default-image

চার বছর ক্ষমতায় থেকে বিশ্বরাজনীতিকে উত্তপ্ত করে মেয়াদের অন্তীম মুহূর্তে এসেও রাজনীতি ও কূটনৈতিক মহলে তীব্র হইচই ফেলে সাবেক হয়ে হোয়াইট হাউস ছাড়েন ডোনাল্ড ট্রাম্প। নির্বাচনী ইশতেহারে নানা প্রত্যাশার ফুলঝুরি দিয়ে উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে শান্তির বীণা বাজিয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। ক্ষমতার পালাবদলে সবাই ভেবেছিলেন আমেরিকার নেতৃত্ব এবার শান্তির পথে। কিন্তু প্রভাবশালী গণমাধ্যম ও বাঘা বাঘা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের সমীকরণ পাল্টে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে আশায় যেন হতাশাই নেমে আসছে। জো বাইডেনের কাজ সবার প্রত্যাশাচ্যুত হচ্ছে। তাঁর পররাষ্ট্রনৈতিক অবস্থান ট্রাম্পের চেয়ে আরও যুদ্ধসুলভ মনে হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটা কথা প্রচলিত আছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় যে–ই আসুক না কেন, পররাষ্ট্রনীতিতে কোনো পরিবর্তন হয় না। এ কথা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মানানসই, কিন্তু জো বাইডেনের নির্বাচনী ইশতেহার এবং বিশ্ব সম্প্রদায় সমীপে শান্তির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে যুদ্ধের বিপরীতে শান্তির জন্যই কাজ করা দরকার। জো বাইডেনের অধ্যবসায়ী দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন অধ্যয়ন এবং শান্তির নির্যাসমিশ্রিত প্রথম বক্তৃতা শোনার পর সবাই ভেবেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ ছাড়াই তার নেতৃত্ব পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করবে। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের পর তাঁর পররাষ্ট্রনৈতিক কর্ম মোটেও বাস্তবতার মুখ দেখছে না। কয়েক দিন পরই হোয়াইট হাউসে তাঁর শত দিন পূর্ণ হবে। ইতিমধ্যে বাইডেন প্রশাসনের কয়েকটি আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ বিশ্ববাসীর প্রত্যাশাকে দাঁড় করিয়েছে হিসাব–নিকাশের কাঠগড়ায়। সাবেক আর বর্তমানের মধ্যে কোনো পার্থক্য দৃশ্যমান হচ্ছে না।

বিজ্ঞাপন

বর্তমান সময়কে ইঙ্গিত করেই একটি প্রশ্নের উদয় হয়, জো বাইডেন কি ট্রাম্পের পথেই হাঁটবেন? চীনের সঙ্গে ট্রাম্প যেমন আচরণ করেছেন, বাইডেনও সে রকম আচরণ করে যাচ্ছেন। ভারতকে সঙ্গে নিয়ে ইন্দো–প্যাসিফিক অঞ্চলে স্থিতিশীলতার নামে চীনবিরোধী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। তার মিত্রদেরও চীনকে বয়কট করতে উৎসাহিত করছেন, যাতে কোনো মীমাংসার ছাপ লক্ষ করা যাচ্ছে না। কারণ, বছরের শুরুর দিকে সি চিন পিং একটি বক্তব্যে বলেছেন, ‘আমরা সবাই যদি একে অপরকে বয়কটের মানসিকতা নিয়ে আগাই, তবে বিরোধ স্থায়ী হবে।’ বিরোধ প্রশমনে গত মার্চে চীন-যুক্তরাষ্ট্র আলাস্কার অ্যাংকোরেজ শহরে বৈঠকে বসেন। সেখানে দুই পক্ষই পরস্পরকে তীব্র ভাষায় তিরস্কার করেছে। বৈঠকটি ফলপ্রসূ হয়নি।

দ্বিতীয়ত, হোয়াইট হাউসে আসার পর রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে প্রথম ফোনালাপে বাইডেনের কথার সুরই বলে দিচ্ছিল যে তাঁদের আগামীর সম্পর্ক ভালো হবে না। বিরোধী নেতা অ্যালেক্সি নাভানলির বিষয়ে কথা হলে পুতিনকে ‘খুনি’ আখ্যা দেন বাইডেন। যেটা একজন প্রেসিডেন্টের জন্য শোভনীয় হতে পারে না। ভ্লাদিমির পুতিন হলেন বিশ্বের অন্যতম ঝানু রাজনীতিবিদ। আমেরিকার প্রতিপক্ষ না হলেও বন্ধু হিসেবে রাশিয়াকে প্রয়োজন। রাশিয়াকে বাদ দিয়ে আমেরিকা বিশ্বক্ষমতা দখল করবে, সেটা অকল্পনীয়। সম্পর্ক আরও শীতল করলে চীন–রাশিয়ার মৈত্রী শক্তিশালী হবে। লয়েড অস্টিনের ভারত সফরকালে চীন-রাশিয়ার বৈঠক ইতিমধ্যে হয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প তবুও রাশিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক উষ্ণ রেখেছেন, কিন্তু বাইডেন যদি উভয়কেই বৈরীরূপে গ্রহণ করেন, তবে আমেরিকার বিশ্ব নেতৃত্বে ফেরা কতটুকু সম্ভব হবে, সে প্রশ্ন রয়ে যায়।

তৃতীয়ত, বাইডেনের অন্যতম নির্বাচনী ইশতেহার ছিল সাংবাদিক জামাল খাসোগি হত্যার বিচার করা। কিন্তু নির্বাচিত হয়ে খাসোগি হত্যার বিষয়ে মিডিয়ায় রিপোর্ট এলেও মোহাম্মদ বিন সালমানের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি ওয়াশিংটন। যেখানে মোহাম্মদ বিন সালমান হত্যার নির্দেশদাতা হিসেবে প্রমাণিত হয়েছেন। আমেরিকার তেলের বাজার রক্ষা ও মধ্যপ্রাচ্যে নির্বিঘ্নে তাদের কার্যক্রম পরিচালনার অজুহাতে সালমানকে শাস্তির মুখোমুখি করেনি বাইডেন প্রশাসন। ফলে যুবরাজ সালমান আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠবেন। গণতান্ত্রিক প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র দুর্বল অবস্থানেই যাবে।

চতুর্থত, ২০২০ সালে ট্রাম্পের তালেবানদের সঙ্গে সম্পাদিত দোহা চুক্তি নিয়ে বাইডেন প্রশাসনের গড়িমসি লক্ষ করা যাচ্ছে। ঘোষিত সময়সীমা আগামী ১ মে শেষ হচ্ছে। কিন্তু সেনা প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেই ওয়াশিংটনের। তালেবানরা হুমকি দিয়ে বলেছে আল্টিমেটাম শেষ হওয়ার পরও যদি সেনা প্রত্যাহার করা না হয়, তাহলে মার্কিন সেনাদের ওপর হামলা চালানো হবে এবং নজিরবিহীন সহিংসতা ছড়িয়ে পড়বে। রাশিয়ার প্রতিনিধি জামির কাবুলোভ সেনা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ওয়াশিংটনের অনীহার কারণে এর বিপজ্জনক পরিণতির ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। পরমাণু ইস্যু নিয়ে ইরানের সঙ্গে উত্তেজনার পারদ চরমে। পাল্টাপাল্টি অভিযোগ চলছে, কিন্তু শান্তি আলোচনার খবর নেই। ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রতিশ্রুতি বাইডেনের ছিল। কিন্তু বাস্তবতার দেখা আজও মেলেনি। ট্রাম্পের ন্যায় একতরফা নিষেধাজ্ঞার রীতিও বহাল আছে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা দিয়েও মিয়ানমারের গণতন্ত্রের জন্য কিছু করতে পারেনি বাইডেন প্রশাসন। খুব অল্প কদিনেই যে বৈশ্বিক পরিস্থিতি পরিবর্তন করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করবেন, সেটা বলা হচ্ছে না। আমরা চাই, জো বাইডেনের নেতৃত্বে আমেরিকা যুদ্ধের পরিবর্তে শান্তি দিয়ে বিশ্ব জয় করুক। অন্তত চেষ্টাটা তাঁর হাতেই শুরু হোক। উত্তেজনা প্রশমন করে স্নায়ুযুদ্ধের বিলুপ্তি ঘটাক। তাঁর প্রাথমিক কয়েকটি কাজ বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কেমন হবে, তা আঁচ করা যায়। কারণ, ‘মর্নিং শোজ দ্য ডে’।

লেখক: শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

বিজ্ঞাপন
নাগরিক সংবাদ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন