বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সেই ভাষণ ছুঁয়ে যায় তাঁদের। ইতিহাস তৈরি করে ফেলেন তাঁরা। সেই চায়ের আড্ডায় চারমিনার সিগারেটের প্যাকেটের ভেতরে একদিকে সাদা যে কাগজটা থাকে, সেই কাগজ বের করে গৌরীদা কিছু একটা লিখতে থাকেন। মাঝেমধ্যে টুকটাক কথাবার্তাও বলছিলেন গৌরীদা। সেই থেকে শুরু। আজও বেজেই চলেছে—
‘শোনো, একটি মুজিবরের থেকে
লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি, প্রতিধ্বনি
আকাশে-বাতাসে ওঠে রণি।
বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ।’

বিজয়ের মাস। চারদিক থেকে ভেসে আসে সুরের মূর্ছনা। সেই মূর্ছনা দেশের গানের, দশের গানের, দেশাত্মবোধক গানের। আমাদের একাত্তর প্রজন্মের গানের। আহ! কী হৃদয়ছোঁয়া সেসব গান। স্বার্থপর এ দুনিয়ায় ব্যস্ততার মধ্যে সেসব গান শুনলে এখনো থমকে দাঁড়াতে হয়। তাই তো এখনো শুনি; হৃদয়ে দোলা লাগে-আজ ১৬ ডিসেম্বর। আমাদের বিজয় নিশান আকাশে উড়ছে। উঁচুতে অনেক উঁচুতে—
‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে
বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা
আমরা তোমাদের ভুলব না...
ভুলব না...’
প্রতিবছর ১ ডিসেম্বর প্রহর গোনা শুরু হয়। সবার আগে আপেল মাহমুদ যখন গেয়ে ওঠেন, ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে, রক্তলাল রক্তলাল রক্তলাল’, তখনই টের পাই আজ ডিসেম্বরে পা রাখলাম আমরা। এ ডিসেম্বর এমন এক ডিসেম্বর, যেখানে দুঃখ-সুখ আর বেদনা মিলেমিশে একাকার। হারানোর ডিসেম্বর আবার বিজয়েরও ডিসেম্বর।

একাত্তরে আবার ফিরে যেতে হয়। একদিকে বেঁচে থাকা স্বজনের মনে ভাই হারানো, বোন হারানোর বেদনা; অন্যদিকে নতুন সূর্যের অপেক্ষা। সুদীর্ঘ সেই অপেক্ষার অবসান হবে এ আশা। অস্ত্র হাতে যুদ্ধ তখনো শেষ হয়নি, কিন্তু ইতিমধ্যে প্রায় ৯ মাস পেরিয়ে গেছে। এখনো এল না বিজয়। বাঙালি পেছনে তাকিয়ে দেখে, তাদের উদ্বুদ্ধ করেছিল গাজী মাজহারুল আনোয়ার। তিনিই আবদুল জব্বার আর শাহনাজ বেগমকে সুর ধরতে বলেছিল, কণ্ঠ দিতে বলেছিল। তার পর থেকে বাংলার মানুষের মনেপ্রাণে সেই কোরাসের ধ্বনি—
‘জয় বাংলা বাংলার জয়
হবে হবে হবে, হবে নিশ্চয়
কোটি প্রাণ একসাথে জেগেছে অন্ধরাতে
নতুন সূর্য ওঠার এই তো সময়...’
নতুন সেই সূর্যের আলোয় বাংলার দামাল ছেলেরা ঘোর বর্ষায় অস্ত্র হাতে পজিশন নিয়ে প্রতীক্ষা করে আছে। সেই প্রতীক্ষা কখনোবা অন্ধকার রাতে, কখনোবা মেঘাচ্ছন্ন গুমোট প্রভাতে। তিক্ত-বিরক্ত সেই অনুভূতির প্রতীক্ষা শত্রুর জন্য! কী নিদারুণ সেই অপেক্ষা। শত্রু দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়বে! নিস্তার নেই হানাদারদের। দৃঢ় সেই মন্ত্র। সেই প্রহরে ঠিক তাদের জন্যই যেন হাজির হন আপেল মাহমুদ। যখন ক্লান্ত শরীর, মন হতাশায় ছেয়ে যায় চারপাশ, ঠিক তখনই গোবিন্দ হালদারের লেখায় আপেল মাহমুদ গেয়ে ওঠেন—
‘নতুন একটি কবিতা লিখতে যুদ্ধ করি
নতুন একটি গানের জন্য যুদ্ধ করি
মোরা একখানা ভালো ছবির জন্য যুদ্ধ করি
মোরা সারা বিশ্বের শান্তি বাঁচাতে আজকে লড়ি।
যে মাটির চিরমমতা আমার অঙ্গে মাখা
যার নদী জল ফুলে ফলে মোর স্বপ্ন আঁকা
যে দেশের নীল অম্বরে মন মেলছে পাখা
সারাটি জনম সে মাটির টানে অস্ত্র ধরি।
মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি।’

আবার শক্ত হাতে পরিণত কৃষকের মতো হাল ধরা। দীপ্ত শপথে এ গানের প্রতিটি কলি, প্রতিটি কথা ছেলেদের মনে আর মাঠে-ঘাটে-বন্দরে, ঘরে-বাইরে যুদ্ধরত প্রতিটি প্রাণে স্পন্দিত হতে থাকে। এ সম্মিলিত মনের শক্তি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সুসজ্জিত কামানের গোলার মুখে ঝাঁপিয়ে পড়ে, নির্ভয়ে। শেষ হয়ে যায় তাজা প্রাণ। অকাতরে বিলিয়ে দেয় নিজের জীবন। এভাবেই সেপ্টেম্বর যায়, অক্টোবর যায়, নভেম্বরও চলে যায়। শুরু হয় ডিসেম্বর। কঠিন বিপৎসংকুল সময় পাড়ি দিয়ে, নব উদয়ের নব প্রাণের প্রতীক্ষা।

আসে ২ ডিসেম্বর; এরপর ৩, ৪, ৫—এগোতে থাকে। দিন যত এগোয়, একে একে ভেসে আসতে থাকে সুরের মূর্ছনা। বাংলার আকাশে-বাতাসে দেশের গান, দশের গান। একটি একটি করে নতুন নতুন এলাকা ও জেলা হানাদারমুক্ত হতে থাকে। বাংলার মুক্তিযোদ্ধাদের অপেক্ষার প্রহর, কবে আসবে বিজয়! ঠিক যেন ‘আর পারছি না। মুক্তি চাই। মুক্তি। আমার মন বাড়ি ফিরতে চায়’ অনুভূতি। সেই সময়, শাহনাজ রহমতুল্লাহ হাজির হন সাবিনা ইয়াসমীনকে সঙ্গে নিয়ে। গেয়ে ওঠেন—
‘একবার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়
যেথায় কোকিল ডাকে কুহু
দোয়েল ডাকে মুহু মুহু
নদী যেথায় ছোটে চলে আপন ঠিকানায়...
একবার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়।’

default-image

কিন্তু কবে ফিরতে পারবে সোনার ছেলেরা সোনার গাঁয়ে! এখনো কেন বিজয় আসছে না! আর কত যুদ্ধ করা যায়? না জানি বাড়িতে কী অবস্থা! মা-বাবা আত্মীয়স্বজন সবাই আছে তো? কিন্তু মন যতই উতলা হোক, উচাটন থাকুক, সাগরে উত্তাল তরঙ্গ বাড়তেই থাকে। ঝড় যতই বাড়ুক, শক্ত হাতে হাল ধরে যুবারা। তরিকে যে তীরে টেনে নিতেই হবে। গোটা বাংলা তাদের আশায় পথ চেয়ে আছে। ঠিক তখনই আবার হাজির হন আপেল মাহমুদ। গেয়ে ওঠেন—
‘তবু তরি বাইতে হবে
খেয়া পাড়ি দিতেই হবে
যত ঝড় উঠুক সাগরে।
তীরহারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দিব রে।’
ইংরেজি ডিসেম্বর মানে বাংলার অগ্রহায়ণ-পৌষ মাস। হেমন্তের শেষে শীতের কুয়াশা। এরই মধ্যে আমাদের বিজয়ের পতাকা, লাল-সবুজ নিশান। এখন, এ সময়ে মোবাইল, ল্যাপটপ, আইপড, ডেস্কটপে হেডফোন কানে লাগিয়ে সবাই হয় গান, নয়তো খবর শোনেন। সবই ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু প্রতিবছর ঘুরেফিরে যখনই ডিসেম্বর মাসটা আসে, ডিসেম্বর হয়ে যায় সবার। বাতাসে ভাসতে থাকে আনন্দ ও বেদনার খবর। কিন্তু আবার যখন সাবিনা ইয়াসমীন হাজির হন, পরিস্থিতি পাল্টে যায়। চঞ্চল পরিবেশ থমকে যায়। কানে ভেসে আসে—
‘সব কটা জানালা খুলে দাও না
আমি গাইব গাইব বিজয়েরই গান।
ওরা আসবে চুপিচুপি
যারা এই দেশটাকে ভালোবেসে দিয়ে গেছে প্রাণ।’

হুম, ১৪ ডিসেম্বর। যদিও শীতকাল, তবু সব কটা জানালা খোলা থাকবে। খোলা রাখতেই হবে। যদি কখনো ওরা ফিরে আসে! ঘরের জানালা এবং মনের জানালা—সব। সব জানালা খোলা থাকবে। কেননা এই ঘর, এই জানালা আমাদের নয়। বাংলার এই সবুজ, এই মাটি, এই নদী, আমাদের নয়। বাংলাদেশটাও আমাদের নয়, এটা ওদের। এই অধিকার একমাত্র ওদেরই আছে। যারা এই দেশটাকে ভালোবেসে দিয়ে গেছে প্রাণ।

দিয়ে গেছে জীবন। তাদের আমাদের স্বাগত জানাতে হবে। ফুলের শুভেচ্ছা জানাতে হবে। আর সেই ফুলের রং হবে সাদা। অবশ্যই সাদা। কখনোই লাল নয়; কারণ, বাংলার বেদনার রং লাল। তাই তো আবার শাহনাজ রহমতুল্লাহ হাজির হন। খান আতাউর রহমান তাঁর কণ্ঠে তুলে আনেন—
‘এক নদী রক্ত পেরিয়ে
বাংলার আকাশে রক্তিম সূর্য আনলে যারা
তোমাদের এই ঋণ কোনো দিন শোধ হবে না।
না না না শোধ হবে না...’
প্রতিদিন পাখির কলতানে ঘুম ভাঙে খোকার। কিন্তু ২০৩০ সালে শীতের ভোরে কলকাকলিতে নয়, গানের শব্দে ঘুম ভাঙল ছোট্ট খোকার। সবে ১২ বছর বয়স। কী আর বোঝে সে! আনমনে সে শুধু সুর শুনতে পায়। সকালের শুভ্র বাতাসে ভেসে আসে সেই সুর। ভালো করে কান পেতে শোনে খোকা—

‘হয়তোবা ইতিহাসে তোমাদের নাম লেখা রবে না...’
এরপর কাউকেই বলে দিতে হয় না। গানের এ লাইন শুনেই সে বুঝতে পারে, আজ আর অন্য দশটা দিন নয়। আজ স্কুলে ক্লাস-পড়া কিছুই নেই। আছে শুধু গান আর গান। ডিসেম্বর এলেই খোকার মনে গান বেজে ওঠে। খোকা ঠিক করে রেখেছে স্কুলে আজ গানটি গাইবে সে—
‘বিশ্বকবির সোনার বাংলা, নজরুলের বাংলাদেশ,
জীবনানন্দের রূপসী বাংলা
রূপের যে তার নেইকো শেষ, বাংলাদেশ।
জয় বাংলা বলতে মন রে আমার এখনো কেন ভাবো,
আমার হারানো বাংলাকে আবার তো ফিরে পাব,
অন্ধকারে পুবাকাশে উঠবে আবার দিনমণি।’
আধো ঘুমে এটা ভাবতেই আনন্দে ভরে ওঠে খোকার মন। বিছানা থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসে সে। কেননা, আজ ওর বিজয় দিবস।

*লেখক: হাসান নিটোল: রিসার্চ ফেলো, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রিসার্চ ইনস্টিটিউট ফর পিস অ্যান্ড লিবার্টি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

*নাগরিক সংবাদে লেখা পাঠাতে পারেন [email protected]

নাগরিক সংবাদ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন