বিজ্ঞাপন

বললাম, না, চা খাব না। আপনাদের সঙ্গে একটু কথা বলতে পারি? চা বিক্রেতা মামার প্রথম হাসিটা দেখে মনে হলো, কী হবে মামা কথা বলে, দিন তো এভাবেই কাটবে। তারপর মুচকি হেসে বললেন, হ্যাঁ মামা, বলেন কী বলবেন?

এই যে বিধিনিষেধের মধ্যে বের হয়েছেন, পুলিশ কিছু বলে না?

বলে, তখন বলি এখনই বাসায় যাব। তা ছাড়া আমি তো বেশি দূরে যাই না। এখানেই বসি। দু-একজন আসে। চা খায়। চলে যায়।

কয় টাকা পান এ বিধিনিষেধের মধ্যে চা বিক্রি করে?
পাই কিছু, কোনোরকমে চলে যায় দিন।
কোথায় থাকেন পরিবার নিয়ে?

আমি থাকি শুক্রাবাদ। পরিবার থাকে কিশোরগঞ্জে।
ছেলেমেয়ে আছে, মামা?
হ্যাঁ, দুই মেয়ে। বিয়ে দিছি। তারা ভালোই আছে।
টাকা পাঠান বাড়িতে নিয়মিত?

জি মামা, ছোট একটা ছেলে আছে। আপনার মামি আছে। টাকা তো পাঠাতেই হয়।
বিধিনিষেধ না থাকলে বেচাবিক্রি কেমন হয়, মামা?
ভালোই হয়।

চা বিক্রেতা আবদুস সাত্তার মামার পাশেই বসে ক্ষুধার্ত মানুষের মতো চায়ে চুমুক দিচ্ছিলেন ভেতরে ঢুকে যাওয়া কী যেন এক জিজ্ঞাসু চোখের জিন্নাহ মামা।

জিন্নাহ মামার বাড়ি কোথায়, জানতে চাইলে বললেন, স্বাধীনতার পর থেকেই নাকি তাঁর কোনো বাড়ি নেই। পরিবার নিয়ে থাকেন মিরপুরের আদর্শ রোডে। চা খেতে খেতে উঠে দাঁড়িয়ে উত্তেজিত হয়ে কথা বলতে লাগলেন। বললাম, মামা, বসেন, শান্ত হোন, সবারই বাড়ি থাকতে হবে, এমন কোনো কথা নেই।

তা ছেলেমেয়ে তো আছে, বাড়ি না হয় নেই, তাই না?
হ্যাঁ, ছেলেমেয়ে আছে। তয় তারা ভালো না। মেয়ে মারতে আসে আর ছেলে ভাত দিব কোত্থেকে, ভাত থাকলে না দিব?

সত্যিই তো, ছেলে থাকা মানেই যে ভাত-কাপড় দেবে, এমন নীতিমালা তো কোথাও লেখা নেই, বরং সারা পৃথিবীতে যে মহামারি শুরু হয়েছে, তাতে ছেলেদেরই আজকাল বাবাদের আশ্রয়ে থাকতে হচ্ছে। কী এক অদ্ভুত রোগ হলো পৃথিবীর, সব কেমন চোখের পলকে বদলে গেল।

ওনাদের সঙ্গে গল্প করতে করতে মনটা আরও ভারাক্রান্ত হয়ে গেল, বিষাদে ভরে উঠল সবুজের কাছে যাওয়ার স্নিগ্ধ অনুভূতি।

আমাদের গল্পের মাঝখানে রাস্তায় রিকশা থামিয়ে একটু জিরাইতে আসলেন আরেকজন রিকশাওয়ালা। এসেই চায়ের অর্ডার দিলেন। বললাম, মামা, আস্তে আস্তে তো ভিড় বেড়ে যাচ্ছে, আসর জমে যাচ্ছে যে তাহলে? লকডাউনের মানে কী? তাও ভালো, সবার মুখেই মাস্ক। বাহ্, আপনারা তো বেশ সচেতন! রিকশাওয়ালা আমার কথা টপকে বেশ জোর গলায় বললেন, আমাগো করোনা হয় না, আমরা গরিব মানুষ। করোনা হয় বড়লোকগো। আমরা রিকশা না চালাইলে খামু কী?

default-image

না, এটা আপনার ভুল কথা। অসুখ গরিব আর বড়লোক দেখে হয় না। সারা পৃথিবীতে এ মহামারি ছড়িয়ে পড়েছে। বুঝি, আপনারা...

আমরা কাজ না করলে খাব কী, পেট তো বিধিনিষেধ বোঝে না। কিন্তু এভাবে এক হয়ে বসে গল্প করা যাবে না। আমাদের আরও সাবধানে থাকতে হবে।
মামা, আপনাদের কয়েকটা ছবি তুলি?

হ্যাঁ মামা, তোলেন, কোনো সমস্যা নাই।
এদের মতো মানুষেরা ভাবেন, ছবি তোলা মানেই বুঝি কাগজে দেওয়া, খুব আশা নিয়ে তাঁরা ছবি তোলার অনুমতি দেন। যদি কোনো সুহৃদ ব্যক্তি তাঁদের পাশে দাঁড়ান, বাড়িয়ে দেন মানবতার হাত!

কথা শেষে আমি একলা হয়ে যাওয়া শহরের ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে থাকি, একটু একটু করে এগিয়ে যাই সবুজ গাছেদের কাছে। ওদের ছুঁয়ে দেখি আর মনে মনে বলি, কী পাপ করেছিলাম আমরা, তোরা আমাদের এত বড় শাস্তি দিয়ে যাচ্ছিস? কী অপরাধ আমাদের, এভাবে না খাইয়ে মারছিস পৃথিবীর এসব অসহায় গরিব-দুঃখী মানুষকে? ক্ষমা করে দে না এবারের মতো। আমরা প্রাণ ভরে শ্বাস নিই। মুক্ত আকাশ দেখি। তুমুল বৃষ্টিতে ভিজে গলা ছেড়ে গাই…

‘আমার সারাটা দিন মেঘলা আকাশ বৃষ্টি তোমাকে দিলাম
শুধু শ্রাবণ সন্ধ্যাটুকু তোমার কাছে চেয়ে নিলাম।’

আসলে জীবন কেটে যায় জীবনের নিয়মে। সেখানে এ গরিব অসহায় মানুষগুলোকে বিধিনিষেধে কেন বাঁধা যায় না কোনো নিয়মেই। পেটে ক্ষুধা থাকলে মানুষ হয়ে উঠে লজ্জাহীন, বেপরোয়া এক জীব।

*লেখক: রোজিনা রাখী, সিনিয়র এক্সিকিউটিভ, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

নাগরিক সংবাদ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন