বঙ্গবন্ধু: বাংলার জোছনা ও রোদ্দুর-১০
১৯৪৬ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার নির্বাচন ও বঙ্গবন্ধু
১৯৪৩-৪৪ সালে ঢাকায় ছাত্রদের নেতৃত্ব দিতেন শামসুল হক, শামসুদ্দিন আহমেদ, নোয়াখালীর আজিজ আহমেদসহ আরও অনেকে। তাঁরা সবাই হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিমের সমর্থক। তাঁরা মুসলিম লীগকেও ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহারের হাত থেকে রক্ষা করতেন। আবুল হাশিম ১৫০ মোঘলটুলিতে মুসলিম লীগের অফিস খোলেন। শামসুল হক এর দায়িত্ব নেন। এদিকে বঙ্গবন্ধুও কলকাতা মুসলিম লীগ অফিসে রাতদিন কাজ করেন। তখন বঙ্গবন্ধুসহ অধিকাংশ মুসলিম শিক্ষার্থীর ধারণা ছিল পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে লেখাপড়া শিখে কী হবে। প্রায় সব মুসলিমের চেতনায় কেবল পাকিস্তান।
কলকাতা আহমেদ আলী পার্কে মুসলিম লীগের কাউন্সিল সভা হবে। বঙ্গবন্ধু প্রচার শুরু করলেন আবুল হাশিমের পক্ষে। তাঁকে সেক্রেটারি করতে হবে। বিরোধীপক্ষ হতে দেবেন না। পরে মাওলানা আকরম খাঁ, সোহরাওয়ার্দী ও খাজা নজিমুদ্দিন সেক্রেটারি রাখলেন আবুল হাশিমকেই। সোহরাওয়ার্দীরও ভাবনা এখন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করতে হবে। গোলমাল করার সময় নয়।
এদিকে ১৯৪৩ সালে সারা দেশে চরম দুর্ভিক্ষ। মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীরা চাল, কাপড়সহ বিভিন্ন পণ্য গুদামজাত করছে। তখন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সিভিল সাপ্লাই–বিষয়ক মন্ত্রী। তিনি চরম অভিযান চালিয়ে প্রায় সব বের করলেন। মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীরা ছিল বদের বদ। তারা কয়েক লাখ টাকা তুলল। এ টাকা দিয়ে মুসলিম লীগের কয়েকজন মন্ত্রীকে অর্থের বিনিময়ে পক্ষে নিল। পরে এক ভোটে মুসলিম লীগ মন্ত্রিসভা পরাজিত হয়ে ক্ষমতা হারায়। বঙ্গবন্ধু এ ঘটনায় বিস্মিত হন।
এর আগে বঙ্গবন্ধুর ধারণাই ছিল না যে কোনো এমএলএকে অর্থ দিয়ে পক্ষে নেওয়া যায়। পরে এমন পরিস্থিতি হলো, মুসলিম লীগ নেতারা যাতে অন্য দলে যোগ না দেন, সে জন্য নজরদারির মধ্যে রাখতে হলো। এক মুসলিম লীগ নেতাকে অফিসে আটকানো হলো। তিনি বারবার বাইরে যেতে চেষ্টা করছেন। তাঁকে বারবার আটকানো হচ্ছে। একসময় তিনি বলেই ফেললেন, বাইরে বিরোধী দল টাকা দিচ্ছে। তিনি যদি কিছু টাকা নিতে পারেন, তাতে ক্ষতি কী। তিনি মুসলিম লীগেই থাকবেন। বঙ্গবন্ধুর জন্য আরও কী বিস্ময় অপেক্ষা করছে, তিনি জানেন না। লোকটা বৃদ্ধ। বঙ্গবন্ধু তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকলেন। ভাবলেন, কতটা অধঃপতন হয়েছে সমাজের!
মুসলিম লীগের একজন এমএলএকে আনতে অনেক কষ্টে বঙ্গবন্ধু রংপুর গেলেন বঙ্গবন্ধু। সারা রাত না খেয়ে পরের রাতে কলকাতায় ফেরেন। ওই এমএলএ খান বাহাদুরও ছিলেন। কলকাতায় এলে তাঁকে আটকিয়ে রাখা হয়েছিল। তারপরও তিনিও পালিয়ে যান।
তখন বঙ্গবন্ধুরা ছিলেন ছাত্র। তাঁরা দেশটাকে সত্যিকার ভালোবাসতেন। এসব খান বাহাদুর দিয়ে পাকিস্তান হবে, দেশ স্বাধীন হবে, ইংরেজ তাড়ানো যাবে—সেটা আর বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। আগে মুসলিম লীগ ছিল খান বাহাদুর, খান সাহেব ও ব্রিটিশ খেতাবধারীদের হাতে। আর তাঁদের সাথে ছিল জমিদার, জোতদারশ্রেণির লোকেরা। শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম যদি ছাত্র, বুদ্ধিজীবী ও কৃষকদের মধ্যে মুসলিম লীগকে জনপ্রিয় করতে না পারতেন, তাহলে হয়তো কোনো দিনই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা হতো না।
সোহরাওয়ার্দী দল গঠনে মন দেন। তিনি ও আবুল হাশিম পাকিস্তান আন্দোলনকে জনগণের মধ্যে আরও ছড়িয়ে দেন। এ সময় কংগ্রেস ইংরেজদের বিরুদ্ধে ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলন আরও তীব্র করে। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আজাদ হিন্দু ফৌজের মাধ্যমে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন। সুভাষ বসু সিঙ্গাপুর থেকে বেতারের মধ্যমে বক্তব্য দিতেন। এটা শুনে বঙ্গবন্ধুরা উজ্জীবিত হতেন। নেতাজিকে শ্রদ্ধা করতেন।
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী দিনরাত কাজে ব্যস্ত থাকতেন। এ সময় রাত ১২টার পর সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে রাজনৈতিক আলাপ করতে যেতেন বঙ্গবন্ধু। বেকার হোস্টেলে বঙ্গবন্ধু গরিব ছাত্রদের থাকা-খাওয়া, লেখাপড়াসহ প্রায় সব ব্যবস্থা করে দিতেন। তিনি ওই কলেজে অনেক জনপ্রিয় নেতা ছিলেন। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
কংগ্রেস দাবি করে, তারা হিন্দু-মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করে। এর প্রমাণ হিসেবে তারা দেখায়, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ কংগ্রেসের সভাপতি। এ ছাড়া মুসলমানদের আরও অনেক বড় নেতা কংগ্রেস দলে আছেন। তাঁদের কথা ছিল ভারতবর্ষের ১০ কোটি মুসলমান এক থাকলে হিন্দুরা অত্যাচার করার সাহস পাবে না। মুসলমানরা সামনে আনল লাহোর প্রস্তাব। লাহোর প্রস্তাবে আছে, পাকিস্তান ও ভারতে বসবাসরত হিন্দু-মুসলিম সবাই সমান নাগরিক মর্যাদা পাবে।
মুসলমানদের কোনো পত্রিকা ছিল না যে তাদের খবর প্রকাশ করবে। একমাত্র বাংলা খবরের কাগজ ছিল দৈনিক আজাদ। এর প্রতিষ্ঠাতা ও মালিক ছিলেন মাওলানা আকরম খাঁ। তিনি ছিলেন প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি। শুধু এই একটি পত্রিকাই পাকিস্তান ও মুসলিম লীগকে সমর্থন করত। কিন্তু আবুল হাশিমের সঙ্গে বিরোধের জন্য তাদের খবর তেমন দিতেন না। দৈনিক মর্নিং নিউজ নামে শোষকশ্রেণির একটা পত্রিকা ছিল। তাঁরা পাকিস্তান আন্দোলনকে সমর্থন করতেন কিন্তু আবুল হাশিমদের খবর দিতেন না। বঙ্গবন্ধুও তখন বেশ নামকরা ছাত্রনেতা। তিনি ও জনাব নুরুদ্দিনের চেষ্টায় সোহরাওয়ার্দীর সহযোগিতায় মিল্লাত নামে একটি সাপ্তাহিক বের হলো। পত্রিকাটি বেশি জনপ্রিয় হয়েছিল।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার নির্বাচন ও বঙ্গবন্ধু
১৯৪৬ সালের মার্চে নির্বাচন। কিন্তু ১৯৪৫ সাল থেকেই নির্বাচনের তর্কবিতর্ক ও আলোচনা শুরু হয়ে গেল। মুসলমানরা পাকিস্তান চায় কি না, তখন এটা অনেক বড় প্রশ্ন। কংগ্রেস এক হিন্দুস্তানের পক্ষে। আর মুসলিম লীগ লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পাকিস্তান ও ভারতের পক্ষে। নির্বাচনের জন্য পার্লামেন্টারি বোর্ড গঠন করা হলো। আগেই মুসলিম লীগ দলের মধ্যে গ্রুপ হয়ে গেছে। কিন্তু যেহেতু পাকিস্তান ইস্যুতে নির্বাচন, সে জন্য বঙ্গবন্ধুরা এটা নিয়ে ঝামেলা করলেন না। নির্বাচনের জন্য পার্লামেন্টারি বোর্ড গঠন করা হলো। খাজা নাজিমুদ্দিন হলেন এ বোর্ডের নেতা। তিনি সোহরাওয়ার্দীকে বাদ দিয়ে নুরুল আমিন, ফজলুর রহমান, মাওলানা আকরম খাঁসহ তাঁর পছন্দের লোকদের নিয়ে বোর্ড করলেন। বঙ্গবন্ধুরা এটা নিয়ে হইচই করলেন। শহীদ সোহরাওয়ার্দী সবাইকে শান্ত হতে বললেন। বঙ্গবন্ধু আরও রেগে গিয়ে সোহরাওয়ার্দীকে বললেন, তিনি যেন আর উদারতা না দেখান।
১৯৩৭ সালে নির্বাচনে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক পটুয়াখালীসহ সারা বাংলা থেকে নাজিমুদ্দিনকে বিতাড়িত করেছেন। বাংলার কোনো আসনে তাঁকে কেউ নির্বাচিত করবে না। সোহরাওয়ার্দী শেরেবাংলাকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলেছিলেন, তিনি কলকাতা থেকে তাঁকে পাস করিয়ে নেবেন। কলকাতায় সোহরাওয়ার্দী তাঁর দুটো আসনের একটা ছেড়ে দেন নাজিমুদ্দিনের জন্য। শেরেবাংলা কলকাতায়ও নাজিমুদ্দিনের বিপরীতে প্রার্থী দিয়েছিলেন। কিন্তু জিততে পারেনি। সোহরাওয়ার্দীর দয়ায় তিনি এমএলএ হয়েছিলেন। আর সেই নাজিমুদ্দিন আজ এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তাঁকে আউট করে দেন।
নির্বাচনের জন্য পার্লামেন্টারি বোর্ডের ৯ জনের ৪ জন সিলেক্টেড। বাকি ৫ জনের জন্য নির্বাচন হবে। সোহরাওয়ার্দীকে না নেওয়ায় বঙ্গবন্ধু ভীষণ রেগে গেলেন। এ বিষয়ে একটি সভা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু বেকার হোস্টেলের কয়েক শ ছাত্র নিয়ে হাজির হলেন। তিনি বক্তৃতার একপর্যায়ে বললেন, নাজিমুদ্দিনের সাথে কোনো আপস নেই। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে তিনি তাঁর বংশের ১১ জনকে নির্বাচিত করেছেন। দেশে কি আর কেউ ছিল না। নিজে মন্ত্রী হয়ে ভাইকে শিল্পমন্ত্রী করেছেন। তাঁরা সোহরাওয়ার্দীকে সভা থেকে নিয়ে এলেন। বঙ্গবন্ধুসহ সবাই তাঁকে বোঝালেন যে নির্বাচন করতেই হবে। বঙ্গবন্ধু বেকার হোস্টেলের কয়েক শ ছাত্র নিয়ে সোহরাওয়ার্দীর পক্ষে নির্বাচনে নেমে পড়লেন। বিভিন্ন জেলায় কাউন্সিলরদের বোঝাতে চলে গেলেন। সে নির্বাচনে ৫টিতেই সোহরাওয়ার্দীর জয় হলো। বঙ্গবন্ধুকে বুকে জড়িয়ে বলছিলেন, তুমি ঠিকই বলেছিলে, মুজিব। নির্বাচিত সদস্যরা হলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম, মাওলানা রাগীব আহসান, আহমদ হোসেন ও লাল মিয়া। সেদিন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে জিতিয়ে আনার জন্য বঙ্গবন্ধুর এক বিশাল ভূমিকা ছিল।
ফরিদপুরের মোহন ও লাল মিয়া দুই ভাই। সারা জীবন একজন সরকারি দল, আরেকজন বিরোধী দলের। বাড়িতে গিয়ে দুজনে এক। এখন সবার দায়িত্ব হলো জেলা–মহকুমায় গিয়ে ইলেকশন অফিস ও কর্মিশিবির খোলা। বঙ্গবন্ধু-ফরিদপুর, কামরুদ্দীন আহমেদ-ঢাকা, শামসুল হক-ময়মনসিংহ, খন্দকার মোশতাক-কুমিল্লা, একরামুল হক-খুলনা ইত্যাদি জায়গায় যান। সোহরাওয়ার্দী প্রায় সারা বাংলায় ঘুরে জনপ্রিয়তা যাচাই করলেন। তাঁর মধ্যে নীচতা, হীনতা, ষড়যন্ত্র—কিছুই ছিল না। নিজের লোক, খাজাদের লোক চিন্তা করতেন না। যাঁকে যোগ্য মনে করতেন, তাঁকে নমিনেশন দেন। এ নির্বাচনে মুসলিম লীগ একচেটিয়া জয় পায়। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হন।
বঙ্গবন্ধুও ছিলেন সোহরাওয়ার্দী মতো উদার, নৈতিক ও মানবিক। তিনিও নীচতা, ষড়যন্ত্র, পরশ্রীকাতরতা ও বিশ্বাসঘাতকতা পছন্দ করতেন না। কিন্তু এসবের জন্য বাঙালিদের ওপর তিনি খুবই বিরক্ত। বাংলা ছাড়া অন্য কোনো ভাষায় পরশ্রীকাতর শব্দটি নেই। কারণ, তাদের মধ্যে এ ধরনের নীচতা নেই। বাঙালিরা ভাই ভাইয়ের উন্নতি দেখলে সহ্য করতে পারে না। এ জন্য তাদের অনেক গুণ থাকা সত্ত্বেও জীবনভর অন্যের অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে। চলবে...