বিজ্ঞাপন

গত বছরের শেষের দিক থেকে নতুন বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও গত বছরের প্রথম ঢেউয়ের কয়েক মাস সব বন্ধ থাকায় অনেক মানুষ কর্ম হারিয়েছেন। অনেকের আয় কমেছে। অনেকে নিঃস্ব হয়েছেন। এটাই দারিদ্র্য বৃদ্ধির আসল কারণ। দারিদ্র্য বৃদ্ধির প্রধান কারণগুলো, যেমন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অর্থনৈতিক মন্দা, সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যা ইত্যাদি বিবেচনা করা হয়। করোনা মহামারি প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং কয়েক মাস লকডাউনের ফলে কিছুটা অর্থনৈতিক মন্দারও সৃষ্টি হয়েছে। এই দুই দিক বিবেচনায় দেশে দারিদ্র্য অনেক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। করোনায় আপেক্ষিক দারিদ্র্যও অনেক বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

আপেক্ষিক দারিদ্র্য বলতে বোঝায়: স্থান–কালের পরিপ্রেক্ষিতে একজন অপেক্ষা আরেকজনের আয় অনেক বৃদ্ধি পাওয়া বা একজন সাপেক্ষে আরেকজন ন্যূনতম জীবনযাত্রার মান অর্জনে ব্যর্থ হওয়া। আপেক্ষিক দারিদ্র্য বৃদ্ধি পেয়েছে। কারণ, সরকারি চাকরিজীবীদের আয়ের কোনো ঘাটতি হয়নি, তারা আগের মতোই আয় করতে পেরেছেন, কিন্তু বেসরকারি বা আত্মকেন্দ্রিক সংগঠন থেকে যাঁরা আয় করতেন, তাঁদের আয় অনেক কমে গিয়েছে। এটা আপেক্ষিক দারিদ্র্য বৃদ্ধি করেছে৷ আগে থেকে দরিদ্র থাকা মানুষের সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বছরের শেষের দিকে করোনা কিছুটা কমায় সবাই নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তোলার নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করে। কিন্তু তাতেও বাধা হলো করোনার দ্বিতীয় ঢেউ। এই ঢেউ প্রথম ঢেউয়ের চেয়ে অনেক বেশি ভয়ংকর। গত বছরের প্রথম ঢেউয়ের চেয়ে দ্বিগুণ মানুষ মারা যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ৫ এপ্রিল থেকে সাত দিনের লকডাউন ঘোষণা করে সরকার।

লকডাউন ঢিলেঢালাভাবেও বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছিল না। তাই সরকার কঠোর অবস্থানে যেতে বাধ্য হয়েই ১৪ এপ্রিল পয়লা বৈশাখ থেকে কঠোর লকডাউন ঘোষণা করেছে। এতে সরকারি–বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠান, ব্যাংকসহ জরুরি সেবার আওতাভুক্ত প্রতিষ্ঠান বাদে সব বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে। এতে আবারও নতুন করে কর্মহীন হয়ে পড়ছেন অনেক মানুষ। বিশেষ করে একমালিকানা ব্যবসায়ী, রিকশাচালক, এমন আরও অনেক আত্মকেন্দ্রিক সংগঠনের মানুষ, যাঁরা গত লকডাউনেও কর্মহীন হয়েছিলেন।

পরিবহনশ্রমিকেরা ৫ তারিখ থেকেই কর্মহীন। প্রথম ধাক্কা কিছুটা সামলে ওঠার আগেই এসব দরিদ্র মানুষ আবার অনেক বড় ধাক্কা খাবেন, তা অনুমেয়। এই লকডাউন দারিদ্র্য অনেক হারে বৃদ্ধি করবে, এটা অনিবার্য।

দারিদ্র্য দূরীকরণে সরকারের আগে থেকে কিছু ভূমিকা প্রশংসার দাবিদার। যেমন গৃহহীনদের জন্য ঘর, একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প, কাজের বিনিময়ে খাদ্য, শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য আরও কিছু প্রকল্প। এর সঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও দারিদ্র্য দূরীকরণে যথেষ্ট ভূমিকা রাখছে। করোনায় হঠাৎ বৃদ্ধি পাওয়া এই দারিদ্র মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করতে না পারলে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় ২০৩০ সালের মধ্যে চরম দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব কি না, এই সন্দেহ থেকেই যায়।

এখন সরকারের উচিত হবে গত বছরের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে এ বছর ত্রাণ বিতরণে স্বচ্ছতা আনা। একান্ত কর্মহীনদের সুনির্দিষ্ট একটা তালিকা করে তাঁদের সহযোগিতা করা। দীর্ঘমেয়াদিভাবে এই সমস্যার সমাধানে কিছু সমস্যার সমাধান করা অনিবার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেমন দুর্নীতি, কর ফাঁকি, ঋণ, ঋণের শর্ত, বাস্তবমুখী শিক্ষার অভাব ইত্যাদি। এসব কারণ শুরু থেকে দারিদ্র্য কমাতে বাধার সৃষ্টি করছে। তবু আমরা আশাবাদী সরকার এসব কারণ বিবেচনায় নিয়ে বর্তমানে স্বল্পমেয়াদি এবং পরবর্তী সময়ে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করবে। সঙ্গে সঙ্গে প্রথমবারের চেয়ে দ্বিতীয়বার স্বচ্ছভাবেই এসব কর্মহীন মানুষের সহযোগিতায় সরকার ও বেসরকারি সংস্থা, সমাজের বিত্তবানেরা এগিয়ে আসবেন। করোনার বিপক্ষে মানবিকতাকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে একাত্তরের মতো আরেকটি বিজয় আমরা পাব।
লেখক: রেজুয়ান রিজভী, শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

নাগরিক সংবাদ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন