জহির রায়হান প্রখ্যাত একজন চলচ্চিত্রকার এবং লেখক ছিলেন। লিখেছেন অনেক কালজয়ী লেখা। তবে ‘বরফ গলা নদী’র মাধ্যমেই আমার প্রথম তাঁর লেখাপড়া। জীবনে আমি চলচ্চিত্র এত দেখেছি, যদি সেটি বইয়ের ক্ষেত্রে হতো, আজ হয়তো আমার বেশ কয়েকটি বই বেরিয়ে যেত। লেখাটির শুরুটা এতটা সিনেমেটিক ছিল, আমি প্রথম থেকেই অনেক আগ্রহ নিয়ে পড়তে থাকি। ঘটনাপ্রবাহ যেভাবে চলা শুরু করল, তার সঙ্গে আমি আগে থেকেই অপরিচিত নই। সম্ভবত আমি কখনো নাট্যকার কিংবা চলচ্চিত্রকার হলে ঠিক একইভাবে আমার ঘটনাটির শুরু হতো।

অদ্ভুত এক ভালোবাসার সন্ধান পাওয়া যায়। প্রথমেই পরিচিত হই মাহমুদ এবং লিলি নামের দুটি চরিত্রের সঙ্গে। যেখানে মাহমুদ শঙ্কিত এবং লিলি তার প্রতি সংবেদনশীল। শুরুতেই তারা স্বামী-স্ত্রী, কথাটা যে কারোরই মাথায় আসত। কিন্তু দু-চার পৃষ্ঠা পরেই জানা যায়, তাদের এখনো বিয়ে হয়নি। লেখক এখানে তাঁর পাঠকদের কিছু একটা রোমাঞ্চকর ঘটনার জানান দিয়ে চলে যান অতীতে।

খুবই নিম্নবিত্ত ঘরের সন্তান মাহমুদ। মা-বাবা ভাইবোনসহ ৭ সদস্যের পরিবার তাদের। সে বিএ পাস করে কোনো একটা প্রেসে চাকরি করে। বেতন পায় স্বল্প। বড়লোকদের প্রতি প্রচণ্ড ঘৃণা তার। মাহমুদের পর এ লেখায় অন্য যে চরিত্রটি সব থেকে ফুটে ওঠে, সেটি মরিয়ম। তার ছোট বোন। সদ্য ইন্টার পাস করে চাকরি সন্ধানী একটি মেয়ে, যে কিনা একটি টিউশনি করায়। অতীতে তার জীবনে কোনো একটি দুর্বিষহ ঘটনার প্রভাব পুরো উপন্যাসেই দেখা যায়। মরিয়মের পর তার বোন হাসিনা, মা সালেহা, বাবা হাসমত, বান্ধবী লিলি, এবং মরিয়মকে পছন্দ করা একটি ছেলে মনসুর চরিত্রের প্রাধান্য পায়।

আমার নিজের লেখার দৈন্য প্রকাশ করার পেছনে যথেষ্ট কারণ রয়েছে। যে চরিত্র বিন্যাস এবং চরিত্রকে ব্যক্তিত্ববান করে তোলার কথা বলছিলাম, সেটি জহির রায়হান একদম পুরোদস্তুর করে দেখিয়েছেন। এই উপন্যাসের প্রতিটি চরিত্রের ব্যক্তিত্ববোধ এত শক্তিশালী এবং গভীরভাবে ফুটে উঠেছে, তা আমি খুব কমসংখ্যক দেখেছি। পুরো বইয়ে আমি অপ্রয়োজনীয় কোনো কথা খুঁজে পাইনি। একটি চরিত্রের সংলাপ যতটুকু হওয়ার প্রয়োজন, ঠিক ততটুকুই ব্যবহার করা হয়েছে এবং উপন্যাসের প্রতিটি চরিত্রকে এত শক্তিশালী করেছেন, তা সবাই করতে পারেন না। যে কটি চরিত্র সেখানে ছিল, তার সব কটি চরিত্রই উপন্যাসে সমান গুরুত্ব পেয়েছে এবং তাদের প্রত্যেকেরই প্রয়োজন ছিল। আমার মতে, এই উপন্যাসের সার্থকতা এখানে।

লেখাটি পড়তে পড়তে নিজেকে মাহমুদের অবস্থায় কল্পনা করছিলাম। আমার সঙ্গে তার যথেষ্ট মিল রয়েছে। খুবই সাদাসিধে, সহজ, সাবলীলভাবে গল্প এগোতে থাকে। কঠিন কোনো বিষয়ই উপস্থাপন করা হয়নি এই লেখায়। নিম্নবিত্তদের জীবন-জীবিকা নিয়ে কাহিনির আবহমান প্রবাহে যেকোনো পাঠকের হৃদয় স্পর্শ করতে পারেন লেখক। যে লেখা জীবন ছুঁয়ে যায়, যে লেখা মনে দাগ কেটে যায়।

গল্পের শেষাংশে এসে আমি আন্দাজ করতে পারছিলাম কী ঘটতে পারে। কিন্তু মনে মনে চাচ্ছিলাম, যা ভাবছি, সেটা যেন না হয়। ঘটনাপ্রবাহ চলতে থাকে, একটা পর্যায়ে চোখ টলমল করতে থাকে। এমনটা না হলেও পারত। কিন্তু যা ভাবলাম, তা-ই হলো। সব শেষ করে এক প্রচণ্ড হাহাকার তৈরি করে দেওয়া হলো মনের ভেতর। যে ঘটনাটি ঘটে, তার প্লটটা এমন নিদারুণভাবে সাজানো হয়, অনুভূতিসম্পন্ন যেকোনো মানুষের চোখেই পানি চলে আসবে। আমিও এখনো মেনে নিতে পারিনি, লেখক এমন কেন করলেন। এটা ছিল লেখকের দ্বিতীয় সার্থকতা। এটাকে বলা হয় হিডেন সিক্রেট। প্রখ্যাত লেখকদের অনেকেই এটা করেন। আপনাকে প্রথমে একটি বিষয় সম্পর্কে জানানো হবে, আপনি ভাববেন, আমি তো বিষয়টি জানি। কিন্তু পরক্ষণে লেখক আপনার ধারণা ভেঙে দেবেন। আর আপনি হাঁ করে থাকবেন!

পুরো উপন্যাসে লিলি নামের মেয়েটির খুব একটা প্রভাব দেখবেন না। কিংবা তাকে এই কাহিনির গুরুত্বপূর্ণ কোনো চরিত্রও মনে হবে না। কিন্তু তিনি যে অসীম ব্যক্তিত্বের পরিচয় দিয়েছেন, সেটি উপন্যাসের শেষ দিকে এসে জানতে পারবেন। কী অসাধারণ একটি চরিত্র লিলি! তার শেষ দিকের ঘটনা আমায় নাড়া দিয়েছে। কী অসাধারণ ছিল মাহমুদ, মরিয়ম আর হাসিনা নামের চরিত্রগুলো।

জহির রায়হানের এই এত সুন্দর লেখনীর কারণেই হয়তো তিনি কালজয়ী হয়ে আছেন। আমি জানি, লেখাটি অনেক বড় হয়ে গেছে। কিন্তু যিনি পড়তে পারেন, তিনি আমার পুরো লেখাটিই পড়বেন। পুরো লেখায় আমি মূল কাহিনি সম্পর্কে আপনাদের কোনো ধারণাই দেয়নি। তার কারণ ছিল, আপনাদের আগ্রহী করে তোলা।

নাগরিক সংবাদ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন