default-image

উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলাকে একসময় মানুষ চিনত মঙ্গাপীড়িত এলাকা হিসেবে। চিরাচরিত কাল আশ্বিন-কার্তিকে ওই সব অঞ্চলে কোনো ধরনের কাজ থাকত না।

আবার বন্যাকবলিত এলাকা হওয়ায় আমন সেচের ওপর প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষ তেমন নির্ভরও করতে পারে না। ফলে, একেবারে বন্ধ হয়ে যায় পরিবারের আয়-রোজগার। মানুষকে না খেয়ে থাকতে হয় দিনের পর দিন। করোনাভাইরাসের প্রভাব এখনো বিস্তার করায় আমরা দ্রুত অর্থনৈতিক মন্দার সম্মুখীন হচ্ছি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৩০ সালের অর্থনৈতিক মহামন্দা-পরবর্তী বিশ্বে এই প্রথম আবারও আমরা আরেকটি মহামন্দার সম্মুখীন হতে যাচ্ছি। শুধু বাংলাদেশ পরিমণ্ডলে নয়, বহির্বিশ্বকে সামনে অত্যন্ত কঠিন এক অর্থনৈতিক মন্দার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।

বিজ্ঞাপন

সৌভাগ্যের বিষয়, উত্তরাঞ্চলকে বলা হয় বাংলাদেশের শস্যভান্ডার। বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষের খাদ্যের জোগান হয় উত্তরাঞ্চলের ভূমি থেকে। একটা সময় এ অঞ্চলের কৃষিনির্ভর ও ভূমিকেন্দ্রিক মানুষের শস্যের কিংবা কর্মের বিকল্পের বড় অভাব ছিল। কর্মের বিকল্পের অভাব এখনো বর্তমান, কিন্তু শস্যের বিকল্প ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বিভিন্ন মৌসুমে উৎপাদনশীল শস্য আবিষ্কারের কারণে কৃষিনির্ভর মানুষ কিছুটা হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছে। কিন্তু করোনাভাইরাসের এই সময়ে অনেক শ্রমজীবী মানুষ বাড়িতে বেকার হয়ে বসে আছেন। তেমনি প্রবাসী শ্রমিকেরাও দেশে ফেরত আসছেন পর্যাপ্ত কর্মের অভাবে। তাই এখন শুধু কৃষির ওপর নির্ভর করা ছাড়া গ্রাম-বাংলার মানুষের বিকল্প কোনো পথ খোলা নেই।

অন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়ে পুনঃ পুন ভয়াবহ বন্যার ভয়াল গ্রাসে আমন খেতের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। নিম্নাঞ্চলের অনেক আবাদি জমি পড়ে আছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ বছর ভরা কার্তিকেও ব্যাপক বৃষ্টি হয়েছে, যার কারণে শীতকালীন সবজি চাষে মানুষ হোঁচট খাচ্ছে। আবার অল্প কিছু অঞ্চলে শীতকালীন সবজির চাষ হয়েছে। তাই এখন শীতের মৌসুমে বাজার ভরা শীতের সবজি থাকার কথা থাকলেও তা দেখা যাচ্ছে না। তাই এখন শীতকালীন সবজি অত্যন্ত চড়া দামে বাজারে বিক্রি হচ্ছে। একদিকে মানুষের যেমন আয়-রোজগার কমে গেছে, অন্যদিকে বাজারে নিত্যপণ্যের দামও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কার্তিক মাসেও কাজের অভাবে কৃষিশ্রমিক কিংবা কৃষিজীবী মানুষ সম্পূর্ণ বেকার হয়ে বসে আছে। এভাবে তাঁদের ঘরে সঞ্চিত খাদ্য শেষ হয়ে এলে তাঁরা মহাজন, জোতদার কিংবা সুদি ব্যবসায়ীদের দ্বারে দ্বারে ঘুরবেন নগদ অর্থের জন্য। আর একবার মহাজন, জোতদার বা সুদি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সুবিধা গ্রহণ করলে দীর্ঘ সময় ধরে শারীরিক শ্রম বা ফসলের ভাগ দিয়ে তাঁদের ঋণ পরিশোধ করতে হবে। ফলে এই কৃষিনির্ভর দরিদ্র মানুষেরা ক্রমাগত দুর্বিষহ অবস্থায় পতিত হবেন। উত্তরাঞ্চলের এই নীরব দুর্ভিক্ষই হচ্ছে মঙ্গা। এখন ফসলের বেশ কিছু বিকল্প কিংবা বছরের বিভিন্ন সময়ে উৎপাদনশীল শস্য থাকার কারণে পুরো বছর তাঁরা কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত থাকেন।

কিন্তু এখন প্রশ্ন হলো, মঙ্গা না থাকলেও উত্তরাঞ্চলের এসব কৃষিজীবী মানুষ দিনের পর দিন বা মাসের পর মাস উৎপাদনের পেছনে যে শ্রম দিচ্ছেন, সে তুলনায় তাঁদের অর্থনৈতিক জীবন কতটা সচ্ছল হয়েছে? অথবা মঙ্গা থেকে উত্তরণের পর কি তাঁদের জীবনে প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়েছে? উত্তর: না, হয়নি। বরং আমাদের অবকাঠামোগত উন্নয়ন থেকে শুরু করে মৌলিক চাহিদাগুলোও পূরণ হয়নি কখনো। বর্ষায় উত্তরের জনপদ পানিতে ডুবে থাকে, বন্যা নিয়ে যায় সর্বস্ব, শীতের রাতে ঠান্ডায় কাঁতরায়। এসব কষ্ট এখন উত্তরের মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী। কার্তিক মাসে গ্রাম-বাংলার মানুষ যেমন খাদ্যকষ্টে ভোগে, তেমনি গবাদিপশুরও চরম খাদ্যসংকট দেখা দেয়। বিশেষত গ্রামাঞ্চলে এই কার্তিক মাসে রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যায়। সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, চলতি বছর আইএমএফের ভাষ্যের চরম প্রতিফলন ঘটতে চলছে। সেই সঙ্গে লক্ষণীয় যে বঙ্গবন্ধু সেতু উত্তরাঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক জীবনে খুবই গুরুত্ববহ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হয়েছিল। সেতু চালুর পর তাঁদের অর্থনৈতিক জীবনে পরিবর্তনও এসেছে। তবে এর পুরো সুফল উত্তরাঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী পাচ্ছে না।

আগে যেখানে তাঁদের উৎপাদিত শস্য ও সবজির বেশির ভাগ ক্রেতা ছিল শুধু উত্তরাঞ্চলের মানুষ, এখন সেখানে তাঁদের উৎপাদিত শস্য ও সবজির ক্রেতা পুরো দেশের মানুষ। সেতু চালু হওয়ায় এখন উত্তরাঞ্চলের মানুষ অনায়াসে ঢাকায় বিভিন্ন কাজে যাচ্ছেন। অতি সহজে তাঁদের উৎপাদিত ফসল ঢাকায় বিক্রি করছেন, পোশাকশিল্পের মাধ্যমে তাঁদের কর্মসংস্থান হচ্ছে। সড়কপথের উন্নয়ন শুধু রাজধানীর সঙ্গেই মঙ্গা এলাকার মানুষের যোগাযোগ বাড়ায়নি, বরং এসব এলাকার অভ্যন্তরীণ যোগাযোগও বেড়েছে। মঙ্গা নিরসনে সড়ক যোগাযোগ বাড়াতে সরকারের কৌশল ছিল পল্লি সড়ক এবং অন্যান্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন। সড়ক ও সেতু বিভাগে উন্নয়নের পরও উত্তরাঞ্চলের মানুষের কাছে রংপুর-ঢাকা অনেক দূর! তাই নিজেদের উৎপাদিত শস্যগুলো স্বল্পমূল্যে স্থানীয় বাজারে পাইকারদের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছে। ফলে তাঁরা শস্যের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। কিন্তু তথাকথিত পাইকাররা এসব শস্য ঢাকায় নিয়ে এসে চড়া মূল্যে বিক্রি করে নিজেদের ফায়দা লুটছেন। এসবের পরও উত্তরাঞ্চলের মানুষ দিনের পর দিন হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে চলছেন, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে শস্যাদি উৎপাদন করছেন। কিন্তু ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় তাঁদের ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটেনি। আমরা জোর গলায় এখন বলি, মঙ্গার দিন শেষ। কিন্তু বজ্রকণ্ঠে বলতে পারি না, তাঁদের দৈন্য ঘুচেছে। জোর গলায় বলতে পারি না, তাঁরা অর্থনৈতিক সচ্ছলতা অর্জন করেছেন! পারতপক্ষে এটাও বলতে পারি না, তাঁদের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এই মরা কার্তিক যেন বারবার গ্রাম-বাংলার অভিশাপ হয়ে না দাঁড়ায়, সে জন্য এখনই অবকাঠামোগত উন্নয়নমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। এর মধ্যে , বাংলাদেশে এই বছর করোনাকালে বন্যা—এ যেন মড়ার উপর দেশে খাঁড়ার ঘা। বিশেষ করে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, সিলেট, জামালপুর জেলায় বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছিল। তবে এই পরিস্থিতি শুধু বাংলাদেশেই না, বরং করোনাকালে সারা পৃথিবীতে দুর্যোগ লেগেই আছে। উত্তরাঞ্চলের এসব জেলা বন্যাকবলিত হওয়ায় প্রতিবছর বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ ও সঠিক বাস্তবায়ন দরকার। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, নদীগুলোর নাব্যতা বাড়ানো। নদীর গতিপথ সাবলীল করার জন্য উন্নত প্রযুক্তিতে ড্রেজিং করে নদীর গতিপথে জমে থাকা পলি অপসারণ করে নদীর নাব্যতা ও পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি করা দরকার। নদীর নাব্যতা বাড়ানো কোথায় ও কীভাবে হবে, তা সঠিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিষয়ভিত্তিক গবেষণা ও প্রযুক্তির মধ্যে সমন্বয় অত্যাবশ্যক।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, গভীরতা বাড়ানোর জন্য নদীর ‘প্রাকৃতিক শক্তিকে’ ব্যবহার করতে হবে। বন্যা ও জলাবদ্ধতার যে কারণগুলো মানুষের সৃষ্টি, তার সমাধানে সরকারের ধারাবাহিক পদক্ষেপ দরকার। বন্যা নিয়ন্ত্রণে নদী, খাল, বিল, হাওর ও অন্যান্য জলাভূমি দখলমুক্ত করা ছাড়া কোনো পথ নেই। শহরের আশপাশে জলাভূমি ভরাট করে পানি প্রবাহের স্বাভাবিক পথ রোধ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম মহানগরীসহ অনেক জেলা শহরে বন্যা নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব। শহরে জলাবদ্ধতা কমাতে হলে এলাকাভিত্তিক সমাধান না খুঁজে পুরো নগরী ও আশপাশের এলাকার জন্য পরিকল্পনা, সঠিক নকশা বা ডিজাইন প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন করা একান্ত দরকার। মোট কথা হলো, বন্যা নিয়ন্ত্রণ নয়, সমাধান খুঁজতে হবে ব্যবস্থাপনায়।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৫০টির ওপরে অভিন্ন নদী আছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণে তিস্তা-গঙ্গাসহ যৌথ নদীগুলোর পানি বণ্টনের বিষয়কে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া অত্যাবশ্যক। ফারাক্কা বাঁধের কারণেই বাংলাদেশ শুষ্ক মৌসুমে খরা এবং বর্ষাকালে বন্যার কবলে পতিত হয়। ভারত সীমান্তে শুধু ফারাক্কা বাঁধই নয়, তিস্তাসহ প্রায় সব কটি নদীর অবকাঠামোগত উন্নয়ন মনিটরিং করা দরকার। এ ক্ষেত্রে ওয়াটার ডিপ্লোম্যাসি আরও জোরদার করা প্রয়োজন। বন্যা নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে বড় পরিকল্পনা ‘ডেলটা প্ল্যান ২১০০’ প্রস্তুত করার প্রায় দুই বছর হচ্ছে, এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়ন শুরু হয়নি। এই প্ল্যান বাস্তবায়নে সরকার ওয়ার্ল্ড ব্যাংক হতে ২ বিলিয়ন ইউএস ডলার পাওয়ার জোর তৎপরতা চালাচ্ছে এবং গ্রিন সিগন্যালও পেয়েছে। এই অভিযোজন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রকৃতিভিত্তিক সলিউশনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত। অন্যান্য স্ট্র্যাটেজি ও পলিসির মতে, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে জাতীয় পর্যায়ের অভীষ্ট লক্ষ্য যেমন: ২০৩০ সালের মধ্যে (ক). চরম দারিদ্র্য দূরীকরণ (খ). উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা অর্জন। সূত্র: (দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলা)।

টেকসই দুর্যোগ মোকাবিলা অনেকটাই নির্ভর করছে আমরা কতটা জোর দিচ্ছি প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধানের ওপর। জলবায়ুজনিত দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। সুপরিকল্পনা গ্রহণ করে এখনই দুর্যোগ মোকাবিলা করতে হবে। শুধু বন্যা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হলে উত্তরাঞ্চলের অবহেলিত জেলাগুলোয় আর মঙ্গার প্রকোপ থাকবে না। হবে আমনের বাম্পার ফলন, লাঘব হবে প্রান্তিক মানুষের দুঃখ-কষ্ট। চরম শান্তির নীড়ে ঘুমাবে গ্রাম-বাংলার মানুষ!

*লেখক: শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর। ronysarker11111@gmail.com

মন্তব্য পড়ুন 0