default-image

শুরুতেই বিশাল আম্রকানন, রাজবাড়ির প্রধান ফটক, স্বচ্ছ পুকুর, সৌন্দর্যমণ্ডিত মন্দির আর সারি-সারি কৃষ্ণচূড়াগাছ দেখে অভিভূত হবেন যে কেউ। রাজবাড়ির পেছনে গেলে গা ছমছম করে উঠতেও পারে। আর একা থাকলে তো কথাই নেই।

স্যাঁতসেঁতে নির্জন বাড়ি, শান্ত পুকুর দেখে ভয়ও পেতে পারেন। বলছি রাজধানী ঢাকার অতি সন্নিকটে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের মুড়াপাড়া জমিদারবাড়ির কথা।

বিকেল চারটা। পশ্চিম আকাশে সূর্য হেলে পড়ছে। প্রায় অন্ধকারও ঘনিয়ে আসছে বলে মনে হচ্ছিল। বিশাল আকৃতির বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে মনটা প্রফুল্ল হয়ে গেল। রাজা-বাদশাদের রাজবাড়ি এত সুন্দর, নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাসই করা যায় না। যেই রাজবাড়ির অন্দরমহলে প্রবেশ করলাম, গা-টা কেমন যেন ছমছম করে উঠল।

বিজ্ঞাপন
default-image

চারদিকে ভয়ংকর পরিবেশ। স্যাঁতসেঁতে ভগ্নদশা ভবন আর নীরব-নিস্তব্ধতা দেখে কাতর হয়ে গেলাম। হঠাৎ এক তরুণের সাক্ষাৎ পেয়ে সাহসটা বেড়ে গেল। পাঠক আপনিও একবারের জন্য ঘুরে আসতে পারেন রাজধানী ঢাকার কাছের এ রাজবাড়িতে।

বাংলাদেশের অন্যতম প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও শতবর্ষী জমিদারবাড়ি এটি। বিভিন্ন সময় এ জমিদারবাড়িটি কয়েকজন জমিদার কর্তৃক সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা হয়েছিল।

মুড়াপাড়া রাজবাড়িটি ৬২ বিঘা জমির ওপর গড়ে উঠেছে। গোড়াপত্তন করেন রামরতন ব্যানার্জি। এরপর তাঁর কয়েকজন বংশধর কর্তৃক প্রাসাদটি সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা হয়। ১৮৮৯ খ্রিষ্টাব্দে জমিদার প্রতাপচন্দ্র ব্যানার্জি এই ভবনের পেছনের অংশ সম্প্রসারণ করেন ও পরিবার নিয়ে এখানেই বসবাস শুরু করেন।

রামরতন ব্যানার্জির ছেলে বিজয় চন্দ্র ব্যানার্জি ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রাসাদের সামনের অংশে একটি ভবন নির্মাণ ও ২টি পুকুর খনন করেন। ১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর দুই ছেলে জগদীশ চন্দ্র ব্যানার্জি ও আশুতোষ চন্দ্র ব্যানার্জি প্রাসাদের দোতলার কাজ সম্পন্ন করেন। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ভারত উপমহাদেশ বিভক্ত হওয়ার পর জগদীশ চন্দ্র তাঁর পরিবার নিয়ে কলকাতায় গমন করেন। এরপর থেকে বাড়িটি পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল।

১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার বাড়িটি দখল নেয় এবং এখানে হাসপাতাল ও কিশোর–কিশোরী সংশোধন কেন্দ্রের কার্যক্রম পরিচালনা করা হতো।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর বাড়িটির দায়িত্ব গ্রহণ করে সেটিকে প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা হিসেবে তালিকাভুক্ত করে।

স্থানীয় কয়েকজন সত্তোরোর্ধ্ব মুরব্বির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একসময়ের ঘোড়ার পায়ের ঠক ঠক শব্দ ছিল। হাতির পিঠে চড়ে জমিদারদের ভ্রমণ, পাইক-পেয়াদার পদচারণে মুখরিত ছিল জমিদারবাড়িটি। আজ এটি প্রাচীন ঐতিহ্যের স্মৃতি শুধু। কালের গহ্বরে প্রাচীন ঐতিহ্য ঢাকা পড়লেও এর নিদর্শন চিরকাল অম্লান।

বিজ্ঞাপন
default-image

রূপগঞ্জের মুড়াপাড়ার জমিদারবাড়িটি তেমনই একটি স্মৃতিচিহ্ন। বাড়িটিকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে রূপগঞ্জের ইতিহাস, কৃষ্টি, সভ্যতা ও আজকের এই কোলাহলপূর্ণ জনবসতি। শীতলক্ষ্যা নদীর তীর ঘেঁষে মহাকালের নীরব সাক্ষী হয়ে আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এ জমিদারবাড়ি। পাখিডাকা, ছায়াসুনিবিড় পরিবেশে গড়ে ওঠা মনোমুগ্ধকর এ জমিদারবাড়িটি দেখতে যে কারও মন চাইবে।

রাজধানী ঢাকা থেকে মাত্র ১৮ কিলোমিটার দূরে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থানার মুড়াপাড়া এলাকায় ৬২ বিঘা জমির ওপর এই প্রকাণ্ড জমিদারবাড়ি অবস্থিত। জমিদার রামরতন ব্যানার্জি তৎকালীন মুড়াপাড়া জমিদার বংশের প্রতিষ্ঠাতা। তিনিই মুড়াপাড়া জমিদারবাড়ির গোড়াপত্তন করেন। রামরতন ব্যানার্জির ছেলে পিতাম্বর ব্যানার্জি ও প্রতাপ চন্দ্র ব্যানার্জি শাহজাদপুরে জমিদারি কিনে জমিদারি শুরু করেন। কথিত আছে, জমিদারি ক্রয়সূত্রে প্রতাপ ব্যানার্জির সঙ্গে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঠাকুরদা প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের প্রগাঢ় বন্ধুত্ব ছিল। ১৮৮৯ সালে প্রতাপ চন্দ্র ব্যানার্জি পৈতৃক এজমালি পুরোনো বাড়ি ত্যাগ করে আলোচ্য এ প্রাসাদের পেছনের অংশ নির্মাণ করে বসবাস শুরু করেন। প্রতাপ চন্দ্র ব্যানার্জির ছেলে বিজয় চন্দ্র ব্যানার্জি ১৮৯৯ সালে প্রাসাদের সম্মুখ অংশের একতলা ভবন নির্মাণ ও সেখানে ২টি পুকুর খনন করার পর জটিল রোগে ভুগে মারা যান। তিনি ছিলেন এ অঞ্চলের প্রথম গ্র্যাজুয়েট। বিজয় চন্দ্র ব্যানার্জির দুই সুযোগ্য পুত্র জগদীশ চন্দ্র ব্যানার্জি ও আশুতোষ চন্দ্র ব্যানার্জি ১৯০৯ সালে প্রাসাদটির দোতলার কাজ সম্পন্ন করেন। এ অঞ্চলে জগদীশ চন্দ্র ব্যানার্জির নাম সমধিক প্রসিদ্ধ। কারণ তিনি দুবার কাউন্সিল অব স্টেটের পূর্ববঙ্গ থেকে সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। জমিদার জগদীশ চন্দ্র ব্যানার্জি প্রজাসাধারণের কল্যাণ সাধনের জন্য স্থাপন করেছেন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও পুকুর। জমিদারদের আয়ের উৎস বলতে প্রজার ওপর ধার্যকৃত খাজনা আদায়, বনজঙ্গল এবং সুপারির বাগান। ১২০০ বঙ্গাব্দে এসে প্রজাদের ওপর শুরু হয় অত্যাচার-নিপীড়ন ও ক্ষমতার অপব্যবহার। সুন্দরী মেয়ে, ঘরের বধূদের ওপর লোলুপ দৃষ্টি পড়লে রেহাই পেত না। ধীরে ধীরে অত্যাচারের মাত্রা বাড়তে থাকে। আর আজও সেসব অত্যাচার-নির্যাতের গল্প গ্রামাঞ্চলে কল্পকাহিনির মতো ছড়িয়ে আছে। জমিদারি প্রথার শেষ দিকে নানাভাবে বিদ্রোহের পটভূমি তারই অংশ।

১৯৪৭ সালে তৎকালীন জমিদার জগদীশ চন্দ্র ব্যানার্জি সপরিবার কলকাতায় চলে যান। ফলে জগদীশ চন্দ্র ব্যানার্জির প্রতাপশালী সেই রাজবাড়িটি শূন্য হয়ে যায়। ১৯৪৮ সালে এই ঐতিহ্যবাহী বাড়িটি সরকারের দখলে চলে আসে। তৎকালীন সরকার এখানে একটি হাসপাতাল স্থাপন করে। কিছুকাল এটি কিশোর–কিশোরী সংশোধন কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। পরে ১৯৬৬ সালে এখানে হাইস্কুল ও কলেজ স্থাপিত হয়। বর্তমানে এই জমিদার বাড়িটি মুড়াপাড়া ডিগ্রি কলেজ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

default-image

বাড়িটি ঘুরে জানা গেছে, বিশাল দোতলা এ জমিদার বাড়িটিতে রয়েছে মোট ৯৫টি কক্ষ। নাচঘর, আস্তাবল, উপাসনালয়, ভান্ডার, কাচারিঘরসহ সবই। বিশালাকৃতির প্রধান ফটক পেরিয়ে ঢুকতে হয় ভেতরে। অন্দরমহলে রয়েছে আরও ২টি ফটক। সর্বশেষ ফটক পেরিয়ে শানবাঁধা পুকুর। পুকুরের চারধার উঁচু দেয়ালে ঘেরা।

বাড়ির সামনে রয়েছে আরও একটি বিশাল পুকুর। পুকুরটির চারদিক নকশিকাটা ঢালাই লোহার গ্রিল দিয়ে ঘেরা। আর চারদিকে চারটি শানবাঁধানো ঘাট। মূলত পুকুরটি তৈরি করা হয়েছিল বাড়ির সৌন্দর্য বর্ধন এবং পুরুষ মেহমানদের গোসলের জন্যই।

পুকুরসংলগ্ন মন্দির। মন্দিরে বড় দুটি চূড়া রয়েছে। তা প্রায় ৩০ ফুট উঁচু। এর প্রবেশদ্বারগুলো খিলান দিয়ে নির্মিত। মন্দিরের মূল কক্ষ বেশ ছোট এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন। মন্দিরের পাশ ঘেঁষে রয়েছে ছায়াঘেরা শান্ত-শ্যামল আম্রকানন।

গাছগুলো বেশ পুরোনো। একই মাপের ঝাঁকড়ানো গাছ। ডালপালা ছড়ানো, অনেকটা ছাতার মতো। অসংখ্য গাছ। প্রায় প্রতিটি আমগাছের গোড়া পাকা করা। এ ছাড়া জমিদারবাড়ির প্রবেশমুখেই রয়েছে সারি সারি ঝাউগাছ।

কোনো ভ্রমণপিপাসু ব্যক্তি জমিদারবাড়িটি দেখতে চাইলে ঢাকা থেকে আসতে সময় লাগে মাত্র ৩০-৪০ মিনিট। বাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা বা প্রাইভেট কারে করে আসতে পারেন এখানে। রাজধানী ঢাকার সায়েদাবাদ, গুলিস্তান অথবা যাত্রাবাড়ী থেকে যেকোনো পরিবহনে যেতে পারেন রূপগঞ্জের রূপসী বাসস্ট্যান্ড কিংবা ভুলতা পর্যন্ত।

সেখান থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা অথবা রিকশাযোগে পিচঢালা রাস্তায় সহজেই আসা যায় এ জমিদারবাড়িতে। রাজধানীর ডেমরাঘাট হয়ে উত্তর দিকের রাস্তা ধরে মাঝিনা ঘাট থেকে নৌকায় শীতলক্ষ্যা নদী পার হলেই রূপগঞ্জের জমিদারবাড়ি।

মন্তব্য করুন