বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বঙ্গবন্ধুর আর ক্ষমতায় যাওয়া হলো না। দেশটি আগের মতোই থেকে গেল স্বৈরাচারী ও অগণতান্ত্রিক। এই রকম একটি রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা বঙ্গবন্ধু। পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে ছিল ৩০০ আসন। সেখানে ৮৮টি আসন পেয়েছিল জুলফিকার আলী ভুট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টি। এটা পেয়েই তাঁরা দ্বিতীয় হন।

গভীর থেকে গভীরতর হতে থাকে ষড়যন্ত্র। বঙ্গবন্ধু নীতিতে অবিচল থাকেন। এভাবেই এল ১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি। তিনি আওয়ামী লীগের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ডাকলেন। সেখানে এক সভায় ৬ দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র রচনা ও জনগণের রায়ের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার শপথ পাঠ করানো হলো।

ষড়যন্ত্র চলতেই থাকে। এরই মধ্য ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ডাকেন। ১৫ ফেব্রুয়ারি ভুট্টো অধিবেশন বয়কটের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন যে ৬ দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র হলে পাকিস্তান ভেঙে যাবে। তা ছাড়া ঢাকায় এলে তাঁর দলের সদস্যদের মেরে ফেলা হতে পারে। আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে সেটা হবে ‘ডিকটেটরশিপ অব দ্য মেজরিটি’ সংখ্যাগরিষ্ঠের একনায়কত্ব। এসব উদ্ভট দায়িত্বজ্ঞানহীন কথা বলতে থাকেন। এদিকে ২২ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া হঠাৎ মন্ত্রিপরিষদ বাতিল করেন।

২৮ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু বলেন, গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলই সরকার গঠন করে। ভুট্টো সাহেবের ইচ্ছা পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠিত হোক, ‘ডিকটেটরশিপ অব দ্য মাইনরিটি’। বাংলার মানুষ এটা মেনে নেবে না।

বঙ্গবন্ধু আরও বলেন, আমরা ৬ দফা কারও ওপরে চাপিয়ে দেব না। একজন সদস্যও যদি যুক্তিযুক্ত কোনো দাবি করেন, তা গ্রহণ করা হবে। দেশের সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি মাওলানা ভাসানী, নুরুল আমিন, আতাউর রহমান খান, মোজাফ্ফর আহমদসহ অন্যান্য দলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেন।

নতুন করে শুরু হলো ষড়যন্ত্র। অবাঙালি নাগরিকদের নিরাপত্তা সম্পর্কে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘তাঁরা এই মাটিরই সন্তান। এ দেশ তাঁদেরও দেশ। তাঁরা জনগণের সঙ্গেই থাকবেন। জনগণই তাঁদের নিরাপত্তা দেবে।’

পাকিস্তানের মৃত্যুঘণ্টা

৩ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন। এ জন্য প্রস্তুতি দরকার। তাই ১ মার্চ পূর্বাণী হোটেলে আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের বৈঠক হচ্ছিল। সেই সময়ই রেডিওতে একটি ঘোষণা হলো প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করেছেন। শাসকশ্রেণির স্বৈরতান্ত্রিক আচরণে বাংলাদেশের মানুষ আগেই বিক্ষুব্ধ ছিল। ইয়াহিয়ার এই বেতার ভাষণে দলমত-নির্বিশেষে সবাই রাজপথে নেমে আসে। সবার কণ্ঠে স্লোগান:
‘তোমার আমার ঠিকানা-পদ্মা মেঘনা যমুনা’
‘পিণ্ডি না ঢাকা-ঢাকা ঢাকা’।
বঙ্গবন্ধু পূর্বাণী হোটেলের বৈঠক স্থগিত করেন। ছয় দিনের কর্মসূচি দেন। ২ মার্চ ঢাকায় পূর্ণ হরতাল। ৩ মার্চ সারা দেশে হরতাল। ৭ মার্চ রেসকোর্স (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ময়দানে জনসভায় ভাষণ।

পূর্বাণীর চত্বর লোকে লোকারণ্য। সাধারণ মানুষ ভীষণ ক্ষুব্ধ। তারা পাকিস্তান লেখা সাইনবোর্ড ফেলে দিচ্ছে। পাশেই ‘পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনস’ সাইনবোর্ডটির ওপরে লেখা ‘বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনস’। মিছিল করতে করতে জনতা এল গুলিস্তান চত্বরে, সেখানে ‘জিন্নাহ অ্যাভিনিউ’ হয়ে গেল ‘বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ’। ইয়াহিয়া সেদিন বুঝতে পারেননি তাঁর এ একটি ঘোষণায় চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে পূর্ব পাকিস্তান অধ্যায়। মূলত এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের কবর রচিত হয়। বঙ্গবন্ধু বলেন, ২৩ বছর যাবৎ একই ষড়যন্ত্র করছেন, আর ষড়যন্ত্র করবেন না।

পূর্ব বাংলায় আগুন জ্বলে ওঠে। সারা দেশে এক অভূতপূর্ব গণজাগরণের সৃষ্টি হয়। বাণিজ্য, যোগযোগ, ব্যাংক, প্রশাসন, শিক্ষাসহ সব প্রশাসনিক ব্যবস্থা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে চলতে থাকে। প্রচণ্ড চাপে ইয়াহিয়া ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের সভা আহ্বান করেন। আবার আলোচনার প্রস্তাব দেন। এমন একটি প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে ভাষণের কথা বলেন। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু কী ঘোষণা দেন, তার জন্য সবাই রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছে। মানুষ এতটাই ক্ষুব্ধ যে স্বাধীনতার চেয়ে কম কিছু তারা আশা করছিল না। একজন সাংবাদিকের একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণার প্রশ্নের জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘অপেক্ষা করুন। জনগণ আমার সঙ্গে আছে। ভালোর আশা করছি, তবে মন্দের জন্যও প্রস্তুত আছি। কাল থেকেই কর্মসূচি চলবে।’

বঙ্গবন্ধু সারা জীবন আদর্শের রাজনীতি করেছেন। নীতির সঙ্গে কোনো দিন আপস করেননি। তাঁর মধ্যে সব সময় গণতান্ত্রিক চেতনা ছিল। সে সময় নাইজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ নানা দেশে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন চলছিল।। কেন এসব আন্দোলন সফল হচ্ছে না, তাদের দুর্বলতা থেকে বঙ্গবন্ধু শিখেছিলেন সত্য ও ন্যায়ের পথে কীভাবে আন্দোলন করতে হয়। তিনি মনে করতেন আদর্শহীন নেতা বিশ্বের সমর্থন পায় না। ওই সময়ে আন্তর্জাতিক সংবাদে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্য তাঁর প্রতি বিশ্বের ব্যাপক সমর্থন রয়েছে। অন্যদিকে ইয়াহিয়া খানকে জানিয়েছে ধিক্কার।

default-image

এমনই একটি কঠিন বাস্তবতাকে সমানে রেখে এই জনপদের ইতিহাসের সবচেয়ে বিশাল জনসভায় বঙ্গবন্ধুকে ৭ মার্চের ভাষণ দিতে হয়েছিল। ইয়াহিয়া অধিবেশন স্থগিত করলেন। দেশব্যাপী অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলেন বঙ্গবন্ধু। তখন থেকেই বাঙালি উন্মুখ হয়ে ওঠে স্বাধীনতার জন্য। তাদের জন্য দরকার ছিল একটি ঘোষণার। একটি আহ্বানের। অবশেষে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চে এল সেই ঘোষণা। বাঙালি জাতি পায় স্বাধীনতার দিকনির্দেশনা। মুক্তিকামী জাতি প্রস্তুত হয় চূড়ান্ত লড়াইয়ের জন্য। ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তা বাঙালিকে নিয়ে যায় কাঙ্ক্ষিত মুক্তির লক্ষ্যে। ভোর থেকেই মানুষ জনসমুদ্রের মতো ছুটে আসছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। সবার চোখেমুখে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা। বাঙালি জাতির ইতিহাসে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ একটি স্মরণীয় দিন। ৭ মার্চের ভাষণে ছিল বাঙালির মুক্তির ডাক।

ওই ভাষণের নির্দেশনার পথ ধরেই ৯ মাসের রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধে লাখো প্রাণের বিনিময়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ আত্মপ্রকাশ করে। শহীদের আত্মদান। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগ, সাহসিকতা আর লাখো মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে বাঙালি অর্জন করে একটি মানচিত্র। একটি লাল-সবুজে আঁকা পতাকা। চলবে..

পাকিস্তান ভাঙার দায়

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ছিল একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এই ভাষণ বিশ্বের মানচিত্রে একটি নতুন দেশ সৃষ্টি করে।
বঙ্গবন্ধুর ইস্পাতকঠিন মানসিকতার পরিচয় তিনি ৭ মার্চের ভাষণে রেখেছিলেন।
তাঁর আদর্শিক রাজনীতির কাছে পরাজিত হয়েছে পাকিস্তানি শাসক। তাঁর ৭ মার্চের ১৮ মিনিটের ভাষণটি হলো একটি রাজনৈতিক কবিতা। তিনি ছিলেন অত্যন্ত দূরদর্শী।

প্রত্যক্ষ স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। কারণ, তিনি জানেন, বিশ্বের কেউ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমর্থন দেবে না। তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতার জন্যই শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান ভাঙার দায় পড়েছে পাকিস্তানি সেনা শাসকদের ওপর। বঙ্গবন্ধুর ভাষণের সঙ্গে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ভাষণের মিল রয়েছে। নেতাজি বলেছিলেন, ‘তোমরা আমাকে রক্ত দাও। আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব।’ আর বঙ্গবন্ধু বলেছেন, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব। তবু এই দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশা আল্লাহ।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণটি খুব যেমন ছোট না তেমনি খুব দীর্ঘও না। বক্তৃতা নয়, তিনি যেন জনসমুদ্রের সঙ্গে কথা বলছেন। তিনি বলছেন, ‘রক্তের দাগ শুকায় নাই। রক্তে পাড়া দিয়ে, শহীদের ওপর পাড়া দিয়ে, অ্যাসেম্বলি খোলা চলবে না। ...আমরা যখন মরতে শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দাবায় রাখতে পারবা না।’ তাঁর জনসভায় আসা মানুষের কথা বলার ভাষা তিনি জানতেন।

অন্যদিকে তিনি তাঁর শত্রুকে সম্মান দিয়ে কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, জনাব ইয়াহিয়া খান সাহেব, জনাব ভুট্টো সাহেব।

সবকিছুর দায়ভার তিনি তাঁদের ওপর দিয়ে দিলেন। বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার মানুষকে হত্যা করা হয়, তোমাদের ওপর আমার অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে।’ একটিবারও তিনি আক্রমণ করার কথা বলেননি। সহিংসতার কথা বলেননি। তিনি বললেন, ‘তোমরা আমার ভাই, তোমরা ব্যারাকে থাকো, কেউ তোমাদের কিছু বলবে না।’

বঙ্গবন্ধুর এমন আচরণ ও গণতান্ত্রিক শ্রদ্ধাবোধের জন্য পৃথিবীর মানুষ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন দেয়। সেই ভাষণে বঙ্গবন্ধু ২৩ বছরের রাজনীতির পরিপ্রেক্ষিত তুলে ধরেছেন। সেদিন অনেকেই বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধু সরাসরি কেন স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন না? বঙ্গবন্ধু যদি সেটা করতেন তাহলে আজ হয়তো বাংলাদেশের ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হতো। পাকিস্তান তাঁকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরত বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হিসেবে। অথচ ৭ মার্চের পরও তিনি ইয়াহিয়া ও ভুট্টোর সঙ্গে আলোচনায় বসেছেন।

নাগরিক সংবাদ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন