default-image

নদী আমাদের কাছে মায়ের মতোই। নদী শুধু দিয়ে যায়, বিনিময়ে কিছুই দাবি করে না। নদী আমাদের দিয়েছে অনেক করেছে ঋণী। অবগাহন-চৈত্র গাত্রদাহন থেকে শুরু করে অনেক কিছুই! এই নদী সভ্যতার বিকাশে অনেক অবদান রেখেছে। নদীকে নদীর মতো বাঁচতে দেওয়া উচিত। নদী রক্ষার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন আদালত বিভিন্ন নির্দেশনা দিচ্ছেন। পরিবেশের জন্য নদী খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই নদী রক্ষার গুরুত্ব নিয়ে এখন সবাই কথা বলছে।

চলনবিলের মধ্য দিয়ে বেশ কয়েকটি নদ–নদী প্রবাহিত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো করতোয়া, আত্রাই, গুড়, গুমানী, নারদ, হুরাসাগর, বাঙ্গালী, বড়াল, মরা বড়াল, নন্দকুঁজা, তুলসী, ভাদাই, চিকনাই, বরোনই, মুসা খাঁ, তেলকুপি ইত্যাদি। এই নদীগুলো ঘিরেই একসময় গড়ে উঠেছিল বাঘাবাড়ী, কলম, গুরুদাসপুর, নলডাঙ্গা, আহসানগঞ্জ, মির্জাপুর, ভাঙ্গুড়া, বড়াল ব্রিজ, ফরিদপুর, গোবিন্দপুর  ঘাট, সিংড়া, চাঁচকৈড়, বিলদহর, হালসা, দয়রামপুর, নাজিরপুর, ছাইকোলার মতো বড় বড় বাজার। চলত রমরমা ব্যবসা। সেই সময় নদ–নদীতে বছরজুড়েই পানি থাকত। বাজারগুলোতে ব্যবসা-বাণিজ্য বেশ ভালোই চলত। বছরের পর বছর পলি পড়ে, আর ড্রেজিং না করার কারণে নদ–নদী এখন খালে পরিণত হওয়ার পথে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নদ–নদী হারিয়েছে তার সৌন্দর্য আর জৌলুশ। এখন বর্ষাকালে নদ-নদী পানিতে ভরে থাকলেও বর্ষা শেষ হলে পানির দেখা মেলে না; পানি শুকিয়ে যায়। চলনবিলের নদ–নদীতে অনেক আগেই বছরজুড়ে নিয়মিত নৌ চলাচল বন্ধ হয়েছে। অথচ নদ-নদীগুলোতে একসময় লঞ্চ চলত! নদ-নদী দখল আর বর্জ্য ফেলে ভরাট করার কারণে নৌপথ সংকুচিত হয়েছে। নদ-নদীকেন্দ্রিক কর্মজীবী মানুষ হয়েছে বেকার, তারা পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে। প্রভাবিত হয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষিজমিতে সেচকাজ ব্যাহত হয়েছে; প্রতিবেশ ব্যবস্থা আর মত্স্য সম্পদ পড়েছে হুমকির মুখে।

নাটোর চিনিকলের বর্জ্যে নারদ ও নন্দকুঁজা দূষিত হয়, গুমানীসহ অন্যান্য নদ-নদীও প্রভাবিত হয়। বর্জ্যের প্রভাবে নদ-নদীর পানি বিষিয়ে ওঠে, এতে নদ-নদীর পানি নষ্ট হয়ে যায়। পরিবেশ ও  প্রতিবেশ ব্যবস্থা প্রভাবিত হওয়ার পাশাপাশি পচা পানিতে শুধু মাছই নয়, মারা যাচ্ছে অন্যান্য জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণী। নদী–তীরবর্তী জনপদের মানুষ সেচ, স্নানসহ ঘরবাড়ির কাজে এখন নদ-নদীর পানি ব্যবহার করতে পারছে না। দূষিত পানি ভুল করে কেউ ব্যবহার করলে আক্রান্ত হচ্ছে পানিবাহিত রোগে। সবার অবহেলায় চলনবিলের নদ-নদীগুলো আজ মৃত প্রায়। প্রকাশ্যেই তিলে তিলে নদ-নদীর মৃত্যু ঘটছে।

বিজ্ঞাপন
default-image

সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশনের ২০১৯ সালের একটি রায়ে দেশের নদ-নদীগুলোকে জুরিসটিক পারসন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ নামের সংগঠনের রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তুরাগ নদকে লিভিং এনটিটি ঘোষণা করা হলেও পরে দেশের সব নদ–নদীর ক্ষেত্রে এই রায় বহাল রাখা হয়। এই যুগান্তকারী রায়ের মাধ্যমে নদ-নদীর মৌলিক অধিকার স্বীকৃত হয়েছে, যা জীবন্তসত্তা হিসেবে একজন মানুষ সাংবিধানিক অধিকার ভোগ করে থাকে। আদালতের ঘোষণা অনুযায়ী, দেশের নদ-নদীগুলো এখন থেকে প্রাণী যেমন কিছু আইনগত অধিকার ভোগ করে; তেমনি অধিকার নদ-নদীও ভোগ করবে। নদ-নদীর প্রতিনিধি হয়ে কেউ আদালতে ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি জানালে নদ-নদী প্রতিকার পাবে। বিশ্বব্যাপী নদীর আইনগত সত্তা ধারণার সূচনা হয়েছে কলম্বিয়ার আদালতের একটি রায় থেকে। নিউজিল্যান্ডসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশেষ বিশেষ নদীকে লিগ্যাল পারসন ঘোষণা করা হয়েছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের মধ্যপ্রদেশের রাজ্য আদালত থেকে নর্মদা নদীকে লিভিং এনটিটি ঘোষণা করা হয়েছে।

চলনবিলের অনেক নদ-নদীতে ড্রেজিং শুরু হয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। মূলত নদ-নদীর নাব্য বৃদ্ধি, সেচকাজ আর মাছের প্রজননের জন্যই নদ-নদী খনন করার কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ড্রেজিং নিয়ানুসারে হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। নদ-নদী খনন সঠিকভাবে না হলে এর কোনো সুফলই পাবে না চলনবিলের প্রান্তিক মানুষ। তাই নদ-নদীগুলো রক্ষার জন্য সুশীল সমাজসহ স্থানীয় পৌরসভা, স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, পরিবেশ অধিদপ্তর, নদী রক্ষা কমিশন একক অথবা যৌথ ভূমিকা রাখলে চলনবিলের নদ-নদীগুলো ফিরে পেতে পারে তার হারানো রূপ। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন দেশের নদ-নদী, খাল-বিল, জলাশয় রক্ষার অভিভাবক। নদ-নদীগুলোকে জুরিসটিক পারসন হিসেবে ঘোষণা করার পর নদ-নদী রক্ষায় আদালতেরও ভূমিকা বেড়েছে। চলনবিলের নদ-নদীগুলোর হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে দূষণ-দখল প্রতিরোধ করাসহ কলকারখানার বর্জ্য যেন নদ–নদীর পানিতে না মিশতে পারে, এ জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তবেই চলনবিলের জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে।
লেখক: গল্পকার ও কবি

নাগরিক সংবাদ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন