default-image

অটিজম বর্তমান প্রেক্ষাপটে বহুল পরিচিত একটি শব্দ। শব্দটির পরিচিত বাড়লেও বিকাশ হয়নি অটিজম নিয়ে মানুষের তথাকথিত চিন্তাধারার। আমাদের সমাজে এমন অনেকেই আছে, যারা ভাবে অটিজম বংশগত বা মানসিক রোগ। মূলত, এটি কোনো রোগ নয়। অটিজম একটি স্নায়ুগত সমস্যা। ইংরেজিতে যাকে বলে ‘নিউরোডেভেলপমেন্ট ডিসঅর্ডার’। মস্তিষ্কের বিকাশজনিত এ সমস্যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতির ফলে এখন অনেকটাই নিরাময়যোগ্য।

অটিজম নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য আছে ‘বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস’।আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এই দিবস প্রতিবছর ২ এপ্রিল পালিত হয়। মূলত, এদিন জাতিসংঘের সদস্যদেশগুলো ‘অটিজম স্পেকটার্ম ডিসঅর্ডার’–এ আক্রান্ত শিশুদের সাহায্যে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করে। জাতিসংঘের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত যে সাতটি দিবস আছে, বিশ্ব অটিজম দিবস সেগুলোর মধ্যে অন্যতম। অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের জন্য জাতিসংঘের গৃহীত এই বিশেষ উদ্যোগ তাদের অবস্থার পরিবর্তনে রেখে চলেছে অভাবনীয় ভূমিকা।

আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা অনেক উন্নত। রয়েছে অটিজমের সুচিকিৎসা। তবু এনিয়ে গ্রামাঞ্চলে এখনো অনেক কুসংস্কার প্রচলিত আছে। গ্রামাঞ্চলে অটিজম নিয়ে জন্মগ্রহণ করা এমন অনেক শিশু আছে, যাদের পরিবার তাদের সন্তানদের অটিজম শনাক্ত করতে পারে না। যেহেতু এটি মস্তিষ্কের বিকাশজনিত রোগ, শিশু সমাজের সঙ্গে সামাজিক কোনো সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে না এবং একই কাজ বারবার করতে থাকে। যেহেতু পরিবারগুলো তাদের সন্তানের এমন আচরণে উদাসীন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের আচরণের এই অস্বাভাবিকতা বাড়তে থাকে। ফলাফল সমাজ তাকে পাগল উপাধি দেয়। এমনকি অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের পরিবারগুলোকেও করা হয় হেয়প্রতিপন্ন, যা ওই পরিবারগুলোর দৈনন্দিন জীবনে তৈরি করে বাড়তি বিড়ম্বনা। যেহেতু এটি সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য নয়, তাই একটি শিশুর অটিজম যদি তাড়াতাড়ি শনাক্ত করা যায়, সে ক্ষেত্রে তার নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতাগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব হয়। সাধারণত জন্মের ছয় মাসের মধ্যেই শিশুর মধ্যে অটিজমের লক্ষণগুলো প্রকাশ পেতে থাকে। শিশুর মধ্যে লক্ষণগুলো দেখা মাত্রই মা–বাবার উচিত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া। অনেকেই লোকলজ্জার ভয়ে তার অটিজমে আক্রান্ত সন্তানকে লোকচক্ষুর অন্তরালেই রাখতে চান, যা তাঁর সন্তানের সমস্যার বিস্তার ঘটাতে থাকে। বিপরীতে দ্রুত অটিজম শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিলে তাদের জীবনেও অনেকটা স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

বিজ্ঞাপন
default-image

অটিজমের প্রতিটি শিশুই বিশেষ প্রতিভাসম্পন্ন। তাদের প্রত্যেকের মধ্যেই নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে দক্ষতা থাকে। এমন অনেক শিশু আছে, যারা অটিজমে আক্রান্ত হলেও মাত্রা কম, তাদের অনেকেই স্বাভাবিক শিশুদের মতো লেখাপড়া করতে পারে। আবার অনেকের গাণিতিক দক্ষতা স্বাভাবিক শিশুদের থেকেও বেশি হয়ে থাকে। তাই কোনোভাবেই তাদের পিছিয়ে পড়া শিশু ভাবা যাবে না। বরং তাদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে তাদের পাশে থাকতে হবে। তাদের জন্য তৈরি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানগুলো এ ক্ষেত্রে অনেক ভূমিকা রাখতে পারে। প্রতিষ্ঠাগুলো তাদের অভিনব পাঠদান, বিশেষ থেরাপি এবং প্রত্যেকর আলাদা আলাদা দক্ষতা খুঁজে তাকে সে বিষয়ে পারদর্শী করে তোলে।

অটিজম নিয়ে কুসংস্কার দূর করতে চাই সচেতনতা। প্রতিটি শিশুই সৃষ্টিকর্তার উপহার। কোনো শিশুই বোঝা নয়। তবে অটিজমের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনে এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের অবস্থার পরিবর্তনে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে অনেক এগিয়ে গিয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের নেওয়া নানান উদ্যোগে আশা করা যায় একদিন অটিজমে আক্রান্ত শিশুরা তাদের স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবে। সুযোগ পাবে নিজ দক্ষতাকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরার। সমাজের কাছে স্বীকৃতি পাবে স্বাভাবিক শিশু হিসেবে। তারাও দেশের সম্পদ। তারাও একদিন তাদের মেধা, সৃজনশীলতা দিয়ে দেশের জন্য সাফল্য বয়ে নিয়ে আসবে। শুধু প্রয়োজন সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তাদের মেধা বিকাশে সাহায্য করা। শুধু অটিজম সচেতনতা দিবস উপলক্ষে নয়, বছরের প্রতিটি দিনই তাদের শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে করে যাওয়া যুদ্ধে শামিল হতে হবে সবাইকে। তাদের চলার পথটা যেন সহজ হয়, সে লক্ষ্যে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। বিশ্বব্যাপী পালিত এই অটিজম সচেতনতা দিবস যদি তাদের জীবনযুদ্ধে এক ধাপ এগিয়ে দিতে পারে, তবেই এই দিবসের সার্থকতা অর্জিত হবে বলে মনে করি।
* লেখক: শাহিদা আরবী, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
*নাগরিক সংবাদে লেখা পাঠাতে পারেন [email protected]–এ

নাগরিক সংবাদ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন