপুরের বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে বিজ্ঞানীরা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত নেত্রকোনার তিনটি উপজেলা পরিদর্শন করেছেন। তাঁদের মতে, ‘অতিরিক্ত তাপমাত্রা বাড়া অথবা কমা—দুই কারণে হিটশক বা হিট ইনজুরি হয়ে থাকে। ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসকে হিটশকের মাত্রা ধরা হয়। আক্রান্ত এলাকাগুলোতে মার্চের শেষ দিক থেকে তাপমাত্রা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছিল। ধানের ফুল আসার ধাপে উচ্চ তাপপ্রবাহ ধানের ফলনের জন্য মারাত্মক প্রভাব বয়ে আনতে পারে। এ সময়কে সবচেয়ে নাজুক অবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আর এ দফায় গরম বাতাস এমন সময় হয়েছে, যখন ওই সব এলাকায় ধান ফুল আসার ধাপে ছিল। তাই অধিক তাপে ওই সব ধানের শিষ থেকে পানি বেরিয়ে গেছে এবং পরাগরেণু শুকিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে।

এ বিষয়ে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রবন্ধ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ধানগাছের ফুল ফোটার সময়ে তাপপ্রবাহের প্রভাব স্ত্রী পুষ্পস্তবকের তুলনায় পুং পুষ্পস্তবকে অনেক গুণ বেশি। পরাগরেণু তৈরির সময় তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সে. বা এর বেশি হলে উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হয়। পরাগায়নের সময় পরাগনলের বৃদ্ধি ব্যাহত হয় এবং পরাগধানীর স্ফীত হওয়া বাধাগ্রস্ত হয়, যা সফল পরাগায়নের জন্য অপরিহার্য। পরাগধানী স্ফীত হতে না পারলে এটি ফেটে গিয়ে পরাগরেণু গর্ভমুণ্ডে ছড়িয়ে পড়তে পারবে না, পরিণামে নিষিক্তকরণ বা ফার্টিলাইজেশন সম্পন্ন হবে না। ধানের পরাগায়নের সময় তাপমাত্রার প্রভাব এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে ওই সময়ে উচ্চ তাপপ্রবাহের কারণে ধানগাছে পূর্ণাঙ্গ বন্ধ্যাত্ব দেখা দিতে পারে। গবেষণায় দেখা যায়, সফল পরাগায়নের জন্য একটি গর্ভমুণ্ডে কমপক্ষে ১০টি পরাগরেণু পতিত হতে হয়। অর্থাৎ পরাগরেণুর উর্বরতার হার ৫০ শতাংশ হলে সফল পরাগায়নের জন্য কমপক্ষে ২০টি পরাগরেণু গর্ভমুণ্ডে পতিত হতে হবে। গবেষণায় আরও দেখা যায়, হিটশকে আক্রান্ত গর্ভমুণ্ডে যদি আক্রান্ত নয় এমন উর্বর পরাগরেণু এনে পরাগায়ন করা যায়, তাহলে ধানের ফলনে কোনো প্রভাব পরিলক্ষিত হয় না। এ থেকে এটাই প্রতীয়মান, উচ্চ তাপমাত্রার প্রভাব ধানের মাইক্রোস্পোরোজেনেসিস বা পুংস্তবক তৈরিতে সবচেয়ে মারাত্মকভাবে বিঘ্ন সৃষ্টি করে।

default-image

উচ্চ তাপমাত্রার সঙ্গে বাতাসের আর্দ্রতারও একটি পরিপূরক প্রভাব রয়েছে। বাতাসে জলীয় বাষ্প বেশি থাকলে এবং বাতাসের গতি না থাকলে আমরা হয়তো ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করলাম, কিন্তু তাপমাত্রার অনুভব ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশিও হতে পারে, যা সাম্প্রতিক সময়ে বয়ে যাওয়া গরম বাতাসযুক্ত কালবৈশাখী, আর্দ্র বাতাস, হালকা গরম বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট বোরো ধানের চিটা হয়ে যাওয়া বা সাধারণ মানুষের ভাষায় পুড়ে যাওয়ার কারণ বলে প্রতীয়মান হয়।

হিটশক দেশে নতুন নয়, উল্লেখ করে গাজীপুর ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভিদ শরীরতত্ত্ব বিভাগের সাজ্জাদুর রহমান বলেন, ‘২০১২ সাল থেকে আমরা হিটশকের তথ্য রেখেছি। এ পর্যন্ত যশোর সদর, সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, গাজীপুরের কালিয়াকৈর এবং ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জে এর আগে হিটশক হয়েছে। তবে কখনো গ্রামের এক-দুইটি মাঠে বা কোনো একটি এলাকার খেতে হয়েছে। এত বড় হিটশক এটাই প্রথম।’

সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা নেত্রকোনার স্থানীয় কৃষক ও প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, এবার ১ লাখ ৮৪ হাজার ৯৮৩ হেক্টর জমিতে বোরোর আবাদ হয়েছে। ৪ এপ্রিল সন্ধ্যায় হঠাৎ গরম বাতাস শুরু হয়। যেসব এলাকা দিয়ে ওই বাতাস প্রবাহিত হয়েছে, সেসব এলাকার বোরো ধানের খেতের শিষ মরে গেছে।

নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলা সদরের কৃষক শফিকুল ইসলাম তালুকদার, এরশাদ মিয়া, মনির হোসেন ও রঞ্জিত সরকার বলেন, ‘(৪ এপ্রিল) সন্ধ্যা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত শুধু গরম বাতাস ছিল। কোনো রকম ঝড়-বৃষ্টি ছিল না। বাতাসটা অসহ্য মনে হচ্ছিল। ৫ এপ্রিল সকালে রোদ ওঠার পর হাওরে গিয়ে দেখি থোড় আসা ধান মরে শুকিয়ে গেছে।’

নেত্রকোনা কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, জেলার হাওরাঞ্চলে মোট ৪০ হাজার ৯৬০ হেক্টরে বোরোর আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাইব্রিড জাতের ধান ও বিআর-২৯ জাতের ধানে ক্ষতি বেশি হয়েছে। হাওরাঞ্চলে হাইব্রিড জাতের ধান মোট ১০ হাজার ৩৩০ হেক্টর এবং বিআর ২৯ জাতের ধান প্রায় ৭ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে রোপণ করা হয়েছিল। ওই এলাকার মদন, খালিয়াজুরী, মোহনগঞ্জ উপজেলায় বেশি ক্ষতি হয়েছে ধানের। এ ছাড়া বারহাট্টা, দুর্গাপুর, কলমাকান্দাসহ সব উপজেলা থেকে ধানের ক্ষতির খবর আসছে বলে জানিয়েছে জেলা কৃষি অফিস। তবে ক্ষতির সঠিক তথ্য এখনো দিতে পারছে না জেলা কৃষি অধিদপ্তর।
এদিকে কিশোরগঞ্জের ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রামের হাওরাঞ্চলসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় গরম বাতাসের প্রভাবে ২৫ হাজার হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়েছে। ৫ এপ্রিল জেলার করিমগঞ্জের উরদীঘি, ইটনার রায়টুটি, মিঠামইনের বড় হাওরসহ কয়েকটি হাওরে গিয়ে ধানের শিষ শুকিয়ে যাওয়ার প্রমাণ মেলে। জেলা কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, কিশোরগঞ্জে এ বছর মোট ১ লাখ ৬৬ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে বোরোর আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে জেলার হাওরাঞ্চলসহ কয়েকটি অঞ্চলের মোট ২৫ হাজার হেক্টর জমির ধান এভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে সর্বশেষ জরিপ শেষে প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণ করা যাবে। ত্রিশালসহ ময়মনসিংহের বিভিন্ন এলাকায়ও হিটশকের ছোবলে হাজারো কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।

হিটশক কাটানোর উপায় এবং প্রতিকারসমূহ

হিটশক-প্রতিরোধী জাতের চাষ: গবেষণায় দেখা যায় চাষকৃত ধানের প্রধান দুটি প্রজাতির মধ্যে Oryza glaberima Gi Zzjbvq এর তুলনায় O. sativa অধিক বেশি তাপসহনশীল, অবশ্য আমাদের দেশে এ প্রজাতিরই চাষ হয়ে থাকে। তবে জাত হিসেবে মাঝারি খর্বাকৃতির গোছা, যার ক্যানোপি বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়ে পুংস্তবকের বিকাশের জন্য তাপমাত্রা সহনশীল অবস্থায় রাখে, এমন জাত বাছাই করতে হবে। তা ছাড়াও তাপপ্রতিরোধী জাতের পরাগধানীর প্রকোষ্ঠের প্রাচীরগুলো তুলনামূলকভাবে পুরু হয়, যে কারণে পরাগধানী স্ফীত হওয়ার সময় সজোরে ফেটে পরাগরেণু দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। মার্কার অ্যাসিট্যান্ট ব্যাকক্রস পদ্ধতির মাধ্যমেও উচ্চতাপমাত্রা সহনশীল জাত উদ্ভাবন করা যেতে পারে।

কৃষি মন্ত্রণালয়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের শীর্ষ ব্যক্তিরা ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তীব্র তাপদাহের এমন পরিস্থিতিতে হিটশক থেকে ধানের ফুল বাঁচাতে জমিতে পানি ধরে রাখা এবং পরবর্তী সময়ে পাতাপোড়া থেকে রক্ষায় বিশেষ স্প্রে ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ সময় বোরো ধানের যেসব জাত ফুল ফোটার পর্যায়ে আছে বা এখন ফুল ফুটছে বা সামনে ফুল ফুটবে, সেসব জমিতে পানি ধরে রেখে ধানের ফুল ফোটা পর্যায়ে হিটশক/হিট ইনজুরি থেকে রক্ষা করতে হবে, যাতে তাপমাত্রা বেশি থাকলেও পানি থাকলে তা কুলিং সিস্টেম হিসেবে কাজ করবে। ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে যদি তাপমাত্রা রাখা যায়, তাহলে এ সমস্যা হবে না।

ঝড়ের কারণে ব্যাকটেরিয়াজনিত পাতা পোড়া বা ব্যাকটেরিয়াজনিত লালচে রেখা রোগের আক্রমণ হতে পারে। ধানে ফুল আসা পর্যায়ে রয়েছে এমন আক্রান্ত জমিতে ৬০ গ্রাম এমওপি, ৬০ গ্রাম থিওভিট ও ২০ গ্রাম দস্তা সার ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে ৫ শতাংশ জমিতে বিকেলে স্প্রে করতে হবে। তবে ধানে থোড় অবস্থায় থাকলে বিঘাপ্রতি অতিরিক্ত ৫ কেজি পটাশ সার উপরি প্রয়োগ করলে ভালো ফলন পাওয়া যেতে পারে।

বোরো ধানের এ পর্যায়ে নেক ব্লাস্ট ও শিষ ব্লাস্ট রোগের ব্যাপক আক্রমণ হতে পারে। শিষ ব্লাস্ট রোগ হলে পরে দমন করার সুযোগ থাকে না। তাই ধানের জমিতে রোগ হোক বা না হোক, থোড় ফেটে শিষ বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একবার এবং পাঁচ-সাত দিন পর আরেকবার প্রতি বিঘা জমিতে ৫৪ গ্রাম টুপার ৭৫ ডব্লিওপি অথবা ৩৩ গ্রাম নাটিভো অথবা ট্রাইসাইক্লাজল গ্রুপের অনুমোদিত ছত্রাকনাশক ৬/৭ লিটার পানিতে ভালোভাবে মিশিয়ে শেষ বিকেলে স্প্রে করতে হবে।

জমিতে বাদামি ঘাসফড়িংয়ের আক্রমণ হতে পারে উল্লেখ করে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট বলেছে, আক্রমণপ্রবণ এলাকায় কীটনাশক যেমন মিপসিন ৭৫ ডব্লিও, প্লিনাম ৫০ ডব্লিও, একতারা ২৫ ডব্লিও, এডমায়ার ২০ এসএল, সানমেক্টিন ১.৮ ইসি, এসাটাফ ৭৫ এসপিও, প্লাটিনাম ২০ এসপিও অথবা অনুমোদিত কীটনাশক এ মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে।

বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে হিটশকের কারণ এবং প্রতিকার নিরূপণে গবেষণা জোরদার করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গবেষণা সেল এবং কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। জাপান যেহেতু এ ধরনের হিটশক বহুবার মোকাবিলা করেছে, তাই তাঁদের অভিজ্ঞতা ও মতামত গ্রহণ করে তা আমাদের দেশের উপযোগী করে ব্যবহার করা যেতে পারে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের মাধ্যমে আবহাওয়ার পূর্বাভাস সারা দেশে জানিয়ে দিলে কৃষকেরা উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবেন। বিশেষ করে হাওর এলাকায় যেখানে হাজারো হেক্টর জমিতে ধান আবাদ হয়, সেখানে নিয়মিতভাবে (কিংবা বিশেষ করে ফসলের নাজুক সময়গুলোতে) আবহাওয়া ফোরকাস্টিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।
সবশেষে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং কৃষকদের মধ্যে সমন্বয় থাকলে যেকোনো পরিবর্তিত পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।

*লেখক: অধ্যাপক ড. মো. রমিজ উদ্দিন, কৃষিতও্ব বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ; ড. আ.হ.ম. আসাদুর রহমান, উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর; ড. মোহাম্মদ মোজাহিদুল ইসলাম, ডিএজিএম, এমএনটি বীজ গবেষণাগার, লালতীর সিড লিমিটেড, ঢাকা।

বিজ্ঞাপন
নাগরিক সংবাদ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন