বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

কবিতা হলো জীবন ও প্রকৃতির শব্দগুলোর অপূর্ব বিন্যাস। সেসব শব্দ হতে পারে প্রেমের, বেদনার, সংগ্রামের, যুদ্ধের, স্বাধীনতার, মানবতার, স্বপ্নের অথবা বেঁচে থাকার।
বঙ্গবন্ধুর ভাষণের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্যই যেন অনিবার্য। এর প্রতিটি শব্দে লুকিয়ে আছে এ দেশের মানুষের স্বপ্ন, সংগ্রাম, যুদ্ধ, স্বাধীনতা, মানবতা, বেঁচে থাকা। এ যেন বাঙালির অবিনাশী গান। প্রায় যেকোনো বিবেচনায় বঙ্গবন্ধুর ভাষণ একটি অমর কবিতা। কোনো ভালো কবিতায় একটা শব্দও কম বা বেশি থাকে না। প্রতিটি শব্দকেই হতে হয় অবশ্যম্ভাবী। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে যেন একটা কথাও কম বা বেশি বলা হয়নি। একটা শব্দও ভুল বলা হয়নি। ১৮ মিনিটের এই ভাষণ কোনো সাধারণ বক্তৃতা ছিল না। এটি ছিল স্বাধীনতার চেতনায় মগ্ন এক অবিসংবাদী নেতার হৃদয় নিংড়ানো অভিব্যক্তি। একটি অমর কবিতা।

আমাদের প্রিয় কবি নির্মলেন্দু গুণ তাঁর বিখ্যাত ‘স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’ কবিতার প্রায় শুরুতেই বঙ্গবন্ধুকে কবি বলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘কখন আসবে কবি’।

কবিতার একেবারে শেষ পঙ্‌ক্তিতে নির্মলেন্দু গুণ লিখেছেন, ‘শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে/রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে/অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন...’। একবার জাতীয় কবিতা পরিষদের শিরোনাম ছিল, কবি মুহাম্মদ সামাদের কবিতার পঙ্‌ক্তি দিয়ে, ‘মুজিব আমার স্বাধীনতার অমর কাব্যের কবি।’

আহমদ ছফা লিখেছিলেন, ‘বাঙালির শ্রেষ্ঠ কাব্য চর্যাপদ নয়, বৈষ্ণব গীতিকা নয়, সোনার তরী কিংবা গীতাঞ্জলি কোনোটা নয়, বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ কাব্যগীতি হলো “আর দাবায় রাখতে পারবা না”।’

জীবনানন্দ দাশ বলেছিলেন, সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি। কারণ, কবির মধ্যে বিগত কয়েক শতাব্দীর এবং সমকালের কবিতার ইতিহাসটা ক্রিয়া করে। সবার ভেতর করে না। যাঁরা কবি, কেবল তাঁদের মধ্যে করে। বঙ্গবন্ধু যখন ৭ মার্চের ভাষণ দিচ্ছিলেন, তখনো যেন তাঁর মধ্যে এই জনপদের মানুষের হাজার বছরের ইতিহাস ও সমকালের ইতিহাস ক্রিয়া করছিল। তিনি জানতেন, এ অঞ্চলের মানুষ কোনো দিন একটি স্বাধীন রাষ্ট্র পায়নি। বঙ্গবন্ধু জীবনভর একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখেছেন।

default-image

ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ কাব্যগাথা

পৃথিবীর কোনো নেতা প্রায় ১০ লাখ মানুষের সামনে ভাষণ দিয়েছেন বলে জানা নেই। আজও তাঁর ভাষণ বেঁচে আছে মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে, থাকবে অনন্তকাল। এটা অমর কবিতা। এ কবিতার কবি হলেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু। ৭ মার্চের ভাষণের সফল পরিণতি স্বাধীন বাংলাদেশ। ৫০ বছরেও এই ভাষণের আবেদন এতটুকু কমেনি। পৃথিবীর অনেক ভাষায় এটি অনূদিত হয়েছে, পাঠ্যপুস্তকে এসেছে। বাঙালি জাতির ইতিহাসে ৭ মার্চ নিরন্তর এক অবিস্মরণীয় দিন হয়ে থাকবে। ২০০৮ সালে বিবিসি বাংলার বিশ্বব্যাপী জরিপে বঙ্গবন্ধু সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি নির্বাচিত হয়েছেন।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া বঙ্গবন্ধুকে অনুরোধ করেন, তিনি যেন এমন কোনো পদক্ষেপ না নেন, যাতে ফিরে আসার পথ বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় মার্কিন রাষ্ট্রদূত তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। তিনি হুমকি দেন যে মার্কিন সরকার পাকিস্তান ভাঙা সহ্য করবে না। অন্যদিকে কীভাবে দেশের মানুষ আন্দোলন-সংগ্রামে চাঙা থাকবে, সেটিও তাঁকে ভাবতে হচ্ছে। এত সব ভয়ংকর চাপ ও জীবন-মরণ শঙ্কার মধ্যেও ১৮ মিনিটের তাৎক্ষণিক ও অলিখিত ভাষণটি ছিল বাঙালির স্বাধীনতার দিকনির্দেশনা ও শ্রেষ্ঠ কাব্যগাথা।

৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু বাঙালির দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস, আন্দোলনের রূপরেখা, যুদ্ধের কৌশল, গরিবের কষ্ট, শত্রুবাহিনীর অনুপ্রবেশ, সব সম্প্রদায়কে সঙ্গে রাখা, সতর্ক থাকা—মাত্র ১৮ মিনিটে তিনি সব বললেন।

এদিকে কিছু দেশদ্রোহী ছাড়া সবাই অধীর আগ্রহে তাঁর কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা শোনার অপেক্ষা করছে। মার্চের শুরু থেকেই সারা দেশের পরিস্থিতি এমন পর্যায় ঠেকেছে যে সবাই বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রত্যাশা করছে। এদিকে তরুণেরা বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে ফেলেছেন। পাকিস্তানিদের তিনি এমন কোনো সুযোগ দিলেন না যে বিচ্ছিন্নতাবাদের অভিযোগে হত্যা, জুলুম ও নির্যাতন নেমে আসতে পারে। আবার স্বাধীনতার ঘোষণার চেয়ে কমও বললেন না। তিনি বললেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম...।’
বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণের প্রায় শুরুতেই বলেছেন ‘২৩ বৎসরের করুণ ইতিহাস বাংলার অত্যাচারের, বাংলার মানুষের রক্তের ইতিহাস। ২৩ বৎসরের ইতিহাস মুমূর্ষু নর-নারীর আর্তনাদের ইতিহাস।’ এরপর তিনি কবিতার মতো পাঠ করতে থাকলেন ওই সময়ের প্রেক্ষাপট।

default-image

শত বছরের মনের কথা হয়ে রইল

১৯৭০ সালের নির্বাচনে সারা পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল। কিন্তু পাকিস্তানের জেনারেল আর রাজনীতিকেরা গোপন বৈঠকে ঠিক করেছেন নির্বিচার বাঙালি হত্যা করবেন, তবু ক্ষমতা দেবেন না। এদিকে বঙ্গবন্ধু স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না, এ দেশের মানুষের অধিকার চাই।’ বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের এক অনন্য মহিমা হলো, এর সর্বজনীনতা ও মানবিকতা। বিশ্বের যেকোনো নিপীড়িত জনগোষ্ঠীকে এই ভাষণ চিরকাল অনুপ্রেরণা দিয়ে যাবে। কী নেই এ ভাষণে? গণতন্ত্র, মানবতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, স্বাধিকার, অসাম্প্রদায়িকতা সবই আছে। একটি পরাধীন জাতির হাজার বছরের আকাঙ্ক্ষা এখানে প্রতিফলিত হয়েছে। একজন মানুষ একটি অলিখিত বক্তৃতা দিয়েছেন, যা একটি জাতির শত বছরের মনের কথা হয়ে রইল। বঙ্গবন্ধু আস্থা, বিশ্বাস ও ভালোবাসার জায়গা থেকে সাধারণ মানুষের ভাষায় কথা বলেছেন।

বঙ্গবন্ধুর জীবনের একমাত্র স্বপ্ন ছিল, এ দেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। এ দেশের মানুষ যেন একটি লাল-সবুজের পতাকা বুকের মধ্যে নিয়ে বলতে পারে, এটা আমার বাংলাদেশের পতাকা। পরাধীনতার শিকল ভেঙে আমরা এনেছি স্বাধীনতা। এ জন্যই বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবন উৎসর্গ করেছেন।

বঙ্গবন্ধু শুধু একজন নেতাই নন, একটি ইতিহাস। নির্মলেন্দু গুণ তাঁকে স্মরণ করে বলেছিলেন, ‘আমার প্রায়ই মনে হয়, বঙ্গবন্ধু যদি আরও কিছুটা সময় পেতেন, যদি তিনি তাঁর জীবনীর কিছুটা হলেও লিখে যেতে পারতেন, তাহলে তা আমাদের জন্য একটা বিরাট সম্পদ হতে পারত। শুধু আমাদের জন্যই বা বলি কেন? সাম্রাজ্যবাদবিরোধী তৃতীয় বিশ্বের আপসহীন নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনী হতে পারত বিশ্বের মুক্তিকামী সকল মানুষের পাঠ্য। আমার খুব দুঃখ হয় এই ভেবে যে মহাত্মা গান্ধী, নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু, ফিদেল কাস্ত্রো, হোচিমিন বা নেলসন ম্যান্ডেলার সমগোত্রীয় এই মহান নেতার মহাজীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাই আমাদের অজানা রয়ে গেল।’

default-image

কোটি বাঙালি সেদিন তাদের অন্তরে যে আবেগ ও স্বপ্ন ধারণ করছিল, তারই প্রকাশ ঘটে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের শেষ বাক্যে। ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ এই ভাষণে মুক্তি ও স্বাধীনতার নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটে। বঙ্গবন্ধুর জীবনকাহিনির শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হয়ে রইল ৭ মার্চের ভাষণ। এ ভাষণ একটি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত প্রস্তুতি গ্রহণে উজ্জীবিত করেছিল।

পৃথিবীতে অনেক স্বাধীনতা আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছে। অনেক আন্দোলন বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন হিসেবে ইতিহাসের দীর্ঘশ্বাস হয়ে আছে। আমাদের এক অকল্পনীয় সৌভাগ্য যে বঙ্গবন্ধুর মতো একজন নেতা পেয়েছি, যিনি তাঁর সারা জীবন অত্যাচার-নির্যাতন সয়ে, জেলজুলুম খেটে, সীমাহীন ত্যাগ, দেশপ্রেম আর প্রজ্ঞা দিয়ে একটি স্বাধীনতা এনে দিলেন। দীর্ঘ ৯ মাস পর পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেলেন। ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরলেন। বঙ্গবন্ধু সেদিন কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন, ‘আজ আমার জীবনের সাধ পূর্ণ হয়েছে, বাংলাদেশ আজ স্বাধীন।’
চলবে...

নাগরিক সংবাদ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন