বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সাতচল্লিশে দেশ ভাগের পর পাকিস্তানের কোনো সাংবিধান ছিল না। প্রাদেশিক পরিষদ চলতে থাকে ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন দিয়ে। ১৯৫৫ সালে পাকিস্তানের সংবিধান তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। আর তখনই পূর্ব বাংলার নাম পরিবর্তন করে পূর্ব পাকিস্তান করা হয়। একই সময় পশ্চিম পাকিস্তানের সব কটি প্রদেশ একটি ইউনিটে এনে পশ্চিম পাকিস্তান করা হয়। ১৯৫৬ সাল থেকে পাকিস্তানের সংবিধান কার্যকর হয়। কিন্তু ১৯৫৮ সালের অক্টোবরে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন জারির মধ্য দিয়ে এ সংবিধানের মৃত্যু ঘটে।

পূর্ব পাকিস্তানের ভূখণ্ডের আয়তন খুবই কম। পাকিস্তানের মোট আয়তনের ছয় ভাগের এক ভাগেরও কম। অথচ ৫৬ শতাংশ জনগণ বাস করে পূর্ব পাকিস্তানে। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল। লিয়াকত আলী খান প্রথম প্রধানমন্ত্রী। দেশভাগের আগে পূর্ব ও পশ্চিম বাংলা ছিল একটি প্রদেশ।

সাতচল্লিশে দেশভাগের পর দুটি প্রদেশ হয়। পশ্চিম বাংলা হয় ভারতের অন্তর্ভুক্ত। পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের অংশ হয়। এর রাজধানীর নাম ঢাকা। খাজা নাজিমুদ্দিন হন পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। ১৯৪৮ সালের সেপ্টেম্বরে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যু হয়। তখন খাজা নাজিমুদ্দিন হয়ে গেলেন পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল। নুরুল আমিনকে করা হয় পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। নুরুল আমিন ১৯৫৪ সালের ২ এপ্রিল পর্যন্ত পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন।

পূর্ব বাংলায় প্রাদেশিক নির্বাচন ও বঙ্গবন্ধু

১৯৩৫ সালে ভারত শাসন আইন গৃহীত হয়। সে সময় থেকে প্রদেশের শাসন বিভাগ ও আইনসভা কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয়। কিন্তু স্বাধীন পাকিস্তানের নিয়তি হয় অন্যরকম। এখানে শুরু থেকেই প্রদেশকে দুর্বল করার চক্রান্ত শুরু হয়। কেন্দ্রকে করা হয় শক্তিশালী। প্রদেশের ওপর কেন্দ্রের প্রবল নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রদেশের গভর্নর নিয়োগ, মন্ত্রিপরিষদ গঠন, দায়িত্ব বণ্টন এমনকি মন্ত্রিপরিষদের কার্যকালও ঠিক করে দেন গভর্নর। আবার কোনো প্রদেশ বা প্রদেশের কোনো অংশে শান্তি ও নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়লে সেখানে গভর্নরের শাসন জারি করা হয়। এ জন্য প্রাদেশিক আমলারাও মনে করতেন তাঁরা কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন। তাঁরা প্রাদেশিক সরকারকে তেমন একটা গুরুত্ব দিতেন না।

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন প্রতিষ্ঠার পর থেকে পূর্ব বাংলায় আওয়ামী মুসলিম লীগই ছিল প্রধান বিরোধী দল। ‘আওয়াম’ একটি আরবি শব্দ। এর অর্থ হলো, জনগণ, মানুষ, জনসাধারণ, জাতি ইত্যাদি। জনগণ এমন একটি দলের জন্য অপেক্ষা করছিল, যে দল এদেশের মাটি ও মানুষের কথা বলে। ভাগ্য বদলের কথা বলে। মুসলিম লীগ কখনো এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষের দল হতে পারেনি। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ও মাওলানা ভাসানী দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে মানুষের কল্যাণে ছুটে বেড়িয়েছেন। পূর্ব বাংলার মানুষ যেন শান্তিতে থাকে; তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চাকরি ও বাসস্থানের নিশ্চয়তা হয়। সর্বোপরি তিন বেলা যেন পেট ভারে খেতে পায়। তত দিনে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষও আওয়ামী লীগের নাম জেনে যায়। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধু দেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় বদ্ধপরিকর। মুসলিম লীগ সরকারের অনাচার ও অপশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রাম অব্যাহত রাখে।

১৯৪৯ সালে টাঙ্গাইলের একটি উপনির্বাচনে মুসলিম লীগ সরকারের শোচনীয় পরাজয় হয়। এ জন্য পূর্ব বাংলায় পাকিস্তান সরকার যেকোনো নির্বাচন দিতে ভয় পায়। কেন্দ্রীয় আইন পরিষদে আইন পাসের মাধ্যমে নির্বাচন পেছানোর কৌশল নেয়। নির্বচনের বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের ছিল চরম অবহেলা। কোনোভাবেই নির্বাচন দিতে চায় না। শেষ পর্যন্ত ১৯৫৩ সালে পাঞ্জাব ও উত্তর–পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে নির্বাচন হয়। সিন্ধুর জনগণের দাবির কাছে নতি স্বীকার করে নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়।

তবে পাকিস্তান সরকার পূর্ব বাংলায় কোনো নির্বাচনের মুখোমুখি হতে চায় না। এদিকে ১৯৫৩ সালে পূর্ব বাংলার আইন পরিষদে ৩৪টি আসন শূন্য হয়। কিন্তু নুরুল আমিন সরকার কোনো উপনির্বাচন দেয় না। অবশেষে আওয়ামী লীগের তুমুল আন্দোলন ও গণদাবির চাপে ১৯৫৩ সালের মাঝামাঝি তারা নির্বাচনের ঘোষণা দেয়। এরপর ১৯৫৪ সালের ৮ মার্চ নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। ৮ থেকে ১২ মার্চ পর্যন্ত এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
একমাত্র আওয়ামী লীগের চাপেই সে সময় পাকিস্তান সরকার নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়েছিল। আর আওয়ামী লীগের পক্ষ হয়ে বঙ্গবন্ধুই মূলত ওই চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ না হলে পূর্ব বাংলায় আদৌ প্রাদেশিক নির্বাচন হতো কি না, সে এক বিরাট প্রশ্ন।

তখন প্রাদেশিক আমলাদের মধ্যে পূর্ব বাংলার কোনো প্রতিনিধি ছিলেন না। ১৯৫৪ সালে সচিবালয়ে পূর্ব বাংলার কোনো বাঙালি সচিব ছিলেন না। অবাঙালি সচিবেরা বাংলার স্বার্থ দেখতেন না। সেনাবাহিনী, পররাষ্ট্র দপ্তর, কূটনৈতিক অফিস—কোথাও বাংলার প্রতিনিধিত্ব ছিল না।

default-image

১৯৫৬ সালে সেনাবাহিনীতে মেজর জেনারেল পর্যন্ত মোট ৬০০ অফিসারের মধ্যে মাত্র ১০ জন ছিলেন বাঙালি। ব্রিটিশ আমলে আয়কর ও বিক্রয় কর ছিল প্রদেশের নিয়ন্ত্রণে। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার সেটিও নিয়ে নেয়।
অর্থনৈতিক দিক থেকে প্রদেশের ওপর কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। এক তথ্যে দেখা যায় ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত পূর্ব বাংলায় ব্যয় হয়েছে ৪২ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। একই সময় পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যয় হয়েছে ৭৯০ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। বিদেশি সাহায্যের ১৩ ভাগের মাত্র এক ভাগ ব্যয় করা হয় পূর্ব বাংলায়।

১৯৪৭ সালে একটি নতুন স্বপ্ন নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। দেশভাগের পর মুসলিম লীগের খাজা নাজিমুদ্দিন, নুরুল আমিন, আবু হোসেন একের পর এক পূর্ব বাংলা শাসনে ছিল। ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ ও তাদের আমলা গোষ্ঠী এক হয়ে চরম অগণতান্ত্রিক, স্বৈরতান্ত্রিক ও সাংস্কৃতিক নিপীড়ন শুরু করে। তাদের ভয়াবহ অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও দুঃশাসনে পূর্ব বাংলায় চলতে থাকে ভয়ংকর অরাজকতা।
সে সময় আমলাদের একচ্ছত্র প্রভাব ছিল। তাঁরা প্রায় যা ইচ্ছা তা–ই করতে পারতেন।

আরেক দিকে ছিল ভয়ানক খাদ্য সংকট ও বেকার সমস্যা। শাসকদের কোনো পরিকল্পনা ছিল না। কোনো রকমে চললেই যেন তাঁরা খুশি। কেউ শোনে না মন্ত্রী বা নেতাদের কথা। এদিকে বাংলার মানুষের মনে একুশে ফেব্রুয়ারির দগদগে ক্ষত। প্রতিনিয়ত বঞ্চিত হওয়াই যেন এ অঞ্চলের মানুষের নিয়তি হয়ে দাঁড়ায়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে পূর্ব বাংলায় একটি স্বতন্ত্র ধারার রাজনীতির মেরুকরণ হয়। বিশেষ করে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন বদলে দেয় রাজনীতির গতি–প্রকৃতি।

চুয়ান্নর নির্বাচনে জোট গঠন ও বঙ্গবন্ধু

দেশ ভাগ হয়। শুরু হয় ভাষা আন্দোলন। এই ভাষা আন্দোলনই বাঙালিকে জোটবদ্ধ হওয়ার পথ দেখায়। বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারির পর পূর্ব বাংলায় মুসলিম লীগ সরকারের প্রতি ব্যাপক অসন্তোষ দানা বাঁধে। এদিকে পাকিস্তানের অন্যান্য প্রদেশে প্রাদেশিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু পূর্ব বাংলায় নির্বাচন হয় না। অত্যাচার ও নির্যাতনে এ অঞ্চলের মানুষ মুসলিম লীগ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। টাঙ্গাইলের এক উপনির্বাচনে চরম বিপর্যয়ের পর সরকার নির্বাচন থেকে দূরে সরে যায়। নির্বাচন মানেই তাদের নিশ্চিত হার।

সময় যায় দ্রুত। ১৯৫৩ সাল। এ সময় পূর্ব বাংলায় আরও ৩৪টি আসন শূন্য হয়। তারপরও নির্বাচনের কথা মুখে আনে না মুসলিম সরকার। তখন আওয়ামী মুসলিম লীগের মাওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু সারা দেশে সভা-সমাবেশ, আন্দোলন-সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন। অবশেষে ১৯৫৩ সালে নির্বাচনের ঘোষণা দেন। তখন পূর্ব বাংলার প্রায় সব বিরোধী দল এক হয়। তারা একটি রাজনৈতিক জোট গঠনের বিষয় ভাবতে থাকে।

ওই জোট গঠনের অনুঘটক হিসেবে কাজ করে ১৯৫৩ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ঘটনা। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের নির্বাচন হয়। এ নির্বাচনে নিখিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগকে প্রতিহত করার জন্য পূর্ব বাংলা মুসলিম ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন এক হয়। তারা গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট জোট গঠন করে। এই জোট বিরোধী প্রার্থীদের বিপুল ভোটে পরাজিত করে। এই গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট পরবর্তী সময়ে রাজনীতিবিদদের জোট গঠনে পথ দেখায়। এ ঘটনা থেকেই জোরালোভাবে জোট গঠনের দাবি সামনে আসে।

তবে আওয়ামী মুসলিম লীগে জোট গঠনে দ্বিমত দেখা দেয়। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু ছিলেন জোটের ঘোরবিরোধী। ভাসানীও জোট গঠনের পক্ষে ছিলেন না। তবু এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য ১৯৫৩ সালের ১৪ নভেম্বর ময়মনসিংহে অধিবেশন হয়। ওই অধিবেশনে অনেক ঘটনার পর জোট গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। ৪ ডিসেম্বর আওয়ামী মুসলিম লীগ, কৃষক শ্রমিক পার্টি, নেজামে ইসলাম ও গণতন্ত্রী দল এক হয়। তারা মুসলিম লীগ সরকারবিরোধী নির্বাচনী জোট গঠন করে।

এ জোটের রূপকার ছিলেন বাংলার তিনজন শ্রেষ্ঠ নেতা। তাঁরা হলেন মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। এ ছাড়া আরও কয়েকটি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। এসব দল হলো কংগ্রেস, মুসলিম লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশিমের খেলাফতে রব্বানী, তফসিলি ফেডারেশন, সোশ্যালিস্ট পার্টি ইত্যাদি। কমিউনিস্ট পার্টি ওই নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। কারণ, ১৯৪৮ সালে এ দলকে বেআইনি ঘোষণা করা হয়।

নাগরিক সংবাদ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন