বিজ্ঞাপন

আমাদের চারপাশের উদ্ভিদ, প্রাণী, মাটি, পানি, বায়ু, জড়বস্তু, জৈব-অজৈব পদার্থ সবকিছু নিয়েই আমাদের পরিবেশ। আমাদের জানা মতে, এখন পর্যন্ত একমাত্র পৃথিবীতেই মানুষের বসবাসের উপযোগী পরিবেশ রয়েছে। কিন্তু মানুষের নির্বিচার কর্মকাণ্ডের জন্য ক্রমেই পৃথিবীর পরিবেশ দূষিত হয়ে মানুষের বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। কলকারখানা ও যানবাহনে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার, বনাঞ্চল নিধন, জৈব বর্জ্যের পচন প্রভৃতি কারণে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, গত ১০০ বছরে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি বৃদ্ধি পেয়েছে। আগামী ১০০ বছরে তাপমাত্রা যদি আরও ১ ডিগ্রি বৃদ্ধি পায়, তাহলে পৃথিবীতে বড় ধরনের পরিবেশ বিপর্যয় ঘটবে। এ ছাড়া বাতাসে ধোঁয়া, ধুলোবালু, ড্রপলেট, বিষাক্ত সিসা, বস্তুকণা বা পার্টিকুলেট মেটার ও বিষাক্ত গ্যাসের পরিমাণ বেড়েছে উদ্বেগজনক হারে। এ কারণে শ্বাসতন্ত্রের জটিল রোগ, ক্যানসারসহ নানাবিধ ভয়ানক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ।

default-image

সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বায়ুদূষণের কারণে ২০১৯ সালে বাংলাদেশে প্রাণ হারিয়েছেন ১ লাখ ৭৩ হাজার ৫০০ জন এবং গোটা বিশ্বে এই সংখ্যা ৬৭ লাখ। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক সংস্থা আইকিউএয়ারের তালিকা মতে, ২০২০ সালে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত দেশ বাংলাদেশ, দ্বিতীয় পাকিস্তান এবং তৃতীয় ভারত। ল্যানসেটের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রতি চারজনের মধ্যে একজনের মৃত্যু হয় পরিবেশগত দূষণে। বর্তমানে কিছু গবেষণা বলছে, বায়ুদূষণের কারণে কোভিড-১৯ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া এবং কোভিডে আক্রান্ত রোগীদের শারীরিক জটিলতা বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে। আবার কিছু গবেষণায় জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশদূষণ ও কোভিড-১৯ মহামারির মধ্যে পারস্পরিক সম্ভাব্য সংযোগের কথা প্রকাশ করা হয়েছে।

শিল্পকারখানার বর্জ্য, মিউনিসিপ্যাল বর্জ্য, মেডিকেল বর্জ্য, গৃহস্থালি বর্জ্য, কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহৃত কীটনাশক প্রভৃতি নদী, খাল, বিলের পানিকে দূষিত করে তুলছে। দখলে-দূষণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে আমাদের নদী ও অন্যান্য প্রাকৃতিক জলাশয়। এ কারণে পৃথিবীর জলজ পরিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে; ধ্বংস হচ্ছে বাস্তুতন্ত্র। মানুষসহ অন্য প্রাণীরা আক্রান্ত হচ্ছে নানা জটিল ও কঠিন রোগে। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে পানীয় জলের সংকট অনেক তীব্র হয়েছে। এ ছাড়া মাটিদূষণ, শব্দদূষণ, তেজস্ক্রিয়তা প্রভৃতি ক্রমাগত পৃথিবীর পরিবেশকে বসবাসের অনুপযোগী করে তুলছে। ইতিমধ্যে মানুষ যুদ্ধক্ষেত্রে ভয়াবহ মর্মান্তিক পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ প্রত্যক্ষ করেছে। ভোপাল দুর্ঘটনা, চেরনোবিল দুর্ঘটনাসহ নানা রাসায়নিক দুর্ঘটনায় মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে মহাকাশ থেকে চীনের লংমার্চ ফাইভবি রকেটের ধ্বংসাবশেষ পৃথিবীতে পড়া নিয়ে সারা বিশ্বে গভীর উদ্বেগ লক্ষ করা গেছে। বিবিসির এক খবরে বলা হয়েছে, বর্তমানে ২০০ স্যাটেলাইট আবর্জনায় পরিণত হয়ে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে, যা যেকোনো সময় টাইমবোমার মতো বিস্ফোরিত হতে পারে বা অন্য কোনো স্যাটেলাইটের ওপর আছড়ে পড়ে ভয়ংকর কিছু ঘটাতে পারে। সুতরাং রকেট বা স্যাটেলাইটের মতো এসব মহাকাশ বর্জ্য পৃথিবীতে ভয়ংকর কোনো বিপর্যয় ডেকে আনার আগেই এগুলো নিয়ে ভাবতে হবে।

default-image

জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প ব্যবহার, কার্বন নির্গমন হ্রাস, পানিদূষণ রোধ, বিশুদ্ধ পানীয় জলের পর্যাপ্ত সরবরাহ, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ, কীটনাশকের বিকল্প ব্যবহার, পলিথিনের বিকল্প ব্যবহার, পারমাণবিক অস্ত্র ও জীবাণু অস্ত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা বর্তমানে মানবজাতির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতিসংঘের একার পক্ষে বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার করা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ করে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব নয়। এই বৈশ্বিক সমস্যা মোকাবিলায় আমাদের প্রত্যেকের নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করার দৃঢ় অঙ্গীকারই হোক বিশ্ব পরিবেশ দিবসের চেতনা।

লেখক: গবেষক, পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

নাগরিক সংবাদ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন