default-image

‘তোমার ছোট বাবা মারা গেছেন।’ কথাটা যখন মুঠোফোনে বাবুল ফুফা বলছিলেন, তখন একেবারে বিশ্বাস হচ্ছিল না। তাই তাঁকে আবার জিজ্ঞাসা করি, ‘কে?’
‘তোমার শহীদুল বাবা রে।’

মন থেকে কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না। থরথর করে কাঁপছে শরীর। চোখ জলে ভিজে যাচ্ছে। মাত্র কিছুদিন আগে বাড়িতে গেলাম তখন দেখা হলো। এই দেখাই যে শেষ দেখা হবে, কে জানত! ২৩ নভেম্বর ঢাকায় আসবেন। এক চিকিৎসককে সিরিয়াল দিয়ে রেখেছেন। বাঁচার বড় আশা ছিল। অনেক স্বপ্ন নিয়ে তিনি হাঁটতেন। বয়স মাত্র ৪২ বছর হয়েছিল।

চোখের সামনে ভাসতে থাকে সহস্র স্মৃতি। খুব ছোটবেলা থেকে একজন বন্ধুর মতো চলাফেরা। চাচাকে দেখে তো উৎসাহিত হয়েছি—স্কাউটিং, সংগঠন করা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা।

চাচা মো. শহীদুল ইসলাম ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে একসময়ে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। মানুষের উপকারে পাশে থাকতেন। তরুণদের নানাভাবে উৎসাহিত করতেন। জীবনের শেষ সময় তিনি তরুণদের ক্রিকেট খেলার জন্য ক্রিকেট ক্লাব প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছেন। খেলার উন্নয়নের জন্য তিনি নিঃস্বার্থে ব্যয় করতেন। তিনিই তো তরুণ বয়সে রুহিয়ায় পপসম্রাট আজম খানকে নিয়ে একটি গ্রুপ করেছিলেন। রুহিয়া বৈশাখী মেলার অন্যতম উদ্যোক্তাও তিনি। এমন অনেক কর্মকাণ্ড কিংবা ব্যক্তির জন্য তিনি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।

সরকারি চাকরি করেছেন ১৬ বছর। স্বাস্থ্যসেবায় গ্রামের শিশুদের নিয়মিত খোঁজখবর রাখতেন। সদা হাস্যোজ্জ্বল মানুষটি হো হো করে হাসতেন। শিশুদের মতো মন। সবাইকে খুব সহজ মনে ভালোবাসতেন। বাড়িতে বড়দের চেয়ে ছোটদের কাছে সবচেয়ে প্রিয় ছিলেন তিনি।

বিজ্ঞাপন
default-image

আমার খুব মনে পড়ছে। তখন এইচএসসি প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। একটা ম্যাগাজিন বের করব। বৈশাখ মাসে। বৈশাখী মেলায় তা প্রকাশ হবে। এই প্রকাশনার জন্য বড় ভাই আবদুল লতিফ সার্বিক সহযোগিতা করছেন। তখন শহীদুল চাচা ব্যাপক উৎসাহে আমাদের সহযোগিতা করতেন। এমন অনেক প্রেরণার কথা আছে, যা আমাকে আজ বেদনায় ভারাক্রান্ত করে তোলে। পারিবারিকভাবে ছিলেন তিনি একজন দায়িত্বশীল মানুষ। আব্বা অসুস্থ হয়ে গেলেন। বাড়িতে আমরা একেবারে অসহায় হয়ে পড়েছিলাম। চাচা নানাভাবে আমার মায়ের পাশে ছিলেন।

খেলাধুলায় অসম্ভব ভক্ত ছিলেন তিনি। তাঁর প্রিয় ক্রীড়াবিদ ছিলেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা আর ইমরান খান। আর্জেন্টিনার খেলার ছিলেন একনিষ্ঠ ভক্ত। বিশ্বকাপ খেলার সময় আর্জেন্টিনার জন্য তিনি পতাকা বানাতেন। এলাকার তরুণদের জাগিয়ে তোলার জন্য তিনি নানা উদ্যোগ নিতেন।

সৎ ও নিষ্ঠার সঙ্গে চলা ছিল তাঁর ব্রত। তাই তো শেষবিদায় জানাতে কে আসেননি। রাজনীতিবিদ, ক্রীড়াবিদ, শিক্ষক, মুক্তিযোদ্ধা, তরুণ, এলাকার হাজার হাজার মানুষ। চোখের জল ফেলে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। তিনি আমার ও আমাদের কাছে বেঁচে থাকবেন।

মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগে, ৯ নভেম্বর সকাল সাড়ে ১০টায় চাচা ও চাচি শাহিনা আখতারের উদ্যোগে শিশুদের জন্য গড়ে তোলা কিন্ডারগার্টেন স্কুলের একদল শিক্ষার্থী এসেছিল। ওখানে একজন শিশুকে দেখে তিনি হো হো করে শেষ হাসি হেসেছিলেন। তাঁর একমাত্র মেয়ে সারাবান তহুরা সারা। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। বলে, ‘বাবা শেষবারের মতো শিশুটির কাছে শেষ হাসিটা হেসেছিলেন। শিশুটিকে ধন্যবাদ।’

সারার দিকে তাকালে চোখের পানি আর ধরে রাখা যায় না। এমন একটি মায়াবী মেয়েকে রেখে চাচা ওপারে ভালো থাকবেন। সারা হয়তো তার বাবাকে খুঁজবে নানা স্মৃতিতে, ভালোবাসায়। ছোট চাচি শাহিনা শক্ত হয়ে তাঁকে আকড়ে ধরে রাখবেন। এলাকার মানুষ হয়তো মনে রাখবেন একজন তরুণ সংগঠক, একজন স্বাস্থ্যসেবক, একজন সচেতন মানুষ, একজন স্কাউট, একজন সংস্কৃতিকর্মী কিংবা একজন ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে।

কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন, ‘যখন তুমি এসেছিলে ভবে/ কেঁদেছিলে তুমি/ হেসেছিলো সবে/ এমন জীবন তুমি করিও গঠন/ মরণে হাসিবে তুমি/ কাঁদিবে ভুবন...।’ সত্যি চাচা এমন জীবনই পার করেছেন। মরণের সময় তিনি হেসেছেন। কাঁদিয়েছেন আমাদের।

  • আবু সাঈদ: প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি, মুক্ত আসর, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ইতিহাস অলিম্পিয়াড জাতীয় কমিটি

মন্তব্য পড়ুন 0