default-image

বৈশ্বিক করোনা মহামারির কালে পৃথিবীর প্রায় সব দেশেরই শ্রমবাজার, বিশেষত অদক্ষ এবং স্বল্পদক্ষ শ্রমিকের জন্য শ্রমবাজার সংকুচিত হয়ে আসছে। পত্রিকার পাতা খুললেই বা ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে আমরা প্রতিনিয়ত দেখতে পাই, বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি শ্রমিকেরা চাকরি হারাচ্ছেন এবং দেশে ফিরে আসছেন।

গত ২ সেপ্টেম্বর দৈনিক প্রথম আলোয় প্রকাশিত তথ্যমতে দৈনিক প্রায় দুই হাজার শ্রমিক দেশে ফিরে আসছেন। উপরন্তু, প্রায় চার লাখ শ্রমিক নিঃস্ব, ছুটিতে এসে আটকা পড়েছেন দুই লাখ, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত ফেরত এসেছেন এক লাখ, ভিসা করেও যেতে পারেননি এক লাখ এবং নতুন তিন লাখ শ্রমিক বিদেশে যাওয়ার কথা থাকলেও যেতে পারেননি। আরও গুরুতর খবর, বাংলাদেশিদের জন্য সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার মালয়েশিয়াও বাংলাদেশি শ্রমিকদের প্রবেশে নিষধাজ্ঞা আরোপ করেছে (দৈনিক প্রথম আলো, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২০)।

বিজ্ঞাপন

যদিও কয়েক মাসে আমাদের প্রবাসী আয়ে ভাটা পড়েনি বরং রেকর্ড গড়েছে, তথাপি উপরোক্ত পরিসংখ্যান শুধু উদ্বেগের নয়, ভয়েরও কারণ। প্রবাসী আয়ে রেকর্ডের কারণ হতে পারে করোনা এবং কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে স্থায়ী অভিবাসীরা বেশি করে প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) দেশে পাঠিয়েছেন। উপরন্তু অপ্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যমের পরিবর্তে সম্ভবত প্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যমে প্রবাসী আয়ের সরবরাহ বেড়েছে, তাই মনে হচ্ছে প্রবাসী আয়ে ভাটা পড়েনি। কিন্তু নিয়মিত যে প্রবাসী আয় অর্থাৎ অস্থায়ী শ্রমিকদের মাধ্যমে যে আয়, তাতে নিশ্চিত ভাটা পড়েছে।

যে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী শ্রমিক দেশে ফিরে আসছেন, তাঁদের বেশির ভাগই নিঃস্ব। এ ক্ষেত্রে তাঁদের নতুন করে দেশেই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সহজ হবে না। কারণ, তাঁদের যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, আর্থসামাজিক অবস্থান এবং বয়সের পাশাপাশি দেশে কাজের ধরনও ভিন্ন। তাই শুধু যাঁরা ফেরত আসছেন, তাঁদের জন্য নয় বরং যাঁরা নিজের শ্রম বিদেশে রপ্তানি করতে চান, তাঁদের জন্য এখনই নতুন শ্রমবাজারের সন্ধান করতে হবে। আর নতুন এবং বিকল্প শ্রমবাজার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র হতে পারে নতুন গন্তব্য।

আমেরিকা প্রতি বৎসর এইচ-২এ (H-2A) এবং এইচ-২বি (H-2B) ভিসার মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক অভিবাসী শ্রমিক নেয়। এইচ-২এ ভিসাধারী শ্রমিকদের মূলত কৃষিশ্রমিক এবং এইচ-২বি ভিসাধারী শ্রমিকদের অকৃষিশ্রমিক হিসেবে অভিহিত করা হয়। এ ধরনের শ্রমিকেরা সাধারণত সাময়িক, অস্থায়ী বা মৌসুমি শ্রমিক নামে পরিচিত। তাঁরা একবার ভিসার মাধ্যমে এক বছর থেকে সর্বোচ্চ তিন বছব একাধারে আমেরিকায় অবস্থান করে কাজ করতে পারেন। তবে তিন বৎসর পর একজন শ্রমিককে অবশ্যই দেশে ফেরত আসতে হবে এবং নিয়োগকর্তা চাইলে তিনি তিন মাস পরই আবার আমেরিকায় ফিরে যেতে পারবেন।

যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বিপুল পরিমাণ ধান, গম, ভুট্টা, তুলা, আখসহ বিভিন্ন ফল ও সবজি উৎপাদিত হয়। এ সমস্ত ফসল উৎপাদনের জন্য প্রচুর কৃষিশ্রমিকের প্রয়োজন। অধিকন্তু প্রতি বৎসর প্রচুর পরিমাণ মাছ চাষের মাধ্যমে উৎপাদন ছাড়াও সমুদ্র থেকে আহরণ করা হয়। যে কারণে প্রতি বৎসর বিশ্বের প্রায় ১৮০টি দেশ থেকে ২-১০ লাখ কৃষিশ্রমিক আমদানি করা হয়।

অপরদিকে, উৎপাদিত কৃষিপণ্যের প্রক্রিয়াকরণ, রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি বিনির্মাণ, হোটেল-রেস্তোরাঁয় কাজ, মালি, ক্লিনার, ইলেকট্রিশিয়ান, প্লাম্বার, ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারসহ অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রে প্রতি বৎসর ৬৬ হাজার শ্রমিক আমদানি করা হয়। এ সমস্ত শ্রমিকদের অকৃষিশ্রমিক হিসেবে অভিহিত করা হয়। কৃষিশ্রমিক আমদানির কোনো ঊর্ধসীমা না থাকলেও বৎসরে মাত্র ৬৬ হাজার অকৃষিশ্রমিক আমদানি করা যায়। সেটিও আবার দুই ভাগে বিভক্ত, অক্টোবর থেকে মার্চের মধ্যে ৩৩ হাজার আর বাকি ৩৩ হাজার এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে।

কৃষি এবং অকৃষি উভয় শ্রমিক অনেক সুবিধা পেয়ে থাকেন। তাঁদের যাতায়াত এবং থাকার ব্যবস্থা নিয়োগকর্তাকে করতে হয়। উপরন্তু সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশের প্রশাসন ২০১১ সালে এক নির্বাহী আদেশবলে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি প্রতি ঘণ্টায় ৮ দশমিক ৭ ডলার থেকে বৃদ্ধি করে ১৪ দশমিক ৭৭ ডলারে নির্ধারণ করেন। মৌসুমে বাড়তি (ওভার টাইম) কাজের সুবিধা তো রয়েছেই।

বিজ্ঞাপন

এ ধরনের শ্রমিকদের সঙ্গে নিয়োগকর্তার যেহেতু একটি সংযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়, তাই শ্রমিকদের কর্মদক্ষতা এবং কাজের প্রতি সততা ও নিষ্ঠা থাকলে একই শ্রমিক যুগ যুগ ধরে একই মালিকের অধীনে কাজ করতে পারেন। একবার ভিসা প্রাপ্তির পর একজন শ্রমিক যেহেতু একটানা তিন বৎসর আমেরিকায় অবস্থান করতে পারেন, সে ক্ষেত্রে অনেক সময় নিয়োগকর্তারা শ্রমিকদের পরিবারকেও কাছে আনার জন্য বিনিয়োগ করে থাকেন। পরিবার কাছে থাকলে যেমন শ্রমিকদের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি পায়, তেমনি পরিবারের সদস্যরাও উন্নত জীবনযাপনের সুযোগ লাভ করে।

কৃষি ও অকৃষি উভয় ধরনের শ্রমিক আমদানির জন্য প্রক্রিয়াটি একটু ভিন্ন। উভয় শ্রমিকের জন্য আমেরিকার একজন নিয়োগকর্তা ডিপার্টমেন্ট অব লেবারে আবেদন করে থাকেন। তবে নিয়োগকর্তাকে এটাও প্রমাণ করতে হয় যে সেখানে কৃষি বা অকৃষি কাজের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ আমেরিকান শ্রমিকের স্বল্পতা রয়েছে। ডিপার্টমেন্ট অব লেবার যখন নিশ্চিত হয় যে প্রকৃতই শ্রমিকের স্বল্পতা রয়েছে এবং নিয়োগকর্তার অস্থায়ী শ্রমিক প্রয়োজন, তখন ডিপার্টমেন্ট অব লেবার নিয়োগকর্তাকে শ্রমিকের নাম, পরিচয় ও দেশ উল্লেখ করে প্রয়োজনীয় আই-১২৯ ফরম জমাদানের অনুমতি প্রদান করে থাকে। অপরদিকে, আবেদনে উল্লিখিত শ্রমিক নিজের দেশের আমেরিকান দূতাবাসে ভিসার আবেদন করে থাকেন। ভিসা প্রাপ্তির পর একজন শ্রমিক যুক্তরাষ্ট্রে গমনের পরবর্তী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকেন।

এমপ্লয়মেন্ট ও ট্রেইনিং অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ইটিএ) মাধ্যমে বর্তমানে চারটি ন্যাশনাল প্রসেসিং সেন্টার যথা আটলান্টা, জর্জিয়া, শিকাগো এবং ইলিনয় থেকে কৃষি ও অকৃষি উভয় শ্রমিকের জন্য ভিসা প্রক্রিয়াকরণের সুবিধা রয়েছে। এর সঙ্গে জড়িত অন্য সংস্থাগুলো হলো ডিপার্টমেন্ট অব লেবার (ডিওএল), ইউনাইটেড স্টেটস সিটিজেনশিপ ও ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস (ইউএসসিআইএস) এবং ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (ডিএইচএস)। যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর (সেক্রেটারি অব স্টেট) অনুমোদনক্রমে স্বরাষ্ট্র সচিব শ্রমিক আমদানিযোগ্য দেশসমূহের তালিকা প্রকাশ করে থাকেন। এই তালিকা এক বৎসর মেয়াদি হয় এবং পরিবর্তিত হতে পারে।

default-image

শ্রমশক্তি রপ্তানির এ সুবিধা অর্জন করতে হলে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি ও কর্মসংস্থান ব্যুরো, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং জনশক্তি রপ্তানিকারকদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে। জনশক্তি রপ্তানি ও কর্মসংস্থান ব্যুরোকে বিদেশ থেকে ফেরত আসাসহ বিদেশে গমনেচ্ছুদের হালনাগাদ তালিকা তৈরি করতে হবে। তালিকায় শ্রমিকের পেশা, দক্ষতাসহ স্থায়ী ও অস্থায়ী ঠিকানা, নাম, বয়স, লিঙ্গ, অভিজ্ঞতা, সম্ভব হলে পাসপোর্ট নম্বর ইত্যাদি উল্লেখ করতে হবে।

এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাটি পালন করতে হবে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কূটনৈতিক সফলতার ওপর নির্ভর করবে আমাদের দেশের নাম কৃষি ও অকৃষিশ্রমিক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে লিপিবদ্ধ করার। এটি অসম্ভব কিছু নয়। আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সমুদ্র বিজয় থেকে শুরু করে অনেক ক্ষেত্রেই সফলতার স্বাক্ষর রেখেছে। জনশক্তি ও কর্মসংস্থান ব্যুরোর তৈরি করা তালিকা নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগাযোগ করতে হবে এবং আমাদের শ্রমিকরা কেন যোগ্য তা তাঁদের বোঝাতে হবে।

তবে জনশক্তি রপ্তানিকারকদের ভূমিকাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। নিয়োগকর্তা ও নিয়োগপ্রার্থীদের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরির মূল ভূমিকাটি গ্রহণ করতে হবে জনশক্তি রপ্তানিকারকদের। নিয়োগকর্তাদের কাছে নিজ দেশের শ্রমিকের কর্মদক্ষতা, কর্তব্যনিষ্ঠা ইত্যাদি তুলে ধরতে হবে। এর জন্য তাঁদের খুঁজে বের করতে হবে নিয়োগকর্তাদের নাম, ঠিকানা ইত্যাদি এবং এগুলো আমেরিকার ডিপার্টমেন্ট অব লেবারের ওয়েবসাইটে সহজলভ্য।

যেহেতু আমাদের দেশের শ্রমিকদের তালিকাভুক্ত করাই প্রধান চ্যালেঞ্জ, সেহেতু জনশক্তি কর্মসংস্থান ব্যুরো, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং শ্রমশক্তি রপ্তানিকারকদের সম্মিলিতভাবে নিয়োগকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করতে হবে। তার জন্য দরকার হলে সশরীর ভ্রমণ করতে হবে এবং নিয়োগকর্তাদের বোঝাতে হবে। এর জন্য প্রয়োজনে সরকারি প্রণোদনাও প্রদান করতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া, টেক্সাস, লুইজিয়ানা, আলাবামা, মিসিসিপি, ফ্লোরিডা ইত্যাদি অঙ্গরাজ্যের আবহাওয়া অনেকটা বাংলাদেশের মতোই। আর এ সমস্ত অঙ্গরাজ্যেই কৃষি ও অকৃষি শ্রমিকের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। তাই দেরি না করে এখনই উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। আমাদের প্রবাসী শ্রমিকেরা স্বভাবতই পরিশ্রমী। একবার যদি আমাদের দেশের নাম তালিকাভুক্ত করা সম্ভব হয়, তবে ভবিষ্যতে এর সুফল আমরা পেতেই থাকব। সর্বোপরি মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা ও অবৈধ পথে জনশক্তি রপ্তানির প্রবণতা কমবে এবং দেশের সুনাম উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে।

*লেখক: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর। mrhasanhstu@gmail.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0