বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আমাদের গ্রামের পাশেই ঝালিয়ার হাওর। এ হাওরের মধ্য দিয়ে পশ্চিম দিকের পায়ে হাঁটার মাটির যে রাস্তা, সেটি মামুদপুর, হারুলিয়া, সাজিউড়া ইত্যাদি গ্রাম হয়ে কেন্দুয়া উপজেলা (তখনকার থানা) শহরে গেছে। চৈত্র মাসে সকাল ৯টা–১০টায় তাকালেই দেখতাম, সারি সারি মানুষ আটার বস্তা নিয়ে আসত। তা–ও রিকশা বা এমন কোনো যানবাহন ছিল না। হাওরের মধ্য দিয়ে উঁচু–নিচু রাস্তা। বোঝা বহন ছাড়া কোনো গত্যন্তর ছিল না। তখন গম–আটার দাম ধান–চালের দামের চেয়ে অনেক কম ছিল। টাকা বাঁচানোর জন্য মানুষ ভাতের বদলে আটা খেত। এখন তো গরিব মানুষ আটা খায় না। আটা খায় ধনীরা—ডায়াবেটিস/ প্রেশারের রোগীরা। যাহোক, চৈত্র মাসটা খেয়ে না খেয়ে কষ্টের মধ্য দিয়েই পার হতো। চৈত্র মাসকে বলা হতো ‘দারুণ চৈত্র মাস’। এরপর বৈশাখ মাসে ধান হলে তো ভালো। আর না হলে মানুষের মাথায় হাত। সারা বছরের অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্যে পড়ে যেত আবার।

default-image

চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের কথা স্পষ্টই মনে আছে আমার। তখন আমি চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। বয়স তো কমই ছিল। তবু ভুলিনি কিছুই। মানুষের অবর্ণনীয় কষ্ট তখন নিজের চোখেই দেখেছি। তবে তখনকার সরকারের আন্তরিকতা বা চেষ্টার কোনো কমতি ছিল না। আমাদের স্কুলে তখন ছাতু, বিস্কুট ইত্যাদি দেওয়া হতো, যাতে দুর্ভিক্ষের প্রভাব শিক্ষার্থীদের ওপর না পড়ে। কিন্তু এমনিতেই যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটাকে দাঁড় করানো, তার ওপর বন্যা আর খরার ফলে দুর্ভিক্ষের কড়াল থাবা, তার চেয়ে বড় কথা, স্বার্থান্বেষী কিছু মোনাফাখোর মজুতদারের কর্মকাণ্ড আর দেশি-বিদেশি চক্রান্তকারী—সব মিলিয়ে এমন একটা কঠিন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যে তা সামাল দেওয়া সরকারের পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আর হাওরাঞ্চলের মানুষকে এ চক্রান্তের মূল্য চরমভাবেই দিতে হয়েছিল। তখন আমাদের এলাকায় দেখেছি, মোটামুটি ধনী মানুষকেও ভাতের কষ্টে পড়তে হয়েছিল। আর গরিব মানুষের তো কষ্টের কোনো সীমাই ছিল না। ভাতের অভাবে তারা শাপলা–শালুক, শাকসবজি—হাতের কাছে যা পেয়েছে, তা–ই খেয়ে ক্ষুধা নিবারণের চেষ্টা করেছে। এমনকি তারা ভাতের ফেন, চালের কুঁড়া ইত্যাদি পর্যন্ত খেয়েছে। এগুলো পাওয়াও তখন বেশ কঠিন ছিল।

এক দিনের একটা ঘটনা বলি। আমার মা ভাত খেতে বসেছিলেন। এমন সময় এক বৃদ্ধা ও খুব দুর্বল ভিক্ষুক এলেন। মাকে বললেন, ‘আমার পেটে আজ দানা–পানি কিছুই পড়েনি। আমি আর চলতে পারছি না। মনে হয় মরে যাব। আমাকে দুটো ভাত দেন বোন।’ মায়ের মনটা ছিল খুবই নরম। তাঁর খাবার বৃদ্ধাকে দিয়ে দিলেন। বৃদ্ধা খাবার পেয়ে গোগ্রাসে বেহুঁশের মতো খেতে লাগলেন। আর সঙ্গে সঙ্গেই ভাত তাঁর গলায় আটকে গেল। বৃদ্ধা পড়ে গেলেন। তাঁর মরে যাওয়ার অবস্থা। বাড়ির সবাই তাঁর দিকে এগিয়ে গেলেন। কেউ তাঁকে পানি খাওয়ালেন, কেউবা তাঁর মাথায় পানি দিলেন। অনেক্ষণ পর বৃদ্ধা চোখ খুললেন। আমাদের বাড়ির সবাই তখন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। সবাই মাকে দুষতে লাগলেন এই বলে যে ‘বৃদ্ধা মারা গেলে নিশ্চিত আমরা মার্ডারের কেসে পড়তাম।’ মা অবশ্য এমন কাজ প্রায়ই করতেন।

default-image

যাহোক, হাওরের মানুষ শত অভাবের মধ্যেও ভেঙে পড়ে না। লড়াকু সৈনিকের মতো সংগ্রাম করে বছরের পর বছর তাদের কষ্টের দিনগুলো অতিক্রম করে আসছে।
ছোটবেলায় দেখেছি, কৃষকেরা মান্ধাতা আমলের চাষবাসে অভ্যস্ত ছিলেন। প্রচণ্ড গরমে বা হিমশীতল ঠান্ডায় কাজ করে তাঁদের ফসল ফলাতে হতো। পৌষ মাসের একদম ভোরে গরু আর লাঙল নিয়ে তাঁরা বেরিয়ে যেতেন জমি চাষ করে ধানের চারা রোপণের জন্য জমি প্রস্তুত করতে। এ সময়ে এত ঠান্ডা যে লেপ–কাঁথার নিচে শুয়ে থেকেও ঠান্ডা থেকে বাঁচা কঠিন হতো। আর এই সময় তাঁরা হাঁটুপানিতে নেমে হালচাষ করতেন। ২০-৩০ মিনিট নয়, কয়েক ঘণ্টা ধরে তাঁরা হালচাষ করতেন। কী করে যে এত ঠান্ডা সহ্য করতেন, তা ভেবে পাই না। আমি তাঁদের জিজ্ঞেস করেছি, ‘এত সকালে পানিতে নেমে হালচাষ করতে কষ্ট লাগে না?’ তাঁরা বলতেন, ‘প্রথম কিছুক্ষণ লাগে, এরপর আর লাগে না। পাগুলো কেমন যেন অবশ হয়ে যায়।’ সত্যি, ঠান্ডায় কাজ করতে করতেই তাঁদের অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। আমি নিজেও মাঝেমধ্যে এতটা সকালে না হলেও পৌষ মাসে পানিতে নেমে ধানের চারা রোপণ করেছি বা জমিতে আগাছা পরিষ্কার করেছি। ঠান্ডা লাগলেও এতটা অসহ্য মনে হতো না, যেমনটা এখন মনে হয়। এখন তো বৃষ্টিতে একটু ভিজলে বা একটু ঠান্ডা লাগলেই সর্দি, এমনকি জ্বর পর্যন্ত হয়ে যায়। তখন তো হতো না। আমাদের ছেলেমেয়েরা তো একটু ঠান্ডাতেই কাতর হয়ে যায়। গ্রামের ছেলেমেয়েরা এখনো আমাদের ছেলেমেয়েদের চেয়ে অনেক কষ্টসহিষ্ণু। তবে গ্রামের অবস্থাও অনেকটাই পরিবর্তিত হয়েছে। এখন জমি চাষ হয় ট্রাক্টর দিয়ে। গরু দিয়ে লাঙল টানার দিন এখন আর নেই।

শৈশবে আমাদের এলাকায় ভাতের অভাব দেখলেও মাছের অভাব দেখিনি কখনো। প্রচুর মাছ পাওয়া যেত প্রাকৃতিক উৎস থেকে। মাছ ধরা যেমন সহজ ছিল, তেমন আনন্দদায়কও। অনেকভাবে মাছ ধরার সুযোগ ছিল। বর্ষাকালে মাছ ধরার একটা সহজ উপায় ছিল লার দেওয়া (আমাদের এলাকায় এ নামে পরিচিত)। এ উপায়ে মাছ ধরার জন্য তিনজন মানুষ দরকার। একজন উচের (বাঁশের বেত আর চটি দিয়ে তৈরি ত্রিকোনাকার মাছ ধরার যন্ত্র) এক কোনায় ধরে রাখতেন। অন্য দুজন একটা লম্বা দড়ির দুই প্রান্তে ধরে অনেক দূরে যেতেন এবং দড়ি টেনে উচের দিকে আসতেন। এরপর উচের কাছে এসে দুজন উচের দুই কোনার ওপর পা রেখে দড়িটা পায়ের নিচ দিয়ে উচের দিকে টানতেন। এতে দড়ির তাড়া খেয়ে মাছগুলো উচের মধ্যে এসে জড়ো হতো। টানতে টানতে দড়িটা যখন উচের সঙ্গে লাগত, তখন তিনজন একসঙ্গে উচটা ওপরে তুলতেন। দেখা যেত, উচের মধ্যে অনেক মাছ জমা হয়ে আছে। এরপর উচটা নৌকায় উপুড় করে রাখা হতো। এভাবে বেশ কিছুক্ষণ মাছ ধরার পর দেখা যেত, নৌকার তলাটা ভরে গেছে। ছোট–বড় এসব মাছের স্বাদই ছিল আলাদা। মুক্ত জলাশয়ের মাছ, রান্না করলে অন্য রকম একটা গন্ধ পাওয়া যেত, এখন যা সচরাচর পাওয়া মুশকিল।

মাছ ধরার মজার গল্প

এভাবে মাছ ধরার ক্ষেত্রে দারুণ মজার একটা গল্প বলব। গল্পটা আমার শোনা। আমাদের গ্রামের তিনজন একদিন লার দিয়ে মাছ ধরতে যান। উচ ধরে রাখেন একজন মুরব্বি। অন্য দুজন দড়িটা টেনে উচের কাছে নিয়ে আসার মুহূর্তে যখন উচটা তোলার সময়, তখনই মুরব্বি এটা ছেড়ে দেন। অন্য দুজন আশ্চর্য হয়ে এর কারণ জিজ্ঞেস করেন। কিন্তু মুরব্বি কিছু না বলে উ-আ শব্দ করতে থাকেন। আর দুই হাত দিয়ে তাঁর লুঙ্গি সামালাতে ব্যস্ত থাকেন। এভাবে কিছুটা সময় কিসের সঙ্গে যেন যুদ্ধ করলেন। সঙ্গী দুজনকে কিছু বলেন না। তাঁরাও কিছু বুঝতে পারছেন না। অবশেষে তিনি দুই হাতে লুঙ্গি শক্ত করে ধরে দুজনকে বললেন তাঁকে টেনে নৌকায় তুলতে। তাঁরা তাঁকে নৌকায় টেনে তুললেন। এরপর তিনি হাত ছাড়লেন। তাঁর লুঙ্গির ভেতর থেকে বেরিয়ে এল বিশাল আকারের এক মৃগেল মাছ। আর মুরব্বি তখন হাঁপাতে লাগলেন। সঙ্গী দুজন তো তখন আশ্চর্য হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন। ডাঙায় অসহায় হলেও পানিতে মাছেরা অসম্ভব শক্তিশালী। আর বাঁচার জন্য মাছটা নিশ্চয়ই তার সর্বশক্তি প্রয়োগ করেছে। তাই মাছটাকে সামলাতে গিয়ে মুরব্বির ওপর দিয়ে কী ধকলটাই না গেছে! তবু তিনি হাল ছাড়েননি। মাছটা শেষ পর্যন্ত আটকিয়েই ফেলেছেন।

default-image

মাছ ধরার সঙ্গে অনেক ভৌতিক বিষয়ের কথাও আমরা ছোটবেলায় শুনেছি। মাছ ধরার জন্য অনেক সময় খুব ভোরবেলায় যেতে হতো। তা–ও আবার বৃষ্টির দিনে। তখনকার দিনে বর্তমান সময়ের মতো এত ঘনবসতি ছিল না। বিদ্যুৎ তো ছিলই না। এ ছাড়া গ্রামে অনেক জঙ্গল ছিল। ফলে রাত ছাড়াও সকালেও বেশ অন্ধকার থাকত। যাহোক, রাতেই পরামর্শ করে রাখা হতো কত সকালে কে কাকে নিয়ে মাছ ধরতে যাবে। এমনভাবেই দুই বন্ধু রাতে পরামর্শ করে ঘুমালেন যে তাঁরা একদম ভোরবেলাতেই একেবারে অন্ধকার থাকতেই মাছ ধরতে বেরিয়ে যাবেন। ভোরে একজন শুনলেন, তাঁর বন্ধু তাঁকে ডাকছেন। তিনিও ঘুম থেকে তাড়াহুড়ো করে উঠলেন। হারিকেনটা হাতে নিয়েই দরজাটা খুললেন। বন্ধুকে বললেন ভেতরে আসতে, কিন্তু তিনি ভেতরে না এসে তাঁকে বের হওয়ার জন্য তাড়া দিতে লাগলেন। হঠাৎ করেই ঘরের ভেতরের বন্ধুর বাইরের বন্ধুর পায়ের দিকে নজর পড়ল। দেখলেন পায়ের আঙুলগুলো পেছনের দিকে। দেখামাত্রই বুঝে ফেললেন যে এটা ভূত, তাঁর বন্ধু নন। সঙ্গে সঙ্গেই দরজাটা বন্ধ করে দিলেন এক চিৎকার। ভূতও তখন চিৎকার দিয়ে এই বলে চলে গেল, ‘বেঁচে গেলি, আজ ঘর থেকে বের হলে তোর ঘাড় মটকে খেতাম।’ এসব গল্প শুনে আমরা বেশ ভয় পেতাম। আর রাতে কেউ ডাকতে এলে প্রথমেই তার পা দেখে নিশ্চিত হতাম সে ভূত না মানুষ।

মাছ ধরার এমন আরও অনেক মজার গল্প আমরা শুনতাম। আমাদের গ্রামের এক হাজি সাহেব মাছ শিকারে খুব ওস্তাদ ছিলেন। একদিন তিনি হাওরে মাছ ধরতে গেলেন। তখন বর্ষাকাল। হাওরে শোল মাছের এক ঝাঁক পোনামাছ (আমাদের এলাকায় একসঙ্গে থাকা পোনামাছকে পোনাবাইশ বলা হতো) পেলেন। পোনামাছের সঙ্গে মা শোল মাছটাও থাকে। এটাকে মারার জন্য তিনি কুচ (মাছ ধরার যন্ত্র) নিয়ে দাঁড়ালেন। বড় শোল মাছটা ভাসলেই ঘা মেরে এটাকে ধরবেন। হঠাৎ করেই তিনি দেখলেন, পোনামাছের ঝাঁকের মধ্যে থেকে শোল মাছের বদলে বিশাল আকারের এক মাউচ্ছা সাপ (আমাদের এলাকায় গোখরো সাপকে এ নামে ডাকা হতো) ফণা তোলে তাঁর দিকে ছোবল দিতে আসছে। তিনি আর কালবিলম্ব না করে কুচ দিয়ে সাপটাকে ঘা দিয়ে লাগিয়ে ফেললেন এবং কুচের বাঁশের হাতলে শক্ত করে ধরে সাপটাকে পানির নিচে একেবারে মাটির সঙ্গে চেপে ধরলেন। ওখানে তখন বেশ পানি। আর সাপটাও খুব শক্তিশালী। সাপটাও তার সব শক্তি দিয়ে চেষ্টা করতে লাগল উঠে আসতে। আর হাজি সাহেবও প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগলেন সাপটা না মরা পর্যন্ত ঠেসে ধরে রাখতে। উভয়ের মধ্যেই বাঁচা–মরার সংগ্রাম চলছে। পাশেই ছিলেন আরেকজন মাছশিকারি। তিনি ভাবলেন, হাজি সাহেব বিরাট বড় কোনো মাছ আটকাতে পেরেছেন। তিনি তাঁকে একটু সাহায্যের জন্য এগিয়ে গিয়ে বললেন, ‘কী মাছ এটা? মনে হচ্ছে বেশ বড়। আমি কি আপনাকে সাহায্য করতে পারি?’ হাজি সাহেব হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। বললেন, ‘পারেন, আমার কুচটায় একটু শক্ত করে ধরুন। আমি খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।’ লোকটা খুব উৎসাহ নিয়ে এগিয়ে গেলেন এবং কুচটায় ধরলেন। সঙ্গে সঙ্গেই হাজি সাহেব কুচটা ছেড়ে দিয়ে একটু দূরে চলে গিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, ‘ভাইজান, একটু শক্ত করে ধরুন। এটা কিন্তু মাছ না, মাউচ্ছা সাপ।’ কথাটা শুনে ভদ্রলোক ভীষণ ভয় পেয়ে গেলেন। বললেন, ‘বলেন কী, সাপের কথা তো আগে বলেননি।’ হাজি সাহেব বললেন, ‘আগে বললে কি আপনি কুচটা ধরতেন? আপনি ভয় পাবেন না। আমি আপনাকে ফেলে যাব না। একটু বিশ্রাম নিয়ে আসছি।’ ‘বলেন কি ভাই! তাড়াতাড়ি আসুন।’ হাজি সাহেব বসে বসে হাঁপাচ্ছেন। তাঁর পুরোটা শরীরই ঘেমে গেছে। অন্যদিকে সাহায্য করতে আসা লোকটার শরীরও ঘামে জবজবে। যাহোক, একটু বিশ্রাম নিয়ে হাজি সাহেব তাঁর কাছে গেলেন। ততক্ষণে সাপটাও কিছুটা দুর্বল হয়ে এসেছে। সাহায্যকারী লোকটা আস্তে আস্তে কুচটা ওপরে তোলার পর হাজি সাহেব অন্য একটা কুচ দিয়ে সাপটার মাথায় আরেকটা ঘা দেন। এরপর দুজনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সাপটাকে মেরে নৌকায় তুলেন। সাপটা এতটা লম্বা ছিল যে এর মাথাটা নৌকার এক মাথায় আর লেজটা অন্য মাথায়। দুজনেই স্বীকার করলেন যে এত বড় সাপ তাঁরা জীবনে কেউই দেখেননি।

আলো দিয়ে মাছ ধরা

আসলে মাছ ধরা তখন সাধারণ মানুষের কোনো পেশা ছিল না। তারা মাছ বিক্রি করত না। শুধু জেলেরাই মাছ বিক্রি করতেন। তখন এখনকার মতো ফিশারি ছিল না। প্রাকৃতিক উৎস থেকে প্রচুর পরিমাণে মাছ পাওয়া যেত। অনেকভাবে মাছ ধরার মধ্যে একটা উপায় ছিল আলো দিয়ে মাছ ধরা। হ্যাজাক লাইট জ্বালিয়ে নৌকায় করে রাতে বের হতে হতো। লাইটটা থাকত নৌকার সামনে গলুইয়ে বাঁধা। একজন বা দুজন মাছশিকারি কুচ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন। একজন নৌকা বাইতেন। লাইটের আলোয় পানির নিচে থাকা মাছ খুব ভালোভাবেই দেখা যেত। এভাবে রুই, কাতলা, বোয়ালসহ সব ধরনের মাছ ধরা যেত। এভাবে প্রায়ই প্রচুর পরিমাণে কাইক্যা (কাকি) মাছ ধরা যেত, যেগুলো রান্না করলে অন্য রকম একটা মজার গন্ধ বের হতো। মাছ ধরার নেশায় পেয়ে বসলে যতক্ষণ মাছ পাওয়া যেত, ততক্ষণই মাছ ধরা হতো। প্রয়োজন বা চাহিদার দিকে লক্ষ রাখা হতো না। দেখা যেত, রাতের দুটা–তিনটার দিকে নৌকা বোঝাই করে মাছ নিয়ে বাড়ি ফিরতেন। এসে নারীদের কাঁচা ঘুম থেকে তুলতেন। তাঁরা মাছ দেখে একদিকে খুশি হতেন, অন্যদিকে মাছের আধিক্য দেখে কিছুটা বিরক্তও হতেন। রাতের বেলাতেই তাঁদের মাছ কাটতে হতো। তবে একান্নবর্তী পরিবার থাকায় একটা সুবিধাও ছিল। সবাই মিলেমিশে মাছ কেটে ফেলতেন। আর বেশি বড় মাছগুলো পুরুষেরাই কেটে দিতেন।

মাছের উইজ্জা

বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাস মাছের ডিম পাড়ার সময়। বিশেষ করে বৃষ্টির দিনে মাছেরা ডিম ছাড়ার জন্য দল বেঁধে অল্প পানিতে চলে আসত। এটাকে বলা হতো মাছের উইজ্জা। মাছশিকারিরাও এমন দিনের অপেক্ষায়ই থাকতেন। বোয়াল, গনিয়া ইত্যাদি ডিমওয়ালা বড় বড় মাছ একেবারে পানির ওপরেই ভেসে উঠত। তখন ইচ্ছেমতো মাছ ধরার সুযোগ পেয়ে যেতেন সবাই। দশটা, বিশটা, ত্রিশটা—যে যেমন পারতেন মাছ নিয়ে বাড়ি আসতেন। আবার এমনও হতো যে মাছের পরিমাণ খুব বেশি হয়ে যাওয়ায় এগুলো নেওয়ার জন্য বাড়ি থেকে খবর দিয়ে মাছ নেওয়ার জন্য মানুষ আনতে হতো।
বৈশাখ–জ্যৈষ্ঠ মাসে রাতেই মাছশিকারিরা হাওরে গিয়ে উইজ্জার জন্য অপেক্ষা করতেন। এমনই একটা সময়ের গল্প বলি। এক রাতে মাছ ধরার সরঞ্জাম নিয়ে একজন অপেক্ষা করছিলেন। তখন প্রচণ্ড বৃষ্টি। নিকষ কালো অন্ধকার রাত। বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য মাথায় একটা লম্বা মাতলা (ছাতার পরিবর্তে এগুলো ব্যবহৃত হতো) দিয়ে বসে আছেন। একপর্যায়ে তাঁর একটু ঘুমও এসে যায়। হঠাৎ করেই বেশ ঠান্ডা কী যেন একটা জিনিসের ছোঁয়ার তাঁর ঘুম ভেঙে যায়। মনে হলো তাঁর মাতলার নিচে পিঠ ঘেঁষে খুব ঠান্ডা কিছু একটা কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে। বেশ ভয় পেয়ে গেলেন। কিন্তু মাথা ঠান্ডা রাখলেন। একদম নড়াচড়া না করে তাঁর সঙ্গে থাকা ম্যাচ থেকে একটা দেশলাইয়ের কাঠি বের করে আস্তে করে জ্বালালেন। এরপর তাকিয়ে যা দেখলেন, তাতে তো তাঁর বারোটা বেজে যাওয়ার অবস্থা। একটা বিশাল বড় সাপ মাতলার নিচে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে। এই মহাবিপদেও লোকটা বুদ্ধি হারালেন না। তাঁর মনে হলো, বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য সাপটা মাতলার নিচে আশ্রয় নিয়েছে। তিনি সাপটার ওপর মাতলাটা রেখেই ধীরে ধীরে দূরে সরে গেলেন। সাপটা কোনোরূপ নড়াচড়া না করে চুপটি করে শুয়েই রইল। আর এ সুযোগে তিনি সে রাতে আর মাছ ধরার অপেক্ষায় না থেকে বাড়ি চলে এলেন।

আমাদের এলাকায় দেখেছি, প্রতি গ্রামেই দুই–তিনজন মাছশিকারি ছিলেন। বর্ষাকালে হাওর যখন পানিতে টইটম্বুর, তখন মাছ শিকারের উপযুক্ত সময়। আমার মেজো ভাই ভালো মাছশিকারি। নৌকায় মাছ ধরার বিভিন্ন যন্ত্র নিয়ে হাওরের গভীরে যেতে হতো। শিকারির নৌকা বেয়ে দেওয়ার জন্য একজন সহকারীর প্রয়োজন হতো। ভাই আমাকে সহকারী হিসেবে নিতেন। রুই, কাতলা, মৃগেল ইত্যাদি মাছ গভীর পানিতে জন্মানো ঘাস তাদের খাবার হিসেবে ব্যবহার করত। পানির ওপরের অংশ নয়, তারা খেত ঘাসের বেশ নিচের অংশ। যখনই মাছেরা ঘাসের কোনো অংশ খেতে শুরু করত, তখনই সেই ঘাসের পানির ওপরের অংশটা নড়ে উঠত। কিন্তু ঘাসগুলো সোজাসুজি বা খাড়া থাকত না। স্রোতের কারণে ঘাসগুলো অনেক হেলে থাকত। একমাত্র ভালো শিকারিরাই মাছের অবস্থান বুঝতে পারতেন। শুধু অবস্থান নয়, মাছটা কতটা বড়, এটাও বুঝতে পারতেন। মাছের আকার বুঝেই অস্ত্রটা বাছাই করতেন এবং সেটা যথাযথভাবে প্রয়োগ করতেন। আমার মেজো ভাই এ বিষয়ে বেশ অভিজ্ঞ ছিলেন। আর আমার দায়িত্বটাও কিন্তু কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। যেদিকে মাছটাকে ঘাস খেতে দেখা যেত, সেদিকে নৌকাটা এগিয়ে দিতে হতো কোনো শব্দ না করেই। একটু শব্দ হলেই মাছটা চলে যেত। তাই নৌকা বাইতে হতো অতি সাবধানে। যাহোক, আমরা প্রচুর মাছ মারতাম। ছোট ছোট রুই, গনিয়া ইত্যাদি তো ধরতামই, পাশাপাশি অনেক দিন বড় মাছও ধরতাম। তবে এর জন্য উপযোগী পরিবেশের প্রয়োজন হতো। যেদিন বাতাস থাকত না, সেদিনই মাছ ধরা যেত। তাই আমরা অপেক্ষায় থাকতাম কখন নীরব পরিবেশটা আসবে। বাতাস একটু কমলেই আমরা বেরিয়ে পড়তাম। এমনও হতো, আমরা মাছ ধরার নেশায় সারাটা দিন হাওরে কাটিয়ে দিতাম। কখন বেলা শেষ হয়ে সন্ধ্যা হয়ে যেত, টেরই পেতাম না। মাছও ধরতাম প্রচুর। ছোট–বড় রুই, কাতল, গনিয়া, চিতল—সব মাছ। অবশ্য চিতল ধরার কৌশলটা ছিল ভিন্ন। চিতল মাছ গভীর পানিতে থাকে। নির্দিষ্ট সময় অন্তর শ্বাস নেওয়ার জন্য পানির ওপরে আসে। সাধারণত একই জায়গায় আসে। আমরা লক্ষ করে দেখতাম, ঠিক কোন জায়গায় মাছটা আসে। এরপর একদম কোনো শব্দ না করে নৌকাটা ওই জায়গায় নিয়ে যেতাম। মেজো ভাই মাছ ধরার যন্ত্রটা নিয়ে তৈরি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন। মাছটা হঠাৎ করেই শ্বাস নিয়ে আবার খুব দ্রুত চলে যেত। এর মধ্যেই যা করার করতে হতো। মেজো ভাইয়ের নিশানা সাধারণত মিস হতো না। এর মধ্যেই ঘা মেরে মাছটাকে আটকে দিতেন। মাছটাও ছুটে যাওয়ার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করত। কিছু কিছু মাছ চলেও যেত। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা মাছটাকে ধরে নৌকায় তুলতে পারতাম। বেশ বড় বড় মাছ। কী ভালো যে লাগত, তা বলে বোঝানো যাবে না। সারা দিনটা খাওয়াদাওয়া ছাড়া কীভাবে যে চলে যেত, টেরই পেতাম না। স্বপ্নের মতো ছিল দিনগুলো।

১৯৭১ সাল। বেশ ছোটই তখন। কিন্তু তখনকার সবকিছুই মনে আছে আমার। আমার বেশ মনে পড়ে, একাত্তরের বর্ষাকালে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত হাওরে। আমার বড় ভাইয়েরা নৌকা নিয়ে হাওরে মাছ ধরতে যেতেন। আমি তখন মাছ ধরার কোনো কাজে অংশগ্রহণ করার মতো যোগ্যতা অর্জন করিনি। কিন্তু আমি রোজই তাঁদের সঙ্গে যাওয়ার জন্য বায়না ধরতাম। মাছ ধরা দেখতে আমার খুব ভালো লাগত। আমাকে তাঁরা নিয়েও যেতেন। সারা দিন নৌকায় বসে বসে মাছ ধরা দেখাই ছিল আমার একমাত্র কাজ। তবে আমাকে কঠোরভাবে একটা শর্ত মানতে হতো। কোনো নড়াচড়া না করে বসে থাকতে হতো। শর্তটা বেশ কঠিনই ছিল। তবু মাছ ধরা দেখার নেশায় এটা মানতে আমার তেমন কোনো অসুবিধা হতো না। কিন্তু তখন একটা বিষয় লক্ষ করতাম, কিছুদূর যেতে না যেতেই একটা–দুটা লাশ ভেসে আসত। বেশ দুর্গন্ধযুক্ত লাশ। বড়দের কাছে শুনতাম, এগুলো হানাদার বাহিনীর হাতে শহীদ হওয়া মুক্তিযোদ্ধা বা সাধারণ নিরীহ মানুষের লাশ। লাশের ভেতর দিয়ে বিভিন্ন মাছ আনাগোনা করছে। কী ভয়ংকর দৃশ্য। মনে হলে এখনো গা শিউরে ওঠে। আমার ভাইয়েরা বলতেন, ‘আহারে, কোন মায়ের কোল না জানি খালি হলো।’ এরপর নৌকা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিতেন। একাত্তরে এমন দৃশ্য প্রায়ই চোখে পড়ত।

ছোটবেলায় আমাদের এলাকায় বিভিন্নভাবে এত মাছ ধরার সুযোগ ছিল যে এগুলোর বর্ণনা দিতে গেলে শেষ করা যাবে না। তা ছাড়া আমার মতো একজন সাধারণ মানুষের বর্ণনা যত বড় হবে, পাঠকের বিরক্ত হওয়ার সম্ভাবনাও তত বেশি থাকবে। তাই একাত্তরের আরেক দিনের একটা গল্প দিয়ে এই পর্বের লেখাটা শেষ করতে চাই। যত দূর মনে পড়ে, সময়টা কার্তিক মাস ছিল। মেজো ভাই আমাকে নিয়ে নদীর পাড়ে মাছ ধরতে গেলেন। তখন নদীর পাড়ের কাছ দিয়ে শোল, গজার বড় বড় টাকি ইত্যাদি মাছ যেত। আর ভাই কুচ দিয়ে ঘা দিয়ে এগুলো ধরে চোপড়ায় (বাঁশের বেত দিয়ে তৈরি মাছ রাখার পাত্র) রাখতেন। আমার কাজ ছিল তাঁর সঙ্গে থেকে মাছ ধরার মজাটা উপভোগ করা আর চোপড়াটা বহন করে নিয়ে যাওয়া। কিছুক্ষণ পরেই চোপড়াটা মাছে প্রায় ভরে গেল। আমার পক্ষে আর এটা বহন করা সম্ভব হচ্ছিল না। তখন ভাই এটা একটু সামনে রেখে আসতেন আর আমি এটা পাহারা দিতাম। পাহারা দেওয়ার এক ফাঁকে আমার চোখে পড়ল বেশ বড় একটা ফুটকা মাছ। একটু আগে মাছ ধরতে গিয়ে অপ্রয়োজনীয় বলে হয়তো এটাকে কেউ ফেলে গেছে। আমার হাতে ছিল একটা লাঠি। লাঠি দিয়ে স্পর্শ করামাত্রই এটা ফুলে ছোট একটা ফুটবলের আকার ধারণ করল। আমি লাঠি দিয়ে এটাকে জোরে আঘাত করলাম (ছোটবেলায় ফুটকা মাছ পেলেই সব সময় এই কাজ আমরা সব সময় করতাম)। তখন বড় ধরনের একটা শব্দ করে এটা ফুটো হয়ে গেল।

অনেকটা বোমা ফুটার মতোই শব্দ। একটু আগেই তিনজন সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা যাচ্ছিলেন। তাঁরা ইতিমধ্যেই আমাদের পেছনে ফেলে একটু এগিয়ে গিয়েছিলেন। তখন তো প্রচণ্ড আতঙ্কের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল সময়টা। আর মুক্তিযোদ্ধাদের তো সর্বোচ্চ ঝুঁকি মাথায় নিয়ে চলতে হতো। আওয়াজটা শুনে তাঁরা তিনজনই একসঙ্গে আমার দিকে তাকালেন। আমি বেশ ভয় পেয়ে গেলাম। ভয়ে আমি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকলাম। মাঝেমধ্যে আড়চোখে তাঁদের দিকে তাকাচ্ছিলাম। তাঁরা তিনজন নিজেদের মধ্যে কী যেন কথা বললেন। এরপর চলে গেলেন। আমিও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। মেজো ভাই অবশ্য বিষয়টি একদমই খেয়াল করেননি। তিনি তাঁর মাছ ধরার নেশায় ব্যস্ত ছিলেন। তিনি বিষয়টা লক্ষ করলে আমি যে খুব বকুনি খেতাম, এতে কোনো সন্দেহ নেই। চলবে...

*লেখক: মো. মোতাহার হোসেন, প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত), মোহনগঞ্জ পাইলট সরকারি উচ্চবিদ্যালয়, মোহনগঞ্জ, নেত্রকোনা।

পাঠক থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন