বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আমি তখন মনে মনে বিভিন্ন ধরনের পরিকল্পনা করেছি। আর অপেক্ষায় আছি আগামী মাসের ১২ তারিখের। এল সেই সময়টা। টিকিট কাটলাম গ্রিন লাইনের এবং ১২ তারিখ সকাল ৭টার বাসে উঠলাম। মায়ের ব্যাগ ও একটি ছোট ট্রলি নিয়ে রওনা দিলাম। কিন্তু ভোরবেলায় দেখি আমার মা ‘টিফিন ক্যারিয়ার’ নিয়ে ভীষণ চিন্তিত। আমি কিছু বলব, এমন সময় আমার আম্মা বললেন আমার বাবা সব সময় বলতেন দূরের যাত্রাপথে সব সময় কিছু খাবার নিতে হয়। আমি আর আম্মাকে বললাম না যে এখন আমাদের দেশ অনেক এগিয়ে গেছে। যাত্রাপথে বিরতিতে খাবারের বিভিন্ন রেস্তোরাঁ আছে। আমি এককথায় রাজি হয়ে গেলাম যে আমাদের সঙ্গে টিফিন ক্যারিয়ারও যাবে।

সকালে বেবিট্যাক্সি করে গ্রিন লাইনের কাউন্টারে পৌঁছালাম তখন আর বেশি সময় বসে থাকতে হলো না। ট্রলি ও ব্যাগ নির্ধারিত জায়গায় রাখা হলো। টিফিন ক্যারিয়ারটি হাতে নিয়ে নিজ নিজ আসনে বসলাম আমার, আম্মা তো অবাক এত সুন্দর ব্যবস্থা দেখে! একসময় যাত্রাপথে বিরতির সময় হলো। আমরা বাস থেকে নামলাম, আম্মাকে ওয়াশরুম দেখালাম। নিজেও ফ্রেশ হলাম। একসময় বয়কে ডেকে খাবারের অর্ডার দেওয়ার পর আমার আম্মা তো অবাক! তিনি নিজের টিফিন ক্যারিয়ার আর খুলতে বললেন না।

একসময় রাজধানী ঢাকায় পৌঁছালাম নির্ধারিত সময়েই এবং বৃষ্টি বিড়ম্বনায় পড়লাম। নেমেই চাচিমাকে ফোন দিলাম এবং জানালাম ঢাকায় পৌঁছেছি। তিনি আমাকে অর্ডারের সুরে বললেন সোজা ‘দখিন হাওয়া’য় চলে এসো। আমিও ওনার কথামতো বেবিট্যাক্সির খোঁজ করতে লাগলাম। হঠাৎ করে আবিষ্কার করলাম রোড নম্বর না বললে তো হবে না। আবার ফোন করলাম চাচিমাকে। তিনিও অপেক্ষায় আছেন বোঝা গেল ওনার কথা শুনে। এবং বললেন কোথায় কতটুকু এসেছ? আমি বললাম, বেবিট্যাক্সিওয়ালা রোড নম্বর জানতে চাচ্ছে ওপাশ থেকে বললেন বলো...রোড নম্বর...প্রিয়াঙ্গন কমিউনিটি সেন্টারের পার্শ্বে এবং আওয়ামী লীগ অফিসের বিপরীতে।

এবার কাজ সহজ হলো বেবিট্যাক্সি পাওয়া গেল। আমরাও পৌঁছালাম ‘দখিন হাওয়া’য়। আওয়ামী লীগ অফিসও দেখা হলো। প্রিয়াঙ্গন কমিউনিটি সেন্টারও দেখতে পেলাম। দখিন হাওয়ার গেটে বেবিট্যাক্সি যখন বিদায় দিলাম তখন ‘দখিন হাওয়ার’ নিরাপত্তাকর্মীর মুখোমুখি হলাম। প্রথমেই কোথায় যাবেন এবং কোথা থেকে এসেছেন? আমি বললাম, হুমায়ূন আহমেদ সাহেবের বাসায় যাব।
নিরাপত্তাকর্মী: স্যার কি জানেন আপনারা আসবেন এবং আপনার কী হয়?
আমি: হ্যাঁ, স্যার জানেন। আমার কী, তা জানা কি জরুরি?
একটি রেজিস্টি খাতা বের করল এবং আমার নাম ও মোবাইল নম্বর লিখল।

ইন্টারকমের সাহায্যে ফোন করল এবং বলল, সিলেট থেকে স্যারের চাচি আম্মা এসেছেন, বলছেন আপনাদের বাসায় যাবেন। কী করব ম্যাডাম? ওপাশ থেকে উত্তর এল হ্যাঁ–সূচক এবং বোঝা গেল তার পরবর্তী ব্যবস্থাপনায়। লিফট পর্যন্ত এগিয়ে দিল এবং দেখতে পেলাম কালো রঙের একটি নোয়া গাড়ি অপেক্ষারত। অবাক হয়ে দেখলাম প্রিয় ‘কথাসাহিত্যিক’ আমাদের দাদাভাই হুমায়ূন আহমেদ বসে আছেন এবং মনে হচ্ছে কারও জন্য অপেক্ষা করছেন। আমাকে ও আম্মাকে দেখে হাসিমুখে সালাম দিলেন। আমাকে বললেন, মাসুদ তুমি চাচিকে নিয়ে ওপরে চলে যাও। আম্মা তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। আমার সঙ্গে দেখা হবে রাত্রিবেলায়। আমি ও শাওন এখন যাব ‘ঢাকা ক্লাবে’, সেখানে এক নতুন বাবুর্চি এসেছেন। তার রান্না নাকি অসাধারণ তাই যাচ্ছি। এমন সময় মেহের আফরোজ শাওন নিচে নেমে এলেন। কুশলাদি জিজ্ঞেস করে বললেন, আম্মা অপেক্ষা করছেন আপনি চাচিকে ওপরে নিয়ে যান। একটু ফ্রেশ হোন। চাচি অনেক দূর থেকে এসেছেন ওনার নিশ্চয়ই কষ্ট হয়েছে। লিফটে যখন উঠি তখন দেখলাম চাচি দরজার সামনে অপেক্ষায় আছেন। আমাদের নিয়ে গেলেন ভেতরে। হালকা খাবার খেয়ে যে যার মতো বিশ্রাম নিচ্ছি, এমনি করে একসময় রাত হলো। রাতের খাবার খাওয়া হলো। অপেক্ষা এবং তৈরি হচ্ছে ‘দখিন হাওয়ার’ বাসাটি। একসময় দেখলাম অনেক বিখ্যাত মানুষের আগমনে ড্রয়িংরুমটি তিল ধারণের সুযোগ নেই।

মাজহারুল ইসলাম (অন্য প্রকাশ-এর কর্ণধার) ওনার ক্যামেরার কাজ শুরু হয়ে গেল। টিভি চ্যানেলের অনেকেই হাজির। একসময় ১২টা বাজল এবং হুমায়ূন আহমেদের ৬১তম জন্মদিন উৎসব শুরু হলো। টিভি ক্যামেরার সামনে হুমায়ূন আহমেদ বললেন, ‘আজ আমার জন্মদিন, এবার আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমার আত্মীয়স্বজনদের নিয়ে জন্মদিন পালন করব। আজ এখানে আমার পরিবারের পাশাপাশি আছেন আমার মা।

সুদূর সিলেট থেকে এসেছেন আমার চাচি হুসনে আরা বেগম, যাঁর বাবা আবদুর রহমান ছিলেন একজন শিক্ষক ও অনারারি ম্যাজিস্ট্রেট। সঙ্গে এসেছে আমার চাচাতো ভাই মাসুদ। আজ এসেছেন অনেকে। ঢাকার আরও অনেকে আসবেন সকালে। আমরা সকালে সবাইকে নিয়ে নুহাশপল্লীতে যাব এবং সেখানে মূল অনুষ্ঠানটি হবে। আপনারা যাঁরা রাত্রিবেলায় কষ্ট করে এসেছেন, তাঁদের জানাই ধন্যবাদ। আপনারা আমার জন্য দোয়া করবেন।’ কেক কেটে ওই দিন রাত্রিবেলায় ঘরোয়া পরিবেশে জন্মদিনের শুভসূচনা হয়। দেখলাম শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন মাজহারুল ইসলাম ও পরিবার, আলমগীর হোসেন, শাকুর মজিদ, মেহের আফরোজ শাওনের মা-বাবাসহ অন্যান্যরা।

আরও উপস্থিত ছিলেন আসাদুজ্জামান নূর, জাহিদ হাসান, আবদুল কুদ্দুস বয়াতি ও তাঁর দল। আমার আম্মা আসাদুজ্জামান নূরকে দেখে বলেই ফেললেন, আপনি বাকের ভাই না? আপনাকে তো টেলিভিশনে দেখেছি!
সকালে দেখলাম জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান স্যার, জুয়েল আইচ প্রমুখ জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। সকাল সাতটায় দেখলাম চাচিমা ও দাদাভাই একসঙ্গের চা খাচ্ছেন, পাশে শুয়ে আছে নিশাদ। আমাকে বলা হলো পাশের ফ্ল্যাটে মাজহার সকালের নাশতার আয়োজন করেছে। আমাদের সবার দাওয়াত। আসলেই বড় মনের মানুষ মাজহার ভাই। বিশাল আয়োজন!
সকালের খাবারের পর বলা হলো নয়টায় বাস আসবে এবং আমরা সবাই যাব নূহাশপল্লীতে। সেখানে রাত্রি যাপন করব। সবাই সেই পরিকল্পনা শুনে তৈরি হলাম সকালবেলায়।

একসময় বাস এল, আমরা সবাই চেপে বসলাম বাসে। গন্তব্য ‘নুহাশপল্লী’। নুহাশপল্লীতে পৌঁছানোর পর পল্লীর ব্যবস্থাপক বুলবুল সাহেব আমাদের স্বাগত জানালেন। ব্যাগ ট্রলি রেখে সবাই যার যার মতো নন্দনকানন ঘুরতে গেলেন, আমিও আমার মতো সবকিছু দেখতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পর ঘোষণা এল নুহাশপল্লীর অনুষ্ঠানসূচি। বিকেলবেলা থেকে মূল অনুষ্ঠান শুরু হবে। কেক কাটা, জাদু, বাউলগান, বারবিকিউ পার্টি, ফানুস ওড়ানো ইত্যাদি। যথাসময়ে দুপুরের খাবার শেষ করে বিকেলের প্রস্তুতির জন্য অপেক্ষা। একসময় বিকেল হলো এবং মূল অনুষ্ঠান শুরু হলো। প্রথমে স্বাগত বক্তব্য দেন মেহের আফরোজ শাওন। এরপর হুমায়ূন আহমেদ। হুমায়ূন আহমেদ বললেন, এবারের জন্মদিন উৎসব উদ্‌যাপন করার জন্য দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আমার আত্মীয়স্বজন সমবেত হয়েছেন। এবার শুধু তাদের জন্যই এই অনুষ্ঠান। সম্পূর্ণ অনুষ্ঠানটি রেকর্ডিং হয় এবং একসময় তা চ্যানেল আই প্রচার করে। কেক কাটা, রাতের খাবারের পাশাপাশি ফাটাফাটি ভূতের গল্প শোনালেন শাওন ও হুমায়ূন আহমেদ। মাজহার ভাই ক্যামেরা ক্লিক করল শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। একসময় ঘোষণা এল পত্রিকায় প্রকাশিত হুমায়ূন আহমেদের প্রথম প্রকাশিত লেখা, ‘দিতে পারো এক শ ফানুস এনে? আজন্ম সলজ্জ সাধ একদিন আকাশে ফানুস ওড়াই।’ সেই প্রিয় ফানুস ওড়ানোর মাধ্যমে দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে। রাতে ঘুমানোর জন্য ব্যবস্থা হয় এবং মূল তদারকি করেন হুমায়ূন আহমেদ।

ঘোষণা এল কে কোথায় ঘুমাবে। বড়রা—মা, চাচি, খালা, মামা, মামিরা থাকবেন আমার মূল ভবনে। বাকিরা অন্যান্য জায়গায়। আর মাসুদ থাকবে ‘বৃষ্টিবিলাসে’। আমার তো আর ঘুম আসে না। একবার বিছানায় যাই তো একবার বারান্দায় আসি। সেখানে সুন্দর করে রাখা বেতের চেয়ারে বসে রাতের নুহাশপল্লী দেখার মজাই তো অন্য রকম। একসময় ভোর হলো। আমিও ফ্রেশ হলাম। নাশতা খাওয়ার জন্য ডাকা হলো আমি যখন ‘বৃষ্টিবিলাস’ থেকে মূল ভবনের দিকে যাচ্ছিলাম, তখন দেখলাম দাদাভাই একটি গোলটেবিলে লিচুগাছের ছায়ায় বসে আছেন এবং অপেক্ষা করছেন। আমিও ওনাকে দেখে সালাম দিয়ে ওনার পাশে বসলাম। একসময় ব্রেকফাস্ট এল এবং খাবারদাবার কেমন আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন। আমি বললাম, ‘খুব ভালো’। ‘হ্যাঁ, তুমি ঠিক বলেছ, আমার বাবুর্চি খুব ভালো খাবার রান্না করতে পারে।’ বিকেলবেলায় চলে যেতে হবে আবারও ‘দখিন হাওয়ায়’। সবাই যার যার মতো তৈরি হচ্ছেন। কেউ কেউ ‘নুহাশপল্লী’ থেকেই যার যার গন্তব্যে চলে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছেন। আমি আমার মা ও চাচি চলে এলাম ‘দখিন হাওয়ায়’ আগেভাগেই। দাদাভাই ও শাওন ভাবি আসবেন পরে। একসময় বিদায় নিলাম। দাদাভাই ও ভাবি বললেন, তোমাদের সঙ্গে রাতে দেখা হবে। সন্ধ্যার পরপরই চলে এলেন এবং আমার ডাক পড়ল ড্রয়িংরুমে যাওয়ার জন্য। সেখানে তিনি অপেক্ষায় আছেন দাবার বোর্ড সাজিয়ে দাবা খেলার জন্য। শুরু হলো দাবা খেলা।

একপাশে আমি অন্য পাশে হুমায়ূন আহমেদ। প্রথম গেমেই আমি জয়লাভ করি। এরপর দ্বিতীয় গেমে হুমায়ূন আহমেদ এবং তৃতীয় গেমে আমি। আমার মনে হলো আমাকে খুশি করার জন্যই তৃতীয় গেম আমাকে ছেড়ে দিয়েছেন দাদাভাই। এর মধ্যে খবর পাঠালেন মাজহার ভাইকে আসার জন্য। কারণ, মাজহার ভাই খুব ভালো দাবা খেলেন। আমি তো কিছুটা আতঙ্কে আছি! ভাবি (শাওন) পাশের রুম থেকে বললেন, মাসুদ ভাই বাড়ির মান রাইখেন। শুরু হলো মাজহার ভাই ও আমার খেলা। প্রথম গেমেই মাজহার ভাই জিতে গেলেন আর পরবর্তী গেম দুটি আমি। আলহামদুলিল্লাহ বাড়ির মান রক্ষা পেল। আড্ডা হলো সবাইকে নিয়ে অনেক রাত পর্যন্ত। আড্ডায় শরিক হলেন আলমগীর সাহেব (অবসর প্রকাশনীর কর্ণধার), মাজহার সাহেব (অন্য প্রকাশের কর্ণধার), মাজহার সাহেবের মা, আমার মা, চাচিমা, শাওন ভাবি, হুমায়ূন আহমেদ এবং শিখু আপা। একসময় ভোর হলো এবং আমাদেরও ফেরার সময় হলো প্রিয় শহর সিলেটের উদ্দেশে।

পাঠক থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন