default-image

করোনা মহামারি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ায় তৈরি পোশাক খাতে একধরনের বিপর্যয় দেখা দেয়। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৩ শতাংশ আসে পোশাকশিল্প থেকে। তাই দেশের পোশাকশিল্প অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পোশাকশিল্পে বিপর্যয়ের ফলে অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব বিদ্যমান থাকে।

পোশাক রপ্তানিতে শীর্ষে অবস্থানকারী দেশ চীন। ধারণা করা হয়েছিল, করোনাভাইরাসের উৎপত্তির কারণে চীনের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিদ্যমান থাকবে। চীনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব বিদ্যমান থাকলে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও রপ্তানির ক্ষেত্রে সুবিধা ভোগ করতে পারবে। কিন্তু বাণিজ্যযুদ্ধের সম্ভাব্য পরিণতি মোকাবিলায় চীনা উদ্যোক্তাদের কারখানা ভিয়েতনামে স্থানান্তর করা হয়। ফলে ভিয়েতনামে পোশাকশিল্পের বাণিজ্য সম্প্রসারিত হতে থাকে। বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের কাঁচামাল বেশির ভাগই চীন থেকে সরবরাহ করতে হয়। কিন্তু করোনার কারণে কাঁচামাল সরবরাহে জটিলতা দেখা দেয়। তাই করোনাকালে সরবরাহ চেইনের বৈচিত্র্যকরণে এবং অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপে সমস্যা দেখা দেয়। ফলে পোশাকশিল্পে নেতিবাচক প্রভাব বিদ্যমান থাকে। যদিও ২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ এগিয়ে ছিল। কিন্তু ২০২০ সালের সূচনালগ্ন থেকেই উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০১৯ সালে গ্লোবাল ক্লোথিং এক্সপোর্টে বাংলাদেশের বাজার অংশীদারত্বে ছিল ৬ দশমিক ৮ শতাংশ, যা ২০১৮ সালে ছিল ৬ দশমিক ২ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব বাড়ে দশমিক ২ শতাংশ। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো ইপিবির মতে, ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বরে পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ১ হাজার ৬০২ কোটি ৪০ লাখ ডলার। কিন্তু ২০২০ সালের একই সময়ে রপ্তানি নেমে আসে ১ হাজার ৫৫৪ কোটি ৬৫ লাখ ডলারে, যা বিগত বছরের তুলনায় ২ দশমিক ৯৯ শতাংশ কম।

বিজ্ঞাপন

মহামারি প্রকোপের দরুন মার্কিন ও ইউরোপের বাজারে পোশাকের চাহিদা কমে আসায় আমাদের দেশ থেকে রপ্তানির ক্রয়াদেশ অনেক ক্ষেত্রে বাতিল হয়ে যায়। তার ওপর আমাদের দেশে দুই মাস লকডাউন থাকায় বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। পর্যাপ্ত পরিমাণ কাজ না থাকায় কারখানা থেকে অনেক শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১৯ সালে বিশ্বে পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল দ্বিতীয়, ভিয়েতনাম ছিল তৃতীয়। তবে বিজিএমইএর হিসাব অনুযায়ী ইতিমধ্যে বাংলাদেশকে পেছনে ফেলে বর্তমানে দ্বিতীয় স্থানে অবস্থান করছে ভিয়েতনাম। বিজিএমইএর অন্য এক তথ্য অনুযায়ী ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত ভিয়েতনামের পোশাক খাতে রপ্তানি আয় আসে ১ হাজার ৫০ কোটি ৯১ ডলার, যেখানে বাংলাদেশ রপ্তানি করে ৯৬৮ কোটি ৪৯ লাখ ১০ হাজার ডলারের পণ্য। ২০২০ সালের প্রারম্ভিক সময় থেকেই পোশাক খাতে মন্দাভাব দেখা দেয়। কয়েক মাসের ব্যবধানে আস্তে আস্তে মন্দাভাব কমতে থাকে। মহামারি প্রাদুর্ভাবের দরুন বিশ্বের অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ায় গত এপ্রিল মাসে বাংলাদেশে রপ্তানি আয় তলানিতে ঠেকে। লকডাউন শিথিল করায় মে মাস থেকে রপ্তানি ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রথম তিন মাসে সেই ইতিবাচক ধারা অব্যাহত ছিল। অক্টোবরে প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশ কমলেও নভেম্বরে দশমিক ৭৬ শতাংশ বেড়ে যায়। (সূত্র: দৈনিক জনকণ্ঠ; ৬ জানুয়ারি, ২০২১)
তবে মন্দাভাব কাটিয়ে ওঠা শুরু করলে আবারও পোশাকশিল্পে শঙ্কা দেখা দেয়। তৈরি পোশাকশিল্পের একটা বড় অংশ ইউরোপের বাজার দখল করে আছে। ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পোশাক রপ্তানি করে আসছে জার্মানিতে, তারপর যুক্তরাজ্যে। মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় ৫৪ শতাংশ ইউরোপের বিভিন্ন দেশগুলোতে হয়ে থাকে, বাকি ৪৬ শতাংশ অন্যান্য দেশে। তাই ইউরোপের দেশগুলোর ব্যবসায়িক পরিস্থিতির ওপর পোশাক রপ্তানির আয় অনেকাংশ নির্ভর করছে। গত নভেম্বরে শুরু হয়েছে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ। কিন্তু ইউরোপের দেশগুলোতে করোনায় আঘাত হানায় আবারও পোশাক বাজারে স্থবিরতা দেখা দেয়। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যে নভেম্বর মাসে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হওয়ায় সীমিত আকারে আবারও লকডাউন ঘোষণা করা হয়। সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। করোনার প্রথম ধাক্কায় পোশাক খাত ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিছুদিনে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করলেও করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে রপ্তানির ক্ষেত্রে বিপর্যয়ের শঙ্কা আবারও দেখা দেয়। অথচ পোশাক রপ্তানির চাহিদা অন্যান্য সময়ের চেয়ে শীত মৌসুমেই বেশি হয়।

আবার বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত অন্য এক রিপোর্টে দেখা যায়, তৈরি পোশাক রপ্তানি কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে লিড টাইম (পণ্য সরবরাহের সময়সূচি) বেশি হওয়া।

পোশাক রপ্তানিতে ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে লিড টাইম কম হওয়া, ভালো বন্দরসুবিধা, অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ সর্বোপরি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার মতো ক্ষমতা। অন্যদিকে মেনমেইড ফাইবারের চাহিদা বাড়লেও বাংলাদেশে কটন ফাইবারের উৎপাদন বেশি হচ্ছে। তা ছাড়া প্রযুক্তিগত এবং অবকাঠামোগত কারণেও অন্যান্য দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো, বিশেষ করে ভারত, পাকিস্তান, তুরস্কসহ নিজস্ব মুদ্রার সঙ্গে ডলারের ডিভ্যালুয়েশন করছে। কিন্তু আমাদের দেশে সেটা সম্ভব হচ্ছে না। স্বভাবতই সেখানে টিকে থাকা কষ্টকর হচ্ছে। তা ছাড়া পোশাকক্ষেত্রে একধরনের মন্দাভাব সারা বিশ্বে বিরাজ করায় পোশাকের দরও কমতির দিকে। আবার মহামারির প্রকোপজনিত কারণে মানুষের পোশাক কেনার চাহিদাও অনেক কমে আসছে। তবে দিন দিন পোশাক বাজারে চাহিদায় বৈচিত্র্য দেখা দেওয়ায় একধরনের পরিবর্তন এসেছে। বিদেশের ক্রেতারা ক্রয়াদেশের ক্ষেত্রেও বৈচিত্র্য নিয়ে আসছে।

আশার কথা হলো, মহামারির কারণে ওভেন পোশাক রপ্তানি কমলেও নিটওয়্যার রপ্তানি বেড়েছে। বাংলাদেশকে প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে টিকে থাকতে হলে উৎপাদিত পণ্যের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। পাশাপাশি প্রযুক্তিগত উন্নয়ন জোরদার করতে হবে। মহামারি প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় পোশাক খাতকে বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচাতে সরকার বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। তার মধ্যে প্রণোদনা প্যাকেজ উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি অন্যান্য সহযোগিতাও সরকার থেকে দেওয়া হচ্ছে। তবে বাংলাদেশে গভীর সমুদ্রবন্দর প্রতিষ্ঠিত হলে অনেকটা বাধা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।

মহামারির মন্দাভাব কাটিয়ে উঠতে পারলে আবারও তৈরি পোশাকশিল্পে সুদিন ফিরে আসবে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

*অনজন কুমার রায়, ব্যাংক কর্মকর্তা

বিজ্ঞাপন
নাগরিক সংবাদ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন