বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

নারকেলগাছের ফলন কমে যাওয়া ও গাছের মৃত্যুর জন্য অনেক রোগের মধ্যে যে রোগটি মুখ্য ভূমিকায় তা হচ্ছে হোয়াইট ফ্লাই পোকা ও শূতিমূল ছত্রাকের আক্রমণ, যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বাগেরহাটের গ্রামগঞ্জে ঘুরলে বর্তমান দৃশ্য হচ্ছে, সারি সারি নারকেলের বাগান কিন্তু গাছে নারকেল নেই। সামান্য কিছু গাছে নারকেল ফললেও তার দাম আকাশচুম্বী।

দক্ষিণাঞ্চলের নারকেলের বাগানের অনেক মালিক বা কৃষক এ রোগ থেকে সঠিক প্রতিকারের পথ জানেন না। নারকেলের রোগবালাই নিয়ে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের প্রচার-প্রচারণাও তেমন চোখে পড়ে না।
বাগেরহাটের প্রধান অর্থকরী ফসলের অন্যতম নারকেল। নারকেলকে কেন্দ্র করে বহু মানুষের জীবন-জীবিকা নির্ভরশীল। ৪০টির মতো অটো তেলের মিল গড়ে উঠেছে বাগেরহাটে। বর্তমানে ফলন কমে যাওয়ায় প্রায় মিলই বন্ধ হয়ে রয়েছে। হাজার হাজার শ্রমিক কাজ হারিয়ে দিশাহারা। একসময় বাংলাদেশের সিংহভাগ নারকেল তেলের জোগান দিত বাগেরহাট।

এ ছাড়া নারকেলের খোলা বা ছোবড়া দিয়ে বাগেরহাটে বেশ কয়েকটি কারখানা গড়ে উঠেছিল। এখান থেকে উৎপাদিত পণ্য দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও রপ্তানি হতো। সেই কুটিরশিল্পেরও আজ করুণ দশা। এ অঞ্চলের গ্রামীণ নারীরা নারকেলের পাতা থেকে শলা সংগ্রহ করে বিক্রি করেন। নারকেলের মালা বা আচা মশার কয়েলের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বাগেরহাট মৎস্য চাষের জন্য বিখ্যাত। ঘেরের মাছের খাদ্য হিসেবেও নারকেলের খইল ব্যবহার করা হয়।

মোট নারকেলের ৩৫ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশ ডাব হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ডাব আমাদের প্রয়োজনীয় খনিজ পদার্থের জোগান দেয়। ফলন কমে যাওয়ায় ডাবের দামও বেড়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ডাবের চাহিদার একটি বড় অংশ বাগেরহাট পূরণ করত। ডাব ও নারকেল সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। একটি নারকেল বর্তমানে ১০০ টাকা ও ডাবের দাম ৬০ টাকার কাছাকাছি চলে এসেছে।
নারকেলগাছেরও যে যত্ন নিতে হয়, তা দক্ষিণাঞ্চলের সাধারণ মানুষের মধ্যে তেমন কোনো ধারণা নেই। গাছের গোড়ায় মাটি দেওয়া ছাড়া ওই এলাকার মানুষ রোগবালাই সম্পর্কে তেমন সচেতন নয়। তাই সচেতনতামূলক প্রচারণাও কার্যকর চিকিৎসাপদ্ধতি সম্পর্কে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। বর্তমানে বাগেরহাটে নারকেলের ফলন ৭০ থেকে ৮০ ভাগ কমে যাওয়ার পেছনে অন্যান্য রোগের মধ্যে হোয়াইট ফ্লাই পোকা ও শূতিমূল ছত্রাকের আক্রমণ অন্যতম।

বাগেরহাট জেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এমন বিপর্যয় ইতিপূর্বে তাঁরা দেখেননি। দক্ষিণাঞ্চলে প্রচুর নারকেলগাছ থাকায় দৈনন্দিন সংসার খরচ চালাতে প্রতি হাটে হাটে নারকেল বিক্রি করার রেওয়াজ প্রচলিত আছে। কিন্তু নারকেলের ফলন কমে যাওয়ায় অনেক পরিবারে তাঁদের দৈনন্দিন জীবনযাপনে ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। এই অঞ্চলে খাদ্যতালিকা ও উৎসব-আনন্দে নারকেলের উপস্থিতি ছিল প্রতিদিনকার। তবে আজ দুষ্প্রাপ্যতা ও দামের কারণে প্রায়ই তা অনুপস্থিত।

বহু অর্থ ব্যয় করে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করে শ্রীলঙ্কা, কেরালা বা ভিয়েতনামি চারা রোপণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাস্তবতা হচ্ছে, এতে তেমন কোনো আশানুরূপ ফল পাওয়া যাচ্ছে না। সফলতার কোনো পথও দেখা যাচ্ছে না। তাই আমাদের দেশীয় জাতকেই এখন সঠিক পরিচর্যার সময় এসেছে।

সর্বশেষ আশার বিষয়, দেরিতে হলেও কৃষি মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে বিশেষ নজর দিয়েছে। আশা করছি মন্ত্রণালয় দ্রুত সময়ের মধ্যে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে রোগপ্রতিরোধে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে। আমাদের নারকেলগাছকে বাঁচাতেই হবে। আবার ফিরিয়ে আনতে হবে সেই সোনালি দিন। অতীতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হর্টি কালচার সেন্টারসহ কৃষি উন্নয়নে বহু প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও দুঃখের বিষয়, বাগেরহাটে এযাবৎকালে এ ধরনের কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। দক্ষিণাঞ্চল যেহেতু কৃষিপ্রধান এলাকা, তাই বাগেরহাটে জরুরি ভিত্তিতে একটি হর্টি কালচার সেন্টার স্থাপন সময়ের দাবি। এ ছাড়া বাগেরহাটে নারকেলের ফলন বেশি হওয়ায় অচিরেই এখানে নারকেল গবেষণাকেন্দ্র তৈরি করে নারকেলের ফলন বৃদ্ধিতে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। দক্ষিণাঞ্চলের আপামর মানুষ নারকেলের ফলন বৃদ্ধিতে সরকারের আশু পদক্ষেপের দিকে চেয়ে আছে।

লেখক: পার্থ দেব সাহা, প্রভাষক, ইতিহাস বিভাগ, সরকারি ফকিরহাট ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মহিলা ডিগ্রি মহাবিদ্যালয়, ফকিরহাট, বাগেরহাট।

নাগরিক সংবাদ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন