default-image

ধর্ষণ একটি শব্দ, একটি আতঙ্ক, একটি সামাজিক ব্যাধি ও নারীর প্রতি সহিংসতার হিংস্রতম রূপ। পুরুষ নামক কাপুরুষেরা আদিকাল থেকেই নারীর ওপর এই নৃশংসতম অন্যায় করে আসছে। কখনো তা এককভাবে, কখনো তা দলবদ্ধভাবে। সভ্যতার ক্রমবিকাশে মানুষ দিন দিন সভ্য হয়ে উঠলেও কোনো কোনো পুরুষ যেন এখনো গহিনে পুষে রেখেছে ধর্ষণ নামক এক প্রাগৈতিহাসিক পশুত্বকে, যা প্রতিনিয়তই পুরো সমাজকেই খুবলে খাচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে পাওয়া ধর্ষণ ও গণধর্ষণের খবরে বারবার আঁতকে উঠছে পুরো দেশ। ফুঁসে উঠছে সচেতন ও প্রগতিশীল মানুষ। কিন্তু থেমে নেই ধর্ষণের ঘটনা। উল্টো দিনকে দিন ধর্ষকেরা যেন হয়ে উঠছে লাগামহীন। ধর্ষকদের হাত থেকে অবুঝ শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ নারী—কেউ নিরাপদ নয়। সমানতালে চলছে ছেলে শিশুদের নিগ্রহের ঘটনাও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বইছে নিন্দার ঝড়, প্রতিবাদে সরব হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষ। একই সঙ্গে চলছে ধর্ষণের কারণ ও ধর্ষকদের শাস্তির বিধান নিয়ে তর্ক-বিতর্ক। অনেকের দাবি, ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি হোক মৃত্যুদণ্ড। গতকাল অধ্যাদেশ আকারে তা জারিও হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

ধর্ষণ যে একটি ঘৃণ্যতম কাপুরুষতা, শাস্তিযোগ্য অপরাধ, তা কি ধর্ষণকারীরা জানে না? নাকি তারা ভিনগ্রহ থেকে আসা ভিন্ন প্রজাতির কোনো প্রাণী? ধর্ষণকারীরা কিন্তু আমাদের সমাজেরই অংশ, তারা আমাদেরই স্বজন, মূল স্রোতে মিশে থাকা মানসিক বিকারগ্রস্ত পুরুষ। অথচ ধর্ষণকারীদের দেখে চেনার কোনো উপায় নেই। চলনে-বলনে ও গড়নে তারা নিতান্তই অন্য দশজন সাধারণ মানুষের মতোই। তাহলে কেন তারা ঘৃণিত হবে জেনেও জড়িয়ে পড়ছে ধর্ষণ নামক ঘৃণ্য অপরাধে। আর রচিত করছে সভ্যতার কলঙ্ক।

সমাজবিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানী কিংবা আইন প্রয়োগকারী বিভিন্ন সংস্থা প্রতিনিয়তই তালাশ করছে এই জঘন্যতম অপকর্মের কারণ ও প্রতিকারের উপায়। কিন্তু সাধারণ মানুষ হিসেবে আমাদের কি কোনো দায়বদ্ধতা নেই? আমরা কি স্রেফ হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকব? আপনার-আমার পরিবারের পুরুষ সদস্যটি যে একজন সুযোগসন্ধানী ধর্ষক নয়, তার নিশ্চয়তা কী? কোনো পুরুষ নিশ্চয়ই ধর্ষক হয়ে জন্মায় না; বরং সামাজিক পরিবেশে ধীরে ধীরে অনেকেই ধর্ষক হয়ে ওঠে। কী সেই সামাজিক পরিবেশ, কখনো কি তা অনুমান করার চেষ্টা করেছি। অথচ অগোচরেই আমরাই তৈরি করছি ধর্ষণের অনুকূল সামাজিক পরিবেশ। যৌন নিপীড়ন, ধর্ষণ ও অপরাধ করার ক্ষেত্রে যেসব বিষয় প্রভাব বিস্তার করে, তা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে—

বিজ্ঞাপন

আলগা পারিবারিক বন্ধন

খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। যখন এ দেশের অধিকাংশ মানুষ যৌথ পরিবারে বেড়ে উঠত। সেখানে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, বোঝাপড়া, দায়িত্বশীলতা ও শাসনের বেড়াজালের মধ্য দিয়ে তৈরি হতো পারিবারিক মূল্যবোধ, যা বংশপরম্পরায় সবাইকে সহনশীল ও আত্মসংযমী হতে শেখাত। ফলে চাচাতো, মামাতো, ফুপাতো ভাইবোনেরা একসঙ্গে বেড়ে উঠলেও কখনো নারী-পুরুষের বিভেদ তৈরি হতো না।

সামাজিক নৈতিকতার অবক্ষয়

কিছুকাল আগেও গ্রামে বা মহল্লায় কোনো ছেলেমেয়ে খারাপ কিছু করলে তাকে যেকোনো বয়োজ্যেষ্ঠ শাসন করার অধিকার রাখতেন। এলাকার সব ছেলেমেয়েকে সবাই নিজের ছেলেমেয়ের মতোই সঠিক দিকনির্দেশনা দিতেন, যা এখনকার দিনে কল্পনাও করা যায় না। এতে নতুন প্রজন্ম হয়ে উঠছে বেপরোয়া ও লাগামহীন।

আদর্শহীন অগ্রজ

শিশুরা হলো অনুকরণ ও অনুসরণপ্রিয়। কিন্তু তাদের চারপাশে যখন ঘুষখোর, সুদখোর, চোরাকারবারি, দুর্নীতিবাজরাই সফল ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়, তখন তারাও সে পথই অনুসরণ করবে, সেটাই স্বাভাবিক। ভ্রষ্ট অগ্রজদের আদর্শ মেনে বেড়ে ওঠা প্রজন্মের কাছে নারীর প্রতি সম্মান আশা করা নিতান্তই বাড়াবাড়ি।

বিজ্ঞাপন

লক্ষ্যহীন শিক্ষাব্যবস্থা

‘লেখাপড়া করে যে, গাড়িঘোড়া চড়ে সে।’ সামগ্রিক অর্থে এটাই যেন এখনকার শিক্ষাব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। মা–বাবা ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারের কথা মাথায় রেখে সেভাবেই তাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলছে। নীতি-নৈতিকতা বা মানবিকতার চেয়ে যেখানে বিশাল বেতনের চাকরি পাওয়াই মুখ্য, সেই প্রজন্মের কাছে তো ভোগবিলাসই জীবনের লক্ষ্য হবে।

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশের ঘাটতি

আগে বিকেল হলেই ছেলেমেয়েরা মেতে উঠত নানা ধরনের খেলাধুলায়। আর বছরব্যাপী স্কুল, কলেজ ও পাড়ায় পাড়ায় চলত নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও খেলাধুলার আয়োজন। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় হারিয়ে যাচ্ছে খেলার মাঠ। আর সাংস্কৃতিক কার্যক্রমকে এখনকার অধিকাংশ অভিভাবক নিতান্তই সময়ের অপচয় মনে করেন। সুতরাং সুকুমার বৃত্তির বিকাশ রোধ করে আদর্শ প্রজন্ম আশা করে বোকামি।

অর্থ ও নেশাদ্রব্যের সহজলভ্যতা

মা-বাবার কাছে আবদার করে শখের জিনিস বা খাবার কিনে নেওয়ার রেওয়াজ আমাদের বহু বছরের পুরোনো। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও উঠতি ছেলেমেয়ের হাতে বাড়তি টাকা কখনোই দিতেন না অভিভাবকেরা। ফলে ছোটবেলা থেকেই অর্থের ব্যাপারে তাদের জবাবদিহির মধ্যে পড়তে হতো। কিন্তু বর্তমান সময়ে অনেক মা–বাবা সন্তানের চাহিদার অতিরিক্ত অর্থের জোগান দিয়ে সন্তানকে করছে বিপথগামী। সেই সঙ্গে চারপাশে নেশাদ্রব্যের সহজলভ্যতা তাদের কৌতূহলী মনকে অল্প বয়সেই নিয়ে যাচ্ছে অন্ধকার নেশার জগতে। নেশায় আসক্ত মানুষ হারিয়ে ফেলে হিতাহিত জ্ঞান। তার পক্ষে তখন ন্যায়-অন্যায়ের ফারাক বোঝা অসম্ভব হয়ে উঠে। যার ফল আমরা হাতেনাতেই পাচ্ছি।

বিজ্ঞাপন

প্রযুক্তির লাগামহীনতা

বিটিভিতে পরিবারের সবাই মিলে বাংলা সিনেমা বা প্যাকেজ নাটক দেখার অভিজ্ঞতা বেশি দিন আগের কথা নয়। কিন্তু এখন সবার হাতে হাতে স্মার্টফোন, ট্যাব, ল্যাপটপ থাকায় সম্মিলিতভাবে বিনোদন উপভোগ করা হয় না। উঠতি ছেলেদের হাতে এখন ইন্টারনেট জগতের হাতছানি। কোনটা ভালো আর কোনটা মন্দ, সেই তফাত করার সামর্থ্যও এখনো হয়নি তাদের। ফলে অনাচার ও অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছে অনেকেই। ধর্ষণের মতো নিকৃষ্ট কাজেও দ্বিধা করে না।

ধর্মীয় মূল্যবোধের অভাব

ধর্মীয় অনুশাসন মানুষকে সামাজিকভাবে শৃঙ্খলিত করে। মুরব্বিদের সঙ্গে মসজিদ, মন্দির বা গির্জায় যাওয়া এখন বছরের বিশেষ বিশেষ দিন ছাড়া হয় না বললেই চলে। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার দায়বদ্ধতাও খুব একটা দেখা যায় না। এতে ধীরে ধীরে ভোঁতা হচ্ছে ধর্মীয় অনুভূতি। বাড়ছে মানুষের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা।

দুর্বল আইনের শাসন

দুর্বার গতিতে গাড়ি চালানো বা পাবলিক প্লেসে সিগারেট ফুঁকানো মানুষটাও ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় ঢুকলে নিপাট ভদ্রলোক হয়ে যায়। কারণ সে জানে, এখানে আইন বড্ড কড়া। আর অপরাধ করলে শাস্তি পেতেই হবে। তার মানে আইনের শাসন কড়া হলে মানুষ বেআইনি কাজ করতে ভয় পায়। তাই ধর্ষণ করে দিব্যি বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ানো বা ভিকটিমের ধর্ষণচিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিতেও এতটুকু পরোয়া করে না অনেকেই। গ্রাম্য সালিসে টাকাপয়সা দিয়ে ধর্ষণকারীর সঙ্গে আপসে বাধ্য করা কিংবা ধর্ষণের শিকার মেয়েটির পরিবারের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে ভিটেছাড়া করার ঘটনাও নেহাত কম নেই এই দেশে। স্থানীয় প্রভাবশালীদের দৌরাত্ম্য, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নীরবতার কারণে এমন ঘটনা ঘটছে। সরকারের উচিত দলমত–নির্বিশেষে আইনের শাসন নিশ্চিত করে দ্রুততম সময় ধর্ষণ ও নিপীড়নকারীদের উপযুক্ত শাস্তি কার্যকর করা।
লেখক: নাট্যকার ও নাট্য পরিচালক

মন্তব্য পড়ুন 0