বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

প্রতারকেরা কিন্তু লুকিয়ে কিছুই করেনি। অতীতে বড় বড় আর্থিক কোনো কেলেঙ্কারিই লুকিয়ে হয়নি। আজকের ইভ্যালি রীতিমতো জাতীয় ক্রিকেট দলের এক্সক্লুসিভ স্পনসর হয়ে মার্কেটিং করে গেছে। তাহলে বলতেই হবে ইভ্যালিকে টাকার বিনিময়ে প্রমোট করছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডসহ বিভিন্ন টিভি চ্যানেল এবং নাটকের প্রযোজকেরা।

১০ টাকায় ২০ টাকা পাব বলে লগ্নি করছি! সোজা কথায় জুয়া খেলছি! ইভ্যালির বিভিন্ন লোভনীয় অফারগুলো ছিল—সাইক্লোন অফার (বাজারমূল্যের অর্ধেক মূল্যে পণ্য বিক্রয়); ক্যাশব্যাক অফার (মূল্যের ৫০-১৫০ ভাগ ক্যাশব্যাক অফার); আর্দ্রকুয়েক অফার, প্রায়োরিটি স্টোর, ক্যাশ অন ডেলিভারি। এ ছাড়া বিভিন্ন উৎসবেও ছিল জমজমাট অফার, যেমন বৈশাখী, ঈদ অফার ইত্যাদি। পরিণতিতে ইভ্যালির সাইক্লোন আফারের গ্রাহকদের কোটি কোটি টাকা বাতাসে উড়ে গেল!

লোভনীয় নানা রকম ডিসকাউন্ট কিংবা ক্যাশব্যাকের অফার দিয়ে দ্রুত ক্রেতা টেনেছে ইভ্যালি। লোভে পড়ে ক্রেতারাও হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন তাঁদের পণ্য কেনার অর্ডার দিতে। আর এ সুযোগটিই নিয়েছেন রাসেল। শুরুতে একটি–দুটি অর্ডার দ্রুত ডেলিভারি দিয়ে ক্রেতার আস্থা অর্জন করেন, কিন্তু পরবর্তী সময় শুরু হয় প্রতারণা। লোভে পড়ে একেকজন গ্রাহক কেউ ২০ হাজার, ৫০ হাজার, ১ লাখ, ৫ লাখ কিংবা ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করেছেন। অন্যদিকে যেসব প্রতিষ্ঠান থেকে পণ্য নেওয়া হতো ক্রেতা দেওয়ার জন্য সেসব মার্চেন্ট প্রতিষ্ঠানেরও টাকা শোধ করেননি রাসেল। এভাবে একরকম ‘মাছের তেলে মাছ ভেজে’ শত শত কোটি টাকা লুটেছে ইভ্যালি।

কোনো কোম্পানি বা উদ্যোক্তা প্রচারের উদ্দেশ্যে নিজের উৎপাদিত পণ্য ৪০ থেকে ৫০ পার্সেন্ট অথবা যত খুশি ডিসকাউন্ট দিতে পারে। কিন্তু কোনো পণ্য উৎপাদিত না করেও কি করে সম্ভব ১০০ থেকে ১৫০ ভাগ ক্যাশব্যাক অফার! আসলেই কি দ্বিগুণ লাভ দেওয়া সম্ভব? এক্ষেত্রে গ্রাহককেও ভাবতে হবে, এখানে নিশ্চয় কোনো ঝামেলা আছে। মানুষের মধ্যে আবেগ থাকাটা স্বাভাবিক, কিন্তু আবেগটার সঙ্গে বাস্তবিক চিন্তাও করতে হবে। ইভ্যালির ডিসকাউন্ট অফারে নাক-কান বন্ধ করে প্রোডাক্ট কিনতে পেরে খুশিতে আটখানা হয়েছেন অনেকেই। চার লাখ টাকার পণ্য আড়াই বা তিন লাখ টাকায় দেওয়া সম্ভব? এসব অফারের প্রচারেও খরচ হয়েছে কোটি টাকা। এরপরও চার লাখ টাকার প্রোডাক্ট দুই লাখ টাকায় কিভাবে দেওয়া সম্ভব? কোনো যুক্তি দেখিয়ে বোঝানো যাবে কি? একমাত্র উপায়, হাওয়া হয়ে যাওয়া। আর হয়েছেও তাই!

কিছু মানুষের বাসনা হলো বিনা পরিশ্রমে বড়লোক হওয়া। ১০০ টাকায় ২০০ টাকা মানে ডাবল লাভের আশায় চোখ বন্ধ করে বিনিয়োগ, একবারও চিন্তা করল না, যে টাকা নিচ্ছে সে কীভাবে কোনো ব্যবসা করে ডাবল দিচ্ছে বা কম দামে পণ্য দিচ্ছে? আসলে কিছু ক্রেতা সেটা বুঝেও না বোঝার ভান করে। কারণ, অনেকেরই চরম পাওয়ার ও খাবার লোভ! ইভ্যালিতে অনেকেই ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা ইনভেস্ট করেছেন। অনেকে হয়তো এর থেকেও বেশি করেছেন। অথচ ২৫–৩০ লাখ টাকার পুঁজি নিয়ে দেশে সম্মানজনক খুব ভালো ব্যবসা করে অন্তত ডাল, ভাত খাওয়া যায়। অথচ বেশি লোভ করে বিনা শ্রমে বসে বসে খেতে চেয়ে সর্বস্বান্ত আজ লাখ লাখ গ্রাহক।

বাংলাদেশে ই-কমার্সের কার্যক্রম যেভাবে ধোঁকা ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে গেছে, তাতে শিগগির বিদেশি প্রতিষ্ঠান এই সুযোগ নিয়ে নেবে। মূল্য ছাড়ের লোভনীয় অফারে হুমড়ি খেয়ে পড়ে কিছু মানুষ! ১০০ টাকার পণ্য ৯০ টাকায় কেনা যায়, কিন্তু ৬০ টাকায় কেনা যাবে না। সর্বসাধারণের বুঝতে হবে এখানে নিশ্চয় কোনো ফাঁকফোকর ও ঝামেলা আছে। যেখানে কম পরিশ্রমে লাভ বেশি, সেখানেই ভেজাল বেশি! এটা সাধারণ জ্ঞানের বিষয়। অতীতে ইসলামিক ট্রেড এ-কমার্স লিমিটেড (আইটিসিএল), যুবক ও ডেসটিনিসহ বিভিন্ন এমএলএ প্রতিষ্ঠান সেবা ও ব্যবসার নামে গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা করে এসেছে। কিন্তু অতীত ঘটনা থেকে আমরা কোনোভাবেই শিক্ষা গ্রহণ করিনি, বরং অস্বাভাবিক, চমকপ্রদ ও লোভনীয় অফারে বারবারই প্রলুব্ধ হয়েছি।

ইভ্যালি ও ই-অরেঞ্জ কিছু পাবলিককে লোভ দেখিয়ে লসে ডিসকাউন্ট দিয়ে পণ্য সময়মতো পৌঁছানোর কথা বলে লাখো গ্রাহক থেকে টাকা ক্যাশ করে ফেলত। ওখান থেকে লসে দুই–তিন ভাগ গ্রাহককে বিশাল ছাড়ে পণ্য দিত। বাকিরা অর্ডারের প্রোডাক্টের আশায় মাসের পর মাস দিন গুনত! এটা কোনো অবস্থায় ই-কমার্সের ব্যবসা হতে পারে কি? ক্রয়-বিক্রয় বলতে আমরা জানি, আগে পণ্য তারপর টাকা। আর বিশ্বব্যাপী ই-কমার্সের টার্মস অব কন্ডিশন রয়েছে পণ্য প্রাপকের কাছে পৌঁছার পর পেমেন্ট। অথচ বাংলাদেশের অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন!

ই-কমার্সগুলো এ দেশে লুকিয়ে লুকিয়ে বিজনেস করেনি। তারা ঢাকঢোল পিটিয়ে সব মিডিয়ায় বিজ্ঞাপন দিয়ে নিজেদের প্রচার করেছে। ক্রিকেট দলের স্পনসর হয়েছে। ঢাকার প্রতিটি পুলিশ বুথ ইভ্যালির বিজ্ঞাপনে ঢেকে গিয়েছিল। দোষ কি শুধু সাধারণ মানুষের? সাধারণ গ্রাহক সরকারের নিবন্ধিত ই-কমার্স থেকে পণ্য ক্রয় করেছে। এ ক্ষেত্রে সাধারণ ক্রেতা ভুক্তভোগী হলে সরকারও এই দায় এড়াতে পারে না। এদের মনিটরিং করার দায়িত্ব কিন্তু সরকারের। গত বছর ইভ্যালির ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এক মাসের জন্য জব্দ করে দেওয়া হলো। সরকার পরীক্ষা–নিরীক্ষা করে এক মাস পর আবার অ্যাকাউন্ট ওপেন করে দিল। এতে প্রমাণিত হয়, ইভ্যালির মধ্যে কোনো সমস্যা নেই। এর মাধ্যমে আলটিমেটলি সরকার ইভ্যালিকে গ্রিন সার্টিফিকেট দিয়ে দিল।

‘ডাবল ভাউচার’ অফার দিয়ে গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা নেয় ই-অরেঞ্জ। অফারের ভাষ্য ছিল, কেউ এক লাখ টাকা জমা দিলে দুই লাখ টাকার ভাউচার পাবেন। ওই ভাউচার দিয়ে আমানতকারী প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে পণ্য কিনতে পারবেন। কিন্তু দ্বিগুণ অর্থের পণ্য কেনা তো দূরের কথা বরং মূল অর্থেই গ্রাহকেরা পণ্য বুঝে পাচ্ছেন না। বর্তমানে পৃথিবীটিতে অনলাইন শপিং একটি দারুণ কম্পিটিশন মার্কেট। কোনো কোম্পানি কত দ্রুত প্রোডাক্ট ডেলিভারি ও সেবা দেবে, এ প্রতিযোগিতা। বিশ্বে অনলাইন ব্যবসায়ীরা সততা, আস্থা, স্বচ্ছতা ও দ্রুত হস্তান্তরের কম্পিটিশন করে। আর আমরা আছি চুরি আর ফাঁদের কম্পিটিশন নিয়ে! আমরা বলতে চাই, ই-অরেঞ্জ ও ইভ্যালিকে কোনো মান ও দিক দিয়ে ই-কমার্স বলে মনে করা যায় কি? বিশ্বে এমন কোনো ই-কমার্স কোম্পানি আছে যারা দুই মাস, চয় মাসে পণ্য ডেলিভারি দেয়? আবার কোনো কেনো ক্ষেত্রে বছর ফুরিয়ে গেলেও পণ্য ডেলিভারি দিতে অপারগ। তা ছাড়া এমন কোথাও আছে কি, যারা নতুনদের টাকায় পুরোনোদের পণ্য দেয়? আমরা আশা করছি, গ্রাহকদের স্বার্থে দেশের সর্বোচ্চ আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে ডেসটিনি, যুবক, নিউওয়ে, এহসান গ্রুপ, ইউনিপেটু, ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জসহ ধান্ধা ও ধোঁকাবাজ প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপারে ব্যবস্থা নেবে। এই মুহূর্তে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে সর্বোচ্চ খোয়ানো সাধারণ গ্রাহকদের বাঁচানোর একমাত্র অক্সিজেন হলো আদালত। গ্রেপ্তার কোনো সমাধান নয়, গ্রাহক কীভাবে তাঁর লগ্নি করা টাকা ফেরত পাবে সরকার ও আদালতকে সেই ব্যবস্থা নিতে হবে।

নাগরিক সংবাদ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন