default-image

বেকারত্ব কথাটির সঙ্গে বর্তমান সময়ে পরিচিত নয়, এমন কেউ আছে কি না, তা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ বা অন্য দেশগুলোর দিকে তাকালে আমরা বেকারত্বের হার যে ঊর্ধ্বগামী, তা দেখতে পাই। বেকারত্বের সঙ্গে নতুন মাত্রায় যুক্ত হয়েছে লকডাউন, যা কিনা বেকারত্বের হারকে আরও চরম মাত্রায় নিয়ে গেছে।

বেকারত্ব হলো এমন এক পরিস্থিতি, যা কোনো দেশের বহুসংখ্যক সুস্থ ও কর্মক্ষম ব্যক্তি, যাদের কাজ করার বয়স হয়েছে এবং কাজ করার আগ্রহ রয়েছে অথচ প্রচলিত মজুরিহারে কোনো কাজে সক্ষম হয় না। বর্তমান সময়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রকট যে সমস্যাগুলো রয়েছে, তার মধ্যে বেকারত্ব অন্যতম।

বর্তমান বাংলাদেশের বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ৭৭ হাজার বলে সম্প্রতি জানিয়েছেন শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী। তিনি আরও জানান, ২৬ লাখ ৭৭ হাজার জনের মধ্যে ১০ লাখ ৪৩ হাজার শিক্ষিত তরুণ-তরুণী, যাঁরা উচ্চমাধ্যমিক, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাস। আর ৪০ শতাংশ হলো অর্ধশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা।

বাংলাদেশের বেকারত্বের হারের দিকে তাকালে আমরা উচ্চশিক্ষিতদের বেশি দেখতে পাই। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বেকারের সংখ্যা প্রায় তিন কোটি। প্রতিষ্ঠানটি আরও আভাস দিয়েছে, কয়েক বছরে তা দ্বিগুণ হয়ে ৬ কোটিতে দাঁড়াবে, যা মোট জনসংখ্যার ৩৯ দশমিক ৪০ শতাংশ হবে। আইএলওর হিসেবটিকে পর্যবেক্ষকেরা বাংলাদেশের প্রকৃত বেকারের সংখ্যা মনে করে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশে একে তো বেকারত্বের সমস্যা, তার মধ্যে নতুন মাত্রায় যুক্ত হয়েছে লকডাউন। কোভিড-১৯ প্রতিরোধে লকডাউন শব্দটি বারবার উচ্চারিত হচ্ছে। লকডাউনে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় বেকাররা, দিন এনে দিন খাওয়া মানুষ, দিনমজুর ও সাধারণ মানুষ। এই সমস্যাগুলো আগে থেকেই ছিল আমাদের দেশে, তবে লকডাউনে সেগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।

করোনা সংকট মোকাবিলায় অনেক প্রতিষ্ঠান, অফিস, পোশাক, শিল্পকারখানা কর্মী ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত নেয়, যা বেকারত্বের হারকে অনেকাংশে বাড়িয়ে দিয়েছে। আর এই প্রতিষ্ঠানগুলোতেই কাজ করে দেশের কর্মক্ষম মানুষের ৮০ শতাংশ। আর একজন কর্মী ছাঁটাইয়ের মধ্য দিয়ে তার পরিবার সমস্যায় পড়ে, একজন বেকারের সংখ্যা বাড়ে এবং রাষ্ট্র একজন দক্ষ কর্মী হারায়, যা যেকোনো দেশের জন্য কল্যাণকর নয়।
আইএমএফের হিসাবমতে, চাকরি হারানো মানুষের সংখ্যা কম হবে না। সারা বিশ্বে যখন এ সমস্যা দেখা দেবে, তার মধ্যে বাদ যাবে না যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালি, চীন, ফ্রান্স ও ব্রাজিলের মতো বড় বড় দেশ। সেই দিকে তাকালে বেকারত্বের হারটা হবে অজানা।

বর্তমান কোভিড-১৯–এর দিকে তাকিয়ে বেকারত্ব ও লকডাউনের হিসেব মিলাতে গেলে জীবন ও জীবিকা হয়ে উঠে একে অপরের পরিপূরক। আমাদের বেকারত্ব থেকে যেমন মুক্তি পাওয়া দরকার, তেমনি লকডাউন ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঘরে থাকাটাও প্রয়োজন। সরকার বেকারত্বের সমস্যার সমাধান করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে এবং বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা, পোশাকশিল্পের মালিকদের ও এগিয়ে আসতে হবে। শুধু যে চাকরি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে সমস্যার সমাধান করা যাবে তা না, নিজেদের ও উদ্যোগ নিতে হবে।

বর্তমান সময়ে তরুণ-তরুণীরা উদ্যোক্তা হওয়ার দিকে এগিয়ে আছে এবং তা দেখে বয়স্করাও অনুপ্রাণিত হচ্ছেন। উদ্যোক্তাদের দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে আরও ১০ জন যখন কাজে যুক্ত হচ্ছে, তা থেকে কিন্তু ওই ১০ জনই বেকারত্ব থেকে মুক্তি পাচ্ছে। আর তা থেকে সরকার ও অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন। বর্তমান সময়ে অনলাইনভিত্তিক সব কাজই করা যায়, যেটা কিনা পেশা হিসেবেও নেওয়া যায়, যা কিনা আমরা ঘরে বসেই করতে পারছি, তাতে আমাদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঘরে থাকাও হচ্ছে।

মোটকথা, সরকারের প্রচেষ্টা ও আমাদের সহযোগিতাই পারে এই সমস্যার সমাধান করতে। করোনাভাইরাসের জন্য বেকারত্বের হার অনেকাংশে বেড়ে গেছে ঠিকই, তবে এই সমস্যা অনেক আগে থেকেই ছিল। যার সমাধান একেবারে করা সম্ভব না। আমাদের সবার সহযোগিতাই পারে সমস্যার সমাধান করতে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে কাজ করি এবং কোভিড-১৯ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য নিজে সচেতন থাকি এবং অন্যকে সচেতন করি। দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও কার্বন নিঃসরণ শূন্যের পর্যায়ে থাকবে—এমন একটি বিশ্বের কথা কল্পনা করি আমরা।

বিজ্ঞাপন
নাগরিক সংবাদ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন