বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

তখন পূর্ণচন্দ্র দাস নামে মাদারীপুরে একজন অধ্যক্ষ ছিলেন। ইংরেজদের প্রতি তাঁরও চরম বিদ্রোহ ছিল। সরকার পূর্ণচন্দ্রকে কারারুদ্ধ করে। তাঁর মুক্তি উপলক্ষে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ‘পূর্ণ-অভিনন্দন’ শিরোনামে একটি কবিতা লিখেন। সেই কবিতার পঙ্‌ক্তিতে আছে—

‘জয় বাংলার পূর্ণচন্দ্র, জয় জয় আদি-অন্তরীণ!

জয় যুগে-যুগে-আসা-সেনাপতি, জয় প্রাণ আদি-অন্তহীন!’

নজরুলের কবিতার এই ‘জয় বাংলার উচ্চারণ সেদিনের তরুণ বঙ্গবন্ধুর হৃদয়কে আন্দোলিত করেছিল। তখন থেকেই তিনি ‘জয় বাংলাকে’ বুকের গভীরে ধারণ করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, একদিন এই বাংলাকে জয় করবেনই। জয় বাংলার এই প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে দেবেন তাঁর জনপদের মানুষের হৃদয়ে। পরবর্তী সময় তিনি এটা করেছিলেন। তাই এ দেশের মুক্তিযুদ্ধের শ্রেষ্ঠ উচ্চারণ ছিল ‘জয় বাংলা’।

default-image

আর ১৯২০ সালে জন্মগ্রহণ করে ১৯৩৬ সালে ভারত মুক্তির আন্দোলনে যুক্ত হয়ে যান কিশোর বঙ্গবন্ধু। স্বদেশি আন্দোলন হলো ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের একটি অংশ। উদ্দেশ্য ব্রিটিশ শক্তিকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করা। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অবসান ও ব্রিটিশ পণ্য বর্জন। দেশজুড়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন। দেশীয় শিল্প উৎপাদনে উন্নতি।এটি ছিল গান্ধীর সময়ের আগের সবচেয়ে সফল আন্দোলন। এ আন্দোলনের উদ্যোক্তা ছিলেন অরবিন্দ ঘোষ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বীর সভাকরসহ অনেকে। পরে স্বদেশি আন্দোলনের ধারাটি মহাত্মা গান্ধী অনুসরণ করেন। এটিকে তিনি বলেন ‘স্বরাজের আত্মা’। এ আন্দোলন সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল বাংলায়। এটা একধরনের মায়ের কাছে ফেরার ডাক। ব্রিটিশবিরোধী এই আন্দোলনে ভীষণভাবে যুক্ত হয়ে যান বঙ্গবন্ধু। এ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৪৭ সালে প্রায় ২০০ বছর পর ব্রিটিশ সরকার ভারত ছাড়তে বাধ্য হয়।

১৯৩৭ সাল থেকে বঙ্গবন্ধুর আরও বেশি রাজনৈতিক, সামাজিক ও মানবিক রূপান্তর ঘটে। পত্রিকা, বইপত্র পড়েন। দেশ-বিদেশের খবর রাখেন। বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেন। এ সময় অবিভক্ত বাংলার দুই বড় নেতা প্রধানমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী গোপালগঞ্জে আসেন। তাঁদের অনুষ্ঠানের যাবতীয় ব্যবস্থা করেন বঙ্গবন্ধু। এ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর একটি নিকট সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

বঙ্গবন্ধু কলকাতায় গিয়ে সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে দেখা করেন। তখন গোপালগঞ্জ মুসলিম ছাত্রলীগ ও মুসলিম লীগ গঠনের পরিকল্পনা করেন। এ সময় খন্দকার শামসুদ্দীন ছিলেন গোপালগঞ্জের এমএলএ (মেম্বার অব লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলি)। বঙ্গবন্ধু তাঁকে ছাত্রলীগের সভাপতি করেন। নিজে সম্পাদক হন। অবশ্য বঙ্গবন্ধুকেই সব করতে হতো। এ সময় একটি মুসলিম লীগ ডিফেন্স কমিটি করা হয়। তিনি এটারও সেক্রেটারি। এভাবেই শুরু হলো তাঁর রাজনৈতিকজীবন।
বাবা ছিলেন উদার মানসিকতার। কোনো কাজেই তিনি বাধা দিতেন না। শুধু লেখাপড়ার প্রতি খেয়াল রাখতে বলতেন। এভাবে প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে যুক্ত হন বঙ্গবন্ধু। সভা করেন, বক্তৃতা করেন। সারাক্ষণ মুসলিম লীগ আর ছাত্রলীগ।

default-image

১৯৪১ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেন। দ্বিতীয় বিভাগে পাস করেন। কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন। এ কলেজের বেকার হোস্টেলে থাকেন। সভা–সমাবেশে অংশগ্রহণ করেন। এখন প্রায়ই শহীদ সোহরাওয়ার্দী কাছে যান। তিনি বঙ্গবন্ধুকে স্নেহ করেন। এভাবে পুরো মাত্রায় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। মাদারীপুর যান। সেখানেও ছাত্রলীগ গঠন করেন।

ফরিদপুরে ছাত্রলীগের জেলা কনফারেন্স হবে। কবি কাজী নজরুল ইসলাম, হুমায়ূন কবির, ইব্রাহাম খাঁ এমন সব গুণী ব্যক্তিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কিন্তু সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে সভা বন্ধ করে দিল।

গোপালগঞ্জের মুসলিম লীগ মানে বঙ্গবন্ধু। আবার ইসলামিয়া কলেজেও তিনি জনপ্রিয়। ইসলামিয়া কলেজ ছিল ছাত্র আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র। কলেজের নির্বাচনগুলোয় কেউ বঙ্গবন্ধুর বিপক্ষে জিততে পারত না।

তখন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়। ফজলুল হক জিন্নাহর হুকুম মানতে নারাজ। তিনি মুসলিম লীগ থেকে বেরিয়ে যান। শ্যামা প্রসাদ মুখার্জির সঙ্গে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করেন। মুসলিম লীগ ও ছাত্ররা তাঁর বিরুদ্ধে আন্দোলন করে। উপনির্বাচনে মুসলিম লীগের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেন বঙ্গবন্ধু। সে সময় মুসলিম ছাত্রলীগের মধ্যে দুটো দল হলো। বঙ্গবন্ধু ফরিদপুর গেলেন। সবাইকে বললেন, পাকিস্তানের জন্যই তাঁদের সংগ্রাম। এখানে দলাদলি করে লাভ নেই। তাঁর কথায় সবাই এক হলো। বঙ্গবন্ধু হয়ে গেলেন পুরো মাত্রায় রাজনীতিবিদ। চলবে...

নাগরিক সংবাদ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন