বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বিশ্ববিদ্যালয় পড়াকালে তাঁর লেখা ছোট গল্প ‘আত্মজা ও একটি করবী’ অতি আগ্রহভরে পড়ি। সাহিত্যচর্চা বলতে যা বোঝায়, তা তখনো বুঝে উঠিনি। বলতে গেলে তখনো সাহিত্যের আবডালে বিচরণ করা হয়নি। তাই সাহিত্যের ভেতর থেকে কোনো রসবোধ খুঁজে বের করা আমার পক্ষে সহজ ছিল না। তারপরও এ বইটি পড়ায় উৎসাহবোধ করি। গল্পটিতে সাহিত্যের ভেতরে প্রকৃত সাহিত্যের মনোভাব ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন বলেই জীবনযুদ্ধের মানবিক ট্র্যাজেডি আমাদের সামনে ধরা দেয়। ‘আত্মজা ও একটি করবী’ ছোটগল্পে বুড়োর ভাষায়, ‘আমি একটি করবীগাছ লাগাই বুঝলে? ফুলের জন্য নয়, বিচির জন্য। চমৎকার বিষ হয় করবী ফুলের বিচিতে।’ বুড়োর বিক্ষিপ্ত কথোপকথনে তিনি মানবিক ট্র্যাজেডি তুলে ধরেছেন। করবীগাছটি একটি প্রতীক মাত্র। মূলত বুড়োর পরাজিত জীবনযুদ্ধে সমাজকে দেওয়া শেষ তিরস্কারই মুখ্য বিষয়! ওই গল্পটির ভেতর দিয়ে জীবন-যন্ত্রণা কিংবা দুঃখ-কষ্টের নিপুণ বাস্তবতায় আমাদের জিজ্ঞাসার সম্মুখে দাঁড় করিয়ে রাখে। তাঁর ভাবনার মিশেলে থাকত নিম্নবর্গীয় সমাজের বাস্তবিক রূপ। সমাজের নিম্নশ্রেণির প্রতে৵ক মানুষের জীবনকে যেমন চিত্রায়িত করেছেন, তেমনি শোষিত সমাজের মধে৵ও বেঁচে থাকার আর্তি প্রকাশ করেন। সেজন্যই আমরা দেখতে পাই ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ের মাঝে বেদনাহত রূপ নিয়ে সমাজে টিকে থাকার লড়াই। যদিও সে লড়াইয়ে হারজিত থেকেই যায়।

শৈশবের কাঁটাতার পেরিয়ে তিনি লেখায় মনোনিবেশ করেন। সাহিত্যে ও শৈলীকে এক ভিন্ন আঙ্গিকে তুলে ধরেন। তাই বাংলা সাহিত্যে নতুন আঙ্গিক ধারার প্রথম সারির একজন সাহিত্যিক ছিলেন। জীবনকে নির্মাণ করতে সব সময়ই তাঁর লেখার ভেতর দিয়ে নতুন একটি শিল্প উঠে এসেছে। সে কারণে তাঁর লিখিত প্রথম গল্প ‘শকুন’–এর বিষয় ও আঙ্গিক এক অবিচ্ছিন্ন সত্তায় মিলে যায়। বস্তুত তাঁর উপন্যাস ও ছোট গল্পে বাস্তব জীবনের যে নির্মমতা উপস্থাপন করেছেন, তা আমাদের অভিজ্ঞতার দিগন্তকে বিস্তৃত করে। ছোটগল্পের মধ্য দিয়েই তাঁর লেখক সত্তার আবির্ভাব ঘটে। শিল্পীমাত্রই চেষ্টা করেন বাস্তব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সাহিত্যধারায় প্রবেশ করতে। হাসান আজিজুল হকের বেলায়ও সেরকমই আমরা দেখতে পাই। মূলত শিল্পীসত্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে তাঁর ছোটগল্পের মধ্য দিয়েই। এখানেই একজন সাহিত্যিকের মূল ব্যঞ্জনা ধরা দেয়। এভাবেই বাংলা সাহিত্যে বাস্তবিক জীবনধারা তুলে ধরে তিনি সাহিত্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছেন। অসাধারণ সাহিত্যকর্ম সৃষ্টির মধ্য দিয়ে তিনি বাস্তব জীবনে আঁধারের যবনিকা টানতে চেয়েছিলেন। তাই বাস্তব জীবনের সুখ-দুঃখই তাঁর সাহিত্যে বেশি স্থান করে নিয়েছে। বাংলা সাহিত্যে এখানেই তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয়।
হাসান আজিজুল হক ২০০৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘বঙ্গবন্ধু চেয়ার’ পদের জন্য মনোনীত হন। ১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৯৯ সালে একুশে পদক ও ২০১৯ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হন। সাহিত্যচর্চার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৮ সালে সেপ্টেম্বরে ‘সাহিত্যরত্ন’ ঊপাধি লাভ করেন। এ ছাড়া তিনি পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার—১৯৬৭ সালে আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৭০)। এছাড়া পেয়েছেন অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার, আলাওল সাহিত্য পুরস্কার। ১৯৯৯ সালে ‘একুশে পদকে’ ভূষিত হন। ‘আগুনপাখি’ উপন্যাসের জন্য তিনি আনন্দ পুরস্কার পান। উদ্বাস্তুদের জীবনের দগ্ধতা কিংবা অসহায়ত্ব নিয়ে পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে লড়েছেন। সেজন্যই পাকিস্তানিদের চোখে রুষ্ট ছিলেন। জয় বাংলার চেতনায় তিনি সদা উজ্জীবিত ছিলেন। অধ্যাপনার পাশাপাশি তিনি বহু লেখালেখি করেছেন। একাধারে গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ লিখেছেন তিনি।

হাসান আজিজুল হকের ‘নির্বাচিত গল্প’-এর ভূমিকায় শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছিলেন, এতখানি লিখেও বলা সম্ভব নয়, হাসান কেমন। সে প্রয়াস অক্ষম। তাঁকে জানার শ্রেষ্ঠ উপায়, তাঁকে পড়ে ফেলা। অনাবিল গল্প বলার ভঙ্গি, তরতর করে এগিয়ে চলা। অভিজ্ঞতাঋদ্ধ এক প্রবীণ মানুষ সবার সামনে ঝুলি উপুড় করে দেন, আর সবাই গোগ্রাসে গেলে। তাঁর ভাষা কেমন, বলতে হয় তাঁর গদ্য ধার করেই ‘নিতান্তই সরল সহজ’।

অনেক দিন অসুস্থ থাকার পর না ফেরার দেশে চলে যান তিনি। তাঁর চিরপ্রস্থানে আমাদের সাহিত্য জগতে অপূর্ণতা থেকেই যাবে। সেটি পূরণ করা কখনো হয়তো সম্ভব হবে না। এই বহুমাত্রিক জ্যোতিম৴য়কে নীরব কান্নায় বিদায় জানানো হয়।
লেখক: ব্যাংক কর্মকর্তা ও কলামিস্ট

পাঠক থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন