default-image

কথায় আছে, সাবধানের মাইর নাই। তেমনি যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত কিন্তু সম্ভাব্য বিপদ এড়াতে সচেতনতারও কোনো বিকল্প নেই। আর যখন বিষয়টি করোনা ভাইরাসসংক্রান্ত, তখন একে এড়িয়ে যাওয়ার কিংবা অবহেলা করার বিন্দুমাত্র কোনো সুযোগ নেই। কারণ, বিগত এক বছরে করোনাভাইরাস আমাদের জীবনের যেমন ছন্দপতন ঘটিয়েছে, তেমনি জীবন থেকে কেড়ে নিয়েছে অনেক কিছু। কেউ হারিয়েছেন জীবন আর কেউ হারিয়েছেন জীবিকা। আবার অনেকেরই আয় কমে যাওয়ায় পেশার পরিবর্তনসহ জীবনযাত্রায় অনেক কিছুকেই উৎসর্গ করতে হয়েছে। কেউবা করোনায় আক্রান্ত হয়ে জীবন–মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থেকে সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমতে বেঁচে এসেছেন, কিন্তু এই জন্য তাঁকে গুনতে হয়েছে অনেক অর্থ, যা অনেকের জন্যই ছিল সাধ্যের বাইরে। যারা ছাত্রছাত্রী, তাদের কথা তো বলা বাহুল্য। দীর্ঘ এক বছর শিক্ষাঙ্গনহীন শিক্ষা কিংবা দূরশিক্ষণ পদ্ধতিই হয়ে পড়েছে শিক্ষার অন্যতম মাধ্যম। বিষয়টা অনেকটাই যেন, নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো। আবার অনেক শিক্ষার্থী তো সেই সুযোগ থেকেও হয়েছে বঞ্চিত। অধিকাংশ অভিভাবকই শিক্ষার্থীদের মোবাইল আসক্তি নিয়ে শঙ্কিত, যা করোনারই অবদান।

করোনার রাহুগ্রাস থেকে বাঁচতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও সরকারের নির্দেশনা মোতাবেক সচেতনতার অংশ হিসেবে মাস্ক ব্যবহার, ঘন ঘন হাত ধোয়া বা জীবাণুনাশক ব্যবহার করা, মানুষে মানুষে দূরত্ব বজায় রাখা, বিদেশফেরত ব্যক্তিদের বাধ্যতামূলক প্রাতিষ্ঠানিক কিংবা হোম কোয়ারেন্টিনে থাকা, গণজমায়েত এড়িয়ে চলা, অযথা ঘোরাঘুরি বন্ধ রেখে করোনা অনেকটা নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই চলে এসেছিল। এর মধ্যে টিকার আবিষ্কার এবং সরকারের সদিচ্ছায় দ্রুত তা করোনার সম্মুখযোধ্যাসহ সাধারণ জনগণের মধ্যে পর্যায়ক্রমে প্রয়োগের ব্যবস্থা আমাদের জীবন থেকে করোনার ভীতি দূর করে জীবনকে অনেকটা স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। দমবন্ধ হাঁপিয়ে ওঠা জীবন থেকে বাঁচতে অনেকটা মুক্তির আনন্দের মতো মানুষের দলবদ্ধ ঘোরাঘুরি, প্রায় বন্ধ থাকা সামাজিক অনুষ্ঠানে আবার ঘটা করে আয়োজন, বিভিন্ন সামাজিক, ধর্মীয় কিংবা রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে গণজমায়েত ইত্যাদি দেখে আমরা করোনাকে ভুলতেই বসেছিলাম। যে পর্যটন কেন্দ্রগুলো দীর্ঘ এক বছর ছিল পর্যটনহীন মৃতপ্রায়, সেই পর্যটন কেন্দ্রগুলো হয়ে উঠল আশাতীতভাবে কোলাহলে পরিপূর্ণ। যদিও সব জায়গায় লেখা আছে, নো মাস্ক, নো সার্ভিস (মাস্ক ছাড়া সেবা নয়)। কিন্তু বিগত বেশ কিছুদিন যাবৎ সার্বিক পরিস্থিতির উন্নতি দেখে মনে হচ্ছিল, মাস্ক ছাড়াও সেবা হয়।

শুরুতেই বলেছিলাম, সাবধানের মাইর নাই। কিন্তু আমাদের অসাবধানতাই মনে হচ্ছে কাল হয়ে দেখা দিচ্ছে। বিগত কয়েক দিন, বিশেষ করে বিগত সপ্তাহে করোনা পরিস্থিতির ঊর্ধ্বগতি দেখে পুরোনো আশঙ্কা আবার জেগে উঠছে, নিয়ন্ত্রিত করোনা যেন হয়ে উঠছে অনিয়ন্ত্রিত, করোনার মৃত্যুর সংখ্যাটাও আবারও এর ভয়াবহতাকে স্মরণ করে দিচ্ছে। ইতিমধ্যে লকডাউনসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। বিভিন্ন জেলায় স্থানীয় প্রশাসন পুনরায় গণসচেতনতার ওপর জোর প্রদান করছে। বিশেষজ্ঞরা অনেকে একে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ হিসেবে উল্লেখ করছেন। এরই মধ্যে বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের ৪৬০৪ রকম পরিবর্তিত রূপের সন্ধান পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ৩৪টি জাত যা আগের সব করোনার জাত থেকে একেবারেই ভিন্ন, যা বিশ্বের অন্য কোথাও পাওয়া যায়নি। করোনার নতুন নতুন রূপের আবিষ্কার যেমন এর প্রতিকারের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বিষয়টি চিন্তারও বটে। যে করোনাকে আমরা সচেতনতা ও স্বাস্থ্যবিধি মানার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এনেছিলাম, সেই করোনা যদি আমাদের অসচেতনতার কারণে বিধ্বংসী রূপ নেয়, তবে তা হবে অনেকটা নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারার মতো ভুল। করোনা আমাদের দেশে ইউরোপ–আমেরিকার মতো অতি বিধ্বংসী রূপ না নিলেও মাত্র কয়েক মাসে মানুষের মানসিক ও অর্থনৈতিক যে ক্ষত সৃষ্টি করেছে, তা অধিকাংশকে বইতে হচ্ছে এখনো। তাই নতুন করে করোনার ঊর্ধ্বগতি আমাদের অসচেতন মনকে ভাবিয়ে তুলুক, যাতে কোনোভাবেই এর ভয়াবহ রূপের পুনরাবৃত্তি না ঘটে। করোনাকে হয়তো এখনই একেবারে নির্মূল করা সম্ভব নয়, কিন্তু আমাদের নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, করোনাকেও নিয়ন্ত্রিত রাখতে পারে। স্বাস্থ্য বিধিগুলোকে মেনে চললে, নিজে সচেতন হলে এবং অন্যকে সচেতন হতে উৎসাহ প্রদান করলে করোনার ঊর্ধ্বগতিকে স্তিমিত করা সম্ভব, যা ইতিমধ্যে পরীক্ষিত। তাই আসুন, আরও একবার সচেতন হই। অসচেতন হয়ে করোনার বিস্তার না করে, সচেতন স্বাস্থ্যবিধি মানার মাধ্যমে করোনা নির্মূলে নিজেকে সম্পৃক্ত করি।  

*লেখক: জিয়া উদ্দিন মাহমুদ, ব্যাংকার ও লেখক

বিজ্ঞাপন
নাগরিক সংবাদ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন