default-image

আধুনিককালে গড়ে ওঠা নগরায়ণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে নদ-নদী। তাই পৃথিবীর বড় শহরগুলোর গোড়াপত্তনও নদীকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের প্রায় ছোট-বড় সব শহরই নদীকেন্দ্রিক যোগাযোগব্যবস্থার সুবিধার ওপর ভর করে গড়ে উঠেছে। আর এ কারণেই রূপসা নদীর কথা শুনলেই খুলনা, কর্ণফুলী নদীর কথা মনে হলেই চট্টগ্রাম এবং একইভাবে সুরমা নদীর কথা শুনলে সিলেট ও বুড়িগঙ্গা নদীর কথা মনে হলেই ঢাকার শহরের ছবি চোখে ভেসে ওঠে। আধুনিককালে দ্রুত যান চলাচলের জন্য স্থলপথটাই মানুষের কাছে বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু যখন ঢাকার যানজটের চিত্র সামনে চলে আসে তখন সবারই নিরন্তর একটি দুর্ভোগের জ্বালা মনকে অতিষ্ঠ করে তোলে।

বিশ্বব্যাংকের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০০১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ঢাকার রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা ১৬ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ঢাকায় গাড়ির গতি প্রতি ঘণ্টায় ৬ দশমিক ৪ কিলোমিটার। আর হাঁটার গতি হচ্ছে প্রতি ঘণ্টায় ৫ কিলোমিটার। এই তথ্যে দেখা যাচ্ছে, গাড়ির যে গতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তা মানুষের হাঁটার গতির সমান প্রায়।

গবেষণায় দেখা যায় বর্তমানে যানজটের কারণে ঢাকায় দৈনিক ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, যার আর্থিক ক্ষতি দাঁড়ায় বছরে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল ক্ষতি থেকে দেশের অর্থনীতিকে বাঁচাতে, মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সময়জ্ঞানকে অধিকতর অর্থবহ করতে, ঢাকার চারপাশের নৌ যোগাযোগ ব্যবস্থা রাখতে পারে বিশাল ভূমিকা।

বিজ্ঞাপন

ঢাকার যানজট নিরসন নিয়ে বর্তমান সরকারের আগে কোনো সরকারই গুরুত্বসহকারে ভাবেনি, যার কারণে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা ঢাকা শহরের ভূরি ভূরি সমস্যা আমাদের নাস্তানাবুদ করে ছাড়ছে। ঢাকার সমস্যাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় আকার ধারণ করেছে যানজট সমস্যা; যেটি কিনা বহির্বিশ্বেও বাংলাদেশকে নিয়ে সমালোচনার অন্যতম একটি বিষয়বস্তু। রাজধানীর এই যানজট সমস্যার সমাধানে বেশ কিছু মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে বর্তমান সরকার, যা বেশ প্রশংসা কুড়াচ্ছে। কিন্তু বড় বড় মেগা প্রকল্প দাঁড় করালেই ঢাকার যানজটের সমস্যার একেবারে সমাধান হয়ে যাবে না, আমাদের বিকল্প সমাধানও ভাবতে হবে। কেননা যানজটের এ সমস্যাটি মূলত অধিক জনসংখ্যা, প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল রাস্তা এবং অধিক যানবাহনের জন্য সৃষ্ট। উদ্ভূত এই সমস্যা সমাধানে রাস্তা সম্প্রসারণ এবং নতুন রাস্তা তৈরি করলে যানজট অনেকটা কমে আসবে—এটা যেমন সত্য, তেমনি ঢাকা শহরে ঘনবসতির আধিক্য দিন দিন আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও চওড়া রাস্তা ও অধিক যানবাহনের প্রয়োজন পড়বে, এটাও সত্য। কিন্তু ঢাকার এই রাস্তা সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা মিলবে কোথায়? প্রতিদিন বাড়ছে ঢাকা শহরের জনসংখ্যা, বাড়ছে যানবাহন; একই সঙ্গে দিন দিন যানজটের সমস্যাও তীব্রতর হয়ে উঠছে। তাই এখন সময় এসেছে ঢাকা শহরের ভেতর এবং আশপাশে বয়ে চলা নদীগুলোকে নৌপরিবহনের উপযোগী করে তোলা। যানজট নিরসনে ঢাকার অভ্যন্তরীণ নদ-নদীগুলো হতে পারে বিকল্প সমাধান।

default-image

ঢাকা জেলা একটি নদীবিধৌত এলাকা। এ জেলার অভ্যন্তরীণ গুরুত্বপূর্ণ নদ–নদীগুলো হলো ধলেশ্বরী, বুড়িগঙ্গা, বংশী, তুরাগ, বালু। নদীগুলোর আন্তসংযোগ থাকায় ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় সহজেই যাতায়াত সম্ভব। দেশের বেশির ভাগ নদীগুলো পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত, এ অবস্থায় নদীগুলোকে নৌপরিবহনের উপযোগী করতে পারলে এবং নদীপথের যানবাহনগুলোর গতি বৃদ্ধি করতে পারলে দেশের যোগাযোগব্যবস্থার অভূতপূর্ব পরিবর্তন সাধিত হবে। কিন্তু দেশে নৌপরিবহনের এত সুবিধা থাকা সত্ত্বেও সঠিক ব্যবস্থাপনা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং নৌপরিবহনে যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে না পারায়, আমরা নদীগুলোকে কাজে লাগাতে পারছি না।

ঢাকা শহরে যানজট নিরসনে রাস্তা সম্প্রসারণ করা হয়েছে, নির্মাণ করা হয়েছে উড়ালসেতু, তবু ঢাকায় গাড়ির চাকা স্বাভাবিক হয়নি। মেট্রোরেল নির্মাণ করা হচ্ছে, এতে যানজটের সমস্যা অনেকটা কমে আসবে বলেই সবার ধারণা, তবে একেবারে নির্মূল হয়ে যাবে, তা কিন্তু নয়। তাই আমাদের ঢাকার অভ্যন্তরীণ নৌ যোগাযোগকে এখন থেকেই গুরুত্ব দিতে হবে। যানজট নিরসনে ঢাকার নদ-নদীগুলো হতে পারে সর্বোত্তম বিকল্প সমাধান। ২০০৪ সালে প্রথম সদরঘাট থেকে গাবতলী পর্যন্ত একটি যাত্রীবাহী ওয়াটার ট্যাক্সি নামানো হয়েছিল। তারপর ২০১০ সালে ২৮ আগস্ট দুটি ওয়াটার বাস নামানো হয়। কিন্তু যাত্রীর অভাব এবং ওয়াটার বাসে ত্রুটির কারণে সেবাটি সচল রাখা যায়নি। এরপর তৃতীয় দফায় ২০১৩ সালের জুলাই মাসে আরও চারটি ওয়াটার বাস নামানো হয়। কিন্তু কিছুদিন চলার পর তা–ও বন্ধ হয়ে যায়।

default-image

ঢাকায় নৌপরিবহনের এই ব্যর্থতার নানা কারণ আছে। এর মধ্যে সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাব, প্রচার-প্রচারণার ঘাটতি এবং নদীদূষণ অন্যতম কারণ। নদীর তীরে গড়ে ওঠা অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে দেশের নদীগুলোর অবস্থা দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। মেগাসিটি ঢাকা দেশের প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্রস্থল হলেও অপরিকল্পিভাবে যত্রতত্র শিল্পকারখানা গড়ে ওঠায় সেগুলো সরকারের পক্ষে পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছে, যার ফলে শিল্পকারখানার রাসায়নিক অপরিশোধিত বর্জ্য সহজেই আশপাশের নদীগুলোতে মিশছে, এতে নদীগুলো নাব্যতা হারিয়ে ফেলছে। একইভাবে প্রভাবশালী ভূমিদস্যু দখলবাজেরা দীর্ঘদিন ধরে নদীগুলো দখল করে আসছে; যার ফলে এগুলো ক্রমাগত খালে পরিণত হচ্ছে এবং নৌচলাচলের অনুপযোগী হয়ে যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

ঢাকার যানজট নিরসনে নদী যেখানে বড় ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে, সেখানে দেশে নদীপথে ঢাকার অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ স্থাপনে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ এখনো লক্ষ করা যায় না। বরং অপরিকল্পিতভাবে ঢাকার বিভিন্ন নদীর ওপর তৈরি করা হয়েছে ব্রিজ-কালভার্ট, যা নৌচলাচলের জন্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। ঢাকার চারপাশ ঘিরে সরকার নৌপরিবহনের একটি পরিকল্পনার কথা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, কিন্তু ক্রমাগত নদীদূষণ, নদীর নাব্যতাসংকট এবং নদীতে পানির অভাব সরকারের এই পরিকল্পনা দিন দিন কঠিন করে তুলছে। তাই সরকারকে নদীদূষণ, নদী দখল এবং নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে গড়ে ওঠা শিল্পকারখানার বিরুদ্ধে এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে নৌপরিবহন ঢাকার যানজট নিরসনে যে সম্ভাবনা এখনো দেখা যাচ্ছে, সেটিও সঠিক পরিকল্পনা এবং দূরদর্শিতার অভাবে ভেস্তে যাবে।


* লেখক: আকিজ মাহমুদ, শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

নাগরিক সংবাদ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন