default-image

আমেরিকানদের এই হ্যালোইন নিয়ে বাড়াবাড়িটা আমাকে বরাবরই বিরক্ত করে। যেখানে আমরা বাঙালিরা ভূতের ভয়ে কাবু, সেখানে তারা স্বয়ং ভূত সেজে বেড়ায়।

বাচ্চারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে চকলেট তুলে আনে ঈদে সালামি তোলার মতো। অথচ আমার মনে আছে, ছোটবেলায় নানাভাই রাতে টয়লেটে বা বাইরে কোথাও যাওয়ার আগেও আয়াতুল কুরসি পড়তে পড়তে যেতেন। নানাভাইয়ের আয়াতুল কুরসি পড়া দেখেই অদৃশ্য ভূতের ভয়ে কাবু হয়ে যেতাম আমরা। নানাভাই অবশ্য সব সময়ই এমন দোয়া পড়তেন, নানির সঙ্গে ঝগড়ার সময়ও আমি তাঁকে অনবরত দোয়া পড়তে দেখেছি। সত্য বলতে কি, এই সাদা চামড়াদের সবকিছুতেই অতি ঢং। একটু বাড়াবাড়ি না করলে যেন এদের চলে না।

বিজ্ঞাপন

আজ রাতে আমার একটা ডিনারের দাওয়াত আছে আমার প্রতিবেশী আলেক্সের বাড়িতে। আলেক্স আর আমি দীর্ঘদিনের প্রতিবেশী। তাই তার দাওয়াত আমাকে গ্রহণ করতেই হবে। ওহ, আমার পরিচয় তো দেওয়া হয়নি।

আমি ইফতেখার উদ্দিন। বয়স ৬০। জন্মসূত্রে একজন বাঙালি হলেও বহু বছর ধরে আছি আমেরিকাতে। এখান থেকে ইউনিভার্সিটি পাস করে চাকরি নিয়েছিলাম আমারই ডিপার্টমেন্টে। এখন অবসরে চলে গেছি। বিয়ে করেছিলাম একজন বাঙালিকে, টেকেনি। দুই মেয়ে মাঝেমধ্যে আমাকে এসে দেখে যায়। কী ভাবছেন, খুব কষ্টে আছি? বিশ্বাস করুন, এখানে এভাবেই মানুষ ভালো থাকে।

ঠিক সাতটায় আমি আলেক্সের বাসায় গেলাম। বিশাল আয়োজন! গান বাজছে, তার তালে তালে বয়সের ভারে নুয়ে পরা ভূতগুলো নাচছে। কেউ কুঁচকে যাওয়া চামড়ায় অনেক মেকআপ করে পরি সেজেছেন, কেউ-বা ক্যাপ্টেন জ্যাক স্প্যারো।
আলেক্স আমাকে দেখে এগিয়ে এল, ‘ইফতেখার, আজও তুমি কস্টিউম পরলে না?’ আলেক্স সেজেছে জম্বির সাজে, যদিও সে না সাজলেও পারত। কারণ, তাকে এমনি জম্বির মতো লাগে। তাকে যখন আমি তরুণ দেখেছি, তখনো সে এমনি রোগা ও জম্বি ফেস ছিল। ‘ডিয়ার আলেক্স, ইউ নো, আই এম অলরেডি আ ওল্ড ঘোস্ট, ডু আই রিয়েলি নিড কস্টিউম?’ অন্য কেউ হলে হয়তো রাগ করত কিন্তু আলেক্সের কথা আলাদা, সে আমাকে চেনে।

ওয়েলকাম ড্রিঙ্কস হাতে ধরিয়ে সে চলে গেল বাকিদের ওয়েলকাম করতে।
ডিনারে দারুণ সব খাবার ছিল। বিশেষ করে এনাবেল শেপ কেক এবং ড্রাকুলার মতো সাজানো ডাক রোস্ট। এত দারুণ করে ডাক রোস্টটা সাজাল কী করে? ডিনারের পর গার্ডেনে জম্পেশ আড্ডার মাঝখানে টেরি বলল সবাইকে তাদের লাইফের ট্রু ঘোস্ট স্টোরি বলার জন্য। টেরি উইচ সেজেছে এবং সে এত রোগা, তাকে লাগছেও আসল শাকচুন্নির মতো। টেরির প্রস্তাবে সবাই সাড়া দিল। আশ্চর্যের বিষয়, এরা সবাই জীবনে ভূত দেখেছে। আমার মনে হচ্ছিল, আমার মামাতো ভাই বশিরকে এখানে বসিয়ে দিলে ভালো হতো। কারণ, ওর জীবনে এমন কোনো ভূত নেই, সে দেখেনি। একবার নাকি এক মেয়ে ভূত সারা রাত ওর বিছানার পাশে বসে ছিল! বশির এই সব সত্যি দেখে, নাকি বানিয়ে বলে কে জানে কিন্তু বলে এমন করে যে সবাই বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়। যা-ই হোক, আমার পালা এল। লম্বা একটা চুমুক দিলাম ব্লাডি মেরি নামের এই অখাদ্যে। ‘দেখো, তোমাদের মতো আমার জীবনে এমন কোনো ভূতের ঘটনা নেই, তবে হ্যাঁ, খুব অদ্ভুত একটা ঘটনা আমার সঙ্গে ঘটেছিল। প্রথমেই বলে নিই, আমার বয়স যখন চার মাস, আমার মা মারা যায় একটা অ্যাকসিডেন্টে। কাপড় দিতে গিয়ে ছাদ থেকে পড়ে যান, খুব সাধারণ একটা ঘটনা। ছাদে কোনো রেলিং ছিল না আর সেদিন অনেক বৃষ্টি হয়েছিল, পুরো ছাদটাই পিচ্ছিল ছিল। এরপর আমার বাবাই আমাকে বড় করতে থাকেন। কলেজ পাস করার পর আমার বাবা মারা যান স্ট্রোক করে। তারপরই আমি চলে আসি এখানে, খালার কাছে।’

একটু থেমে গলাটা ভিজিয়ে নিলাম। ‘আমার মায়ের মৃত্যুর পর বাবা বিয়ে করেননি, আসলে তিনি খুব ভেঙে পড়েছিলেন। তাঁর বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন ছিলাম আমি। আমি মায়ের অভাবটা বুঝিনি কখনো। তখন আমি কলেজ শেষ করে ইউনিভার্সিটি ভর্তি কোচিং করছি। আমাদের দেশের লেখা পড়ার সিস্টেমটা তোমাদের এখানকার শিক্ষাব্যবস্থা থেকে অনেকটাই ভিন্ন। তো একদিন আমি বাড়ি ফিরছিলাম কোচিং ক্লাস থেকে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছি সিগন্যাল পড়ার জন্য। যথারীতি সিগন্যাল পড়ল। রাস্তাটা পার হতে যাব, ঠিক তখনই কোথা থেকে একটা মোটরসাইকেল এসে আমাকে মেরে দিল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমি ছিটকে পড়লাম এক দিকে। আইল্যান্ডে বাড়ি খেয়ে জ্ঞান হারালাম। জ্ঞান ফিরে এল বাবার কণ্ঠ শুনে। অবাক হয়ে দেখি আমি আমাদের বাসায় আমার বিছানায়। মাথায় হাত দিয়ে দেখি রক্তও নেই। পাশের ঘর থেকে বাবার কথা শোনা যাচ্ছে। উঠে গিয়ে দেখলাম মা বিছানায় বসে আছেন মাথা নিচু করে, আর বাবা খুব বাজেভাবে তাঁকে গালি দিচ্ছেন। একসময় বাবা ছুটে গিয়ে মায়ের গায়ে হাত তুললেন। মা চুপ করে বসে আছেন। একসময় বাবা আমার পাশ দিয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেলেন আর মা আস্তে আস্তে হেঁটে চলে গেলেন রান্নাঘরে কিন্তু কেউ আমাকে দেখল না! আরও দেখলাম মায়ের পেটটা বেশ বড়, অর্থাৎ মা প্রেগন্যান্ট! কী আশ্চর্য! কী হচ্ছে এসব? আমি এতটাই হতবাক হয়ে গিয়েছি, ঘোর কেটে সামনে তাকিয়ে দেখি আমি বসে আছি নানাভাইদের বাসায়। মা শুয়ে আছেন, কোলে কয়েক দিনের একটা বাচ্চা। এমন সময় বাবা ঢুকলেন ঘরে। মা বেশ তটস্থ হয়ে উঠে বসলেন। চোখে ভয়। বাবা ঘরে ঢুকেই হাতে ব্যাগটা মায়ের দিকে ছুড়ে মারলেন। মা আমাকে বাঁচাতে গিয়ে নিজে ব্যথা পেলেন কিন্তু কিছু বললেন না। বাবা আবার তাঁকে বকতে লাগলেন। এমন সময় নানির গলা শোনা গেল।

বিজ্ঞাপন

নানি ডাকছেন মাকে দুপুরের খাবার খেতে। মা আর বাবা হঠাৎ একদম স্বাভাবিক হয়ে গেলেন নানাভাই আর নানির সামনে, যেন কিছুই হয়নি। একেকটা ঘটনা আমার সামনে যেন ছবির মতো আসতে লাগল।

‘নানাবাড়ি থেকে সোজা চলে এলাম আবার আমার বাসায়। মায়ের কোলে চার মাসের আমি। গভীর মমতায় আমাকে দেখছেন। তাঁর চোখে পানি। মা আমাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে কর্নারের টেবিলের কাছে একটু দাঁড়ালেন, তারপর ধীরপায়ে চলে গেলেন রুম থেকে।

‘ঠিক এখানে আমার অদ্ভুত স্বপ্নগুলো শেষ হলো। যখন চোখ মেললাম, দেখলাম আমি হাসপাতালে। বাবা ভয়ার্ত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন, “ইফতি, তুই ঠিক আছিস?”

চারপাশে পিনপতন নীরবতা। সবাই অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আর এক গ্লাস ‘ব্লাডি হেল’ ব্লাডি মেরি নিয়ে গলাটা ভিজিয়ে নিলাম। ‘এর প্রায় তিন মাস পর আমি বাসায় ফিরলাম। বাবা এই ৩ মাসে আমার চিন্তায় অনেক রোগা হয়ে গেছেন। আমি বাসায় ফেরায় যেন প্রাণ ফিরে পেলেন। আমি ধীরে ধীরে সুস্থ হতে লাগলাম। কিন্তু মাথা থেকে ওই দৃ্শ্যগুলো কোনোভাবেই যাচ্ছিল না। কী ছিল ওগুলো? খুব স্পষ্ট ছিল প্রতিটি ছবি। মাথার ভেতর ঘুরপাক খাওয়া ছবিগুলো আমাকে প্রতিদিন ভাবায়।
‘সেদিন ছিল শুক্রবার। বাবা রান্নার খালাকে বলে আমার সব প্রিয় খাবার রান্না করেছেন। খাবার টেবিলে বসে বাবা বললেন, “তোমার ছোট খালা তো তোমাকে নিয়ে যেতে চায়। কী করবে তুমি?”

‘“আমি চলে গেলে তুমি কীভাবে থাকবে, বাবা?”
‘বাবা কষ্টের হাসি হাসলেন, “তাই বলে কি তোমার ভবিষ্যৎ থেমে থাকবে, আমি হয়তো কাল থাকব না। তোমার একটা কিছু না করে গেলে ওপারে তোমার মায়ের কাছে আমি কী জবাব দেব, বলো?”

‘মায়ের প্রসঙ্গ আসতে আমি আবার হারিয়ে গেলাম সেই টুকরো ছবিগুলোতে। মনের অজান্তে মুখ দিয়ে বের হয়ে গেল, “বাবা, মায়ের সুইসাইড নোটটা কি তুমি পুড়িয়ে ফেলেছ?”

‘আচমকা এই প্রশ্নে বাবা যেন তিরবিদ্ধ হলেন। অনেক বছরের পুরোনো অজানা ভয় তাঁর চোখে, পুরো মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল আতঙ্কে। খাবারটা শেষ না করে উঠে চলে গেলেন তাঁর রুমে।

‘নিজের ঘরে ফিরে অনেক ভাবলাম। একটা অপরাধবোধ কাজ করছে। নিছক কিছু কল্পনার জের ধরে আমি বাবাকে কী আজেবাজে কথা বললাম! ভিত্তিহীন স্বপ্ন! মাথায় আঘাতের কারণে হয়তো আমি উল্টাপাল্টা কিছু কিছু দেখেছি, যা আমার ভ্রম ছাড়া আর কিছু নয়। জানি না কেন বাবা চুপ ছিলেন। হয়তো আমার কথায় কষ্ট পেয়েছেন। আমার তাঁর কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত।

‘রাত প্রায় ১১টা তখন। আমি উঠে বাবার ঘরে গেলাম।

‘“বাবা, ঘুমিয়ে পড়েছ?”

‘কোনো সাড়া না পেয়ে ঘরে ঢুকলাম দরজা ঠেলে। লাইট জ্বলছে, বাবা ঘুমিয়ে পড়েছেন। গায়ের চাদরটা সরে গেছে। চাদরটা ঠিক করতে গিয়ে বুঝলাম, বাবা ঘুমিয়ে নয়, মারা গেছেন।

‘“তোমার মতো একটা পশুর সঙ্গে সংসার করা আমার পক্ষে আর সম্ভব হলো না। খুব চিন্তা হচ্ছে আমার ছেলেটার জন্য। ভালো স্বামী তো হতে পারলে না, ভালো বাবা হওয়ার চেষ্টা করো।”

‘এটাই ছিল মায়ের সুইসাইড নোট।

‘বাবা মারা গেলেন স্ট্রোক করে। আমি চলে এলাম ছোট খালার কাছে। নাহ! কাউকে বলিনি সেদিনের ঘটনা। অনেক ভেবেছি। কী ছিল ওসব? আমার কল্পনা? নাকি আমি চলে গিয়েছিলাম অন্য কোনো ভুবনে? অ্যাকসিডেন্টের পর ১৫ মিনিট আমি নাকি পুরো নিথর হয়ে ছিলাম। সবাই ভেবেছিল আমি মরেই গেছি। বাবা পুরো হাসপাতাল দৌড়েছেন আমার জন্য, আমার প্রাণ ফিরে পাওয়ার জন্য।’

যেন কবরের নীরবতা চারদিকে। সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আছে। নীরবতা ভেঙে আলেক্স বলল, ‘ইফতি, তুমি তো কোনো দিন বলোনি এমন একটা দুঃখ পুষে বেড়াচ্ছ সারা জীবন।’ আমি মৃদু হাসলাম। ‘আলেক্স, আমি তো কোনো দিন মনেই করতে চাই না ওই ১৫ মিনিট আমার জীবনে এসেছিল। দ্যাট ফিফটিন মিনিটস, ডিসক্লোজ দ্য ব্রুটাল ট্রুথ অ্যান্ড ডেস্ট্রয় মাই লাইফ।’

*লেখক: কেবিন ক্রু, বেসরকারি এয়ারলাইনস। danamirza06@gmail.com

মন্তব্য করুন