বিজ্ঞাপন

বাজেট মূলত একটি অর্থনৈতিক দলিল, যা অর্থনীতিবিদদের পরামর্শক্রমে প্রণীত হয়ে থাকে। অবশ্য বাজেট তৈরিতে রাজনৈতিক দর্শনের একটি বড় ভূমিকা থাকে। তবে মোটাদাগে বলা যায়, এটি অর্থনীতিবিদদের চিন্তাপ্রসূত। অর্থনীতি বিষয়টাই আসলে ভীষণ গোলমেলে। অর্থনীতিবিদদের সম্বন্ধে একটি প্রচলিত কথা, দশজন অর্থনীতিবিদ একত্র হলে এগারোটা মতামতের জন্ম হয়। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান একবার বলেছিলেন, তিনি এমন একজন অর্থনৈতিক উপদেষ্টা চান, যাঁর থাকবে একটি হাত। কেন? প্রতিবারই প্রেসিডেন্ট যখন তাঁর উপদেষ্টার পরামর্শ চান, ভদ্রলোক তাঁকে বলেন, ‘on one hand and on the other hand …’ ! অর্থনীতিবিদদের মধ্যে মতানৈক্য নিয়ে একটি প্রচলিত কৌতুক, অর্থনীতির প্রথম সূত্র: প্রত্যেক অর্থনীতিবিদেরই একজন সমান ও বিপরীত অর্থনীতিবিদ আছেন। দ্বিতীয় সূত্র: তাঁরা উভয়ই ভুল বলেন। অর্থনীতিবিদেরা নিজেরাই যেখানে কোনো বিষয়ে একমত হতে পারেন না, সেখানে অন্যদের অবস্থা কী হবে সহজেই অনুমেয়।

সাধারণত অর্থনীতির তত্ত্বগুলো বিভিন্ন পূর্বশর্ত (preconditions) ও পূর্বধারণার (assumptions) ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। এই যেমন চাহিদাবিধি। এ তত্ত্বমতে, কোনো পণ্যের দাম হ্রাস পেলে চাহিদা বাড়ে, দাম বেড়ে গেলে চাহিদা হ্রাস পায়। তবে শর্ত থাকে, সে ক্ষেত্রে বিকল্প ও পরিপূরক পণ্যের দাম, ক্রেতার আয়, রুচি, অভ্যাস, সংখ্যা ইত্যাদি অপরিবর্তিত থাকতে হবে। এত সব পূর্বশর্তের বেড়াজালে বাস্তবে সাধারণত কোনো ঘটনা ঘটে না। এ কারণে অর্থনীতিবিদেরা সহজেই পার পেয়ে যান।

default-image

কোনো ঘটনা না ঘটলে বা পূর্বাভাস সঠিক না হলে এক বা একাধিক পূর্বশর্ত বা পূর্বধারণার ওপর দিব্যি দোষ চাপিয়ে পার পাওয়া যায়। যেমন গত বাজেটে ২০২০-২১ সালের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার প্রাক্কলন করা হয়েছিল ৮ দশমিক ২ শতাংশ। ধারণা করা হয়েছিল, মহামারি কাটিয়ে ওঠে দেশ আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যাবে। বছর শেষে দেখা যাচ্ছে, বিগত অর্থবছরে আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে আনুমানিক ৬ দশমিক ১ শতাংশ। প্রশ্ন জাগে, প্রবৃদ্ধি কেন কম হলো? সহজ উত্তর—মহামারির ধাক্কা কাটিয়ে ওঠে অনেক ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু করা যায়নি। এর সঙ্গে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে এসেছে চতুর্থ প্রান্তিকে শুরু হওয়া করোনার দ্বিতীয় ঢেউ। গত বছর জুনে যখন প্রবৃদ্ধির এই হার প্রাক্কলন করা হয়, তখন তো দেশে মহামারি ভয়াবহভাবে জেঁকে বসেছিল। তাহলে কিসের ভিত্তিতে ভাবা হয়েছিল, এটি এত দ্রুত নিরাময় হবে অথবা নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে? অর্থনীতির এই পূর্বাভাস নিয়ে সর্বত্র চলে বেশ হাসি-তামাশা। একসময় আবহাওয়ার পূর্বাভাস নিয়ে হতো সবচেয়ে বেশি হাসি-ঠাট্টা। যদিও সম্প্রতি প্রযুক্তির কল্যাণে আবহাওয়ার পূর্বাভাসের বেশ উন্নতি হয়েছে, তবে অর্থনীতির পূর্বাভাস রয়ে গেছে সেই তিমিরেই। এ নিয়ে কিছু কৌতুক: ঈশ্বর কেন অর্থনীতিবিদ তৈরি করেছিলেন? যাতে আবহাওয়ার পূর্বাভাস অন্তত কিছুটা ভালো দেখায়। কেন জ্যোতিষশাস্ত্র আবিষ্কার হয়েছিল? যাতে মনে হয় অর্থনীতি সত্যিকার অর্থে একটি বিজ্ঞান। একজন অর্থনীতিবিদ জানেন না, তিনি আসলে কী বলছেন। তবে এমন ভাব করবেন যেন সব দোষ অন্যদের। তিনি আগামীকাল বলতে পারবেন, গতকাল তাঁর করা পূর্বাভাস কেন সঠিক হয়নি।

অর্থনীতির বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত নিয়েও আছে নানা রকমের প্রশ্ন ও সংশয়। যেমন আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধির সঠিক হার আসলে কত? বিশ্বব্যাংক বলেছে, ২০২০-২১ সালে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। অন্যদিকে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) হিসাব অনুযায়ী এ হার ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মতে ৫ শতাংশ। কেন হিসাবের এই গরমিল? হিসাব মেলানো বা হিসাব বিশ্লেষণে অর্থনীতিবিদেরা দারুণ সৃজনশীল। কথিত আছে, একবার এক নির্জন দ্বীপে দুজন অর্থনীতিবিদ আটকা পড়েছিলেন। তাঁদের কারও কাছে কোনো অর্থ ছিল না, তবুও তিন বছর তাঁরা কোটি টাকা আয় করেছিলেন পরস্পরের কাছে নিজের টুপি বিক্রি করে!

কোনো দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা মূল্যায়নের জনপ্রিয় সূচক হচ্ছে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার। সব হিসাবেই দেখা যাচ্ছে, দেশে গত বছর প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তার মানে দেশের অর্থনীতি আগের বছরের তুলনায় ভালো অবস্থায় আছে। কিন্তু বাস্তবতা কী আসলেই তা–ই? ইদানীং বেশ জোরেশোরে আলোচনা হচ্ছে নতুন দরিদ্র জনগোষ্ঠী নিয়ে। কোভিড মহামারির কারণে দেশে দারিদ্র্যের মাত্রা বেড়েছে। বিআইডিএসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে গড় দারিদ্র্যের হার ২৫ শতাংশ। অন্যদিকে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী দারিদ্র্যের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২ শতাংশে। ২০১৯ সালে দারিদ্র্যের হার ১৯ শতাংশে নেমেছিল। তাহলে যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলো তার সুফল গেল কোথায়? বিষয়টি সেই গল্পের মতো মনে হয়। একজন অর্থনীতিবিদ রেস্তোরাঁয় গিয়ে পিৎজা চাইলেন। ওয়েটার জানতে চাইলেন, ‘স্যার, পিৎজা কি ছয় টুকরা করব, না আট টুকরা?’ অর্থনীতিবিদ বললেন, ‘আমি ভীষণ ক্ষুধার্ত, আট টুকরাই করুন।’ বর্তমানে অনেক প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ একটি দেশের অর্থনৈতিক সাফল্য নির্ধারণে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হারকে সূচক হিসাবে মানতে নারাজ। তাঁদের মতে, আয় বৈষম্য, দারিদ্র্য, পুষ্টি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নতি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বাজেটের আরেকটি গোলমেলে বিষয় হলো ঘাটতি বাজেট। গুরুজনেরা সব সময় বলেন, আয় বুঝে ব্যয় করো, অর্থাৎ ব্যয় যেন আয়ের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হয় এবং পারলে ভবিষ্যতের জন্য কিছু সঞ্চয় করো। বেশ কয়েক বছর ধরেই আমরা দেখতে পাচ্ছি ঘাটতি বাজেট, মানে আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি। এবারের বাজেটের কথাই ধরা যাক—প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা। বাজেট ঘাটতি ২ লাখ ১৪ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৬ দশমিক ২ শতাংশ। এই বাড়তি টাকার সংস্থান হবে কীভাবে? সহজ উত্তর—বেশির ভাগ ঘাটতি মেটানো হবে ঋণ নিয়ে আর কিছু অংশ মিটবে বৈদেশিক অনুদান দিয়ে। কী ধরনের বাজেট আসলে কার্যকর, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে মতভিন্নতা আছে। সাধারণত তিন ধরনের বাজেট হতে পারে: ভারসাম্যপূর্ণ বাজেট, যেখানে আয় আর ব্যয় সমান সমান; উদ্বৃত্ত বাজেট—আয়ের তুলনায় ব্যয় কম আর ঘাটতি বাজেট, যেখানে আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি। একশ্রেণির অর্থনীতিবিদ মনে করেন, উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য ঘাটতি বাজেট উপযোগী।

কেননা, এতে বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়। স্বাভাবিক যুক্তিতে ঋণ নিয়ে যদি তা উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করা হয় এবং তার থেকে যদি আয় ব্যয়ের তুলনায় বেশি হয়, তবে অবশ্যই ঋণ করা অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। এক ব্যক্তি ভাড়া বাড়িতে বাস করেন এবং প্রতি মাসে ভাড়া বাবদ তাঁর ২৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়। যদি এমন হয় যে তিনি ঋণ করে একটি বাড়ি কিনলেন এবং এর জন্য সুদাসল বাবদ তাঁকে দিতে হবে মাসে ২৪ হাজার টাকা, সে ক্ষেত্রে ঋণ করা তাঁর জন্য লাভজনক হবে। কেননা, তাঁর খরচ কম হবে, এমনকি খরচ সমান থাকলেও একটা সময় পর তিনি ওই বাড়ির মালিক হবেন। এ ক্ষেত্রে বিবেচ্য বিষয় দুটি হলো ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য এবং লাভজনক খাতে বিনিয়োগ। আমাদের এখানে দুর্ভাগ্যজনকভাবে উন্নয়ন খাতে ব্যয়ের ক্ষেত্রে দুর্নীতি, অপচয় ও অদক্ষতার কারণে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জিত না হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সে ক্ষেত্রে ঋণের বোঝা বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এক হিসাবে দেখা যায়, আগামী অর্থবছরে আমাদের ঋণের সুদ বাবদ গুনতে হবে ৬৯ হাজার কোটি টাকা। অনুন্নয়ন খাতে ব্যয়ের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্ক থাকতে হবে, যাতে অপচয় রোধ করা যায়। রাজস্ব আয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, আপাতদৃষ্টে তা বেশ উচ্চাভিলাষী মনে হচ্ছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রথম ১০ মাসে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৬৬ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। বাকি দুই মাসে অবশিষ্ট ৩৪ শতাংশ আদায় করা চ্যালেঞ্জিং হবে। অনেকেই প্রশ্ন করেন, এই লক্ষ্যমাত্রা কি বাস্তবসম্মত না কল্পনাপ্রসূত?

default-image

অর্থনীতিবিদেরা অনেক সময় কল্পনার জগতে বাস করেন। এ নিয়ে একটা জনপ্রিয় গল্প আছে। একজন পদার্থবিজ্ঞানী, একজন রসায়নবিদ ও একজন অর্থনীতিবিদ একটি দ্বীপে আটকা পড়েছেন। তাঁরা ছিলেন ভীষণ ক্ষুধার্ত। হঠাৎ তাঁরা দেখতে পেলেন, একটা কর্ন স্যুপের ক্যান ভেসে আসছে। তাঁরা ভাবতে লাগলেন, এটি কী করে খোলা হবে? পদার্থবিজ্ঞানী বললেন, ‘একটা পাথর দিয়ে আঘাত করে ক্যানের মুখটা আলগা করে ফেলি।’ রসায়নবিদ বললেন, ‘আগুন জ্বালিয়ে ক্যানটা ফেলে দিই, তাহলে তাপে এর মুখ খুলে যাবে।’ অর্থনীতিবিদ এই দুই ধারণা নাকচ করে দিলেন। কেননা, তাতে স্যুপ মাটিতে গড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আছে। তিনি বললেন, ‘ধরো, আমাদের কাছে একটা ক্যান ওপেনার আছে …!’

বাজেট নিয়ে বিতর্ক নতুন কিছু নয়। যত দিন অর্থনীতির মতো জটিল বিষয় থাকবে, তত দিন এই বিতর্ক অব্যাহত থাকবে। একটা কৌতুক দিয়ে শেষ করি—বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির প্রথম দিনে ঈশ্বর সূর্য তৈরি করলেন। জবাবে শয়তান তৈরি করল রোদে পোড়া (সানবার্ন) রোগ; দ্বিতীয় দিনে ঈশ্বর তৈরি করলেন প্রেম আর তা দেখে শয়তান তৈরি করল বিচ্ছেদ; তৃতীয় দিনে সৃষ্টিকর্তা অর্থনীতিবিদ তৈরি করলেন। শয়তান ভীষণ বিপদে পড়ে গেল। অনেক ভেবেচিন্তে সে তৈরি করল দ্বিতীয় আরেকজন অর্থনীতিবিদ। সেই থেকে অর্থনীতি নিয়ে বিতর্ক চলমান।

*লেখক: সাজ্জাদুল হাসান, একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে কর্মরত

নাগরিক সংবাদ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন