বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

রিকশাওয়ালা বললেন, ‘নাও খুকিরা, চকলেট। খেতে খুব মজা। তোমরা একা দাঁড়িয়ে আছ দেখে ওই যে দেখছ, লোকটার মায়া হয়েছে। নাও, খাও।’
রিমি বলে উঠল, ‘কী যা–তা বলেন! আমরা কি চকলেট খাব বলেছি? নিয়ে যান তো।’
কেয়া ভয়ে আঁতকে উঠে বলল, ‘রিমি, চল বাড়ি চলে যাই। লোকটা আমাদের দিকে আসছে। আমার খুব ভয় করছে।’

রিমি রাগে টগবগিয়ে লাফাতে থাকে। ‘আরে আজ স্কুলে অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেওয়ার তারিখ। তুই চলে যা, আমি স্কুলে যাব।’

কেয়া এদিক–সেদিক না তাকিয়ে দিল বাড়ির দিকে দৌড়। রিমি দাঁড়িয়ে রইল বাসের জন্য একা।

‘এই মেয়ে তোমার নাম কী?’ যুবক মুখে ভিলেনমার্কা হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করে। সকালবেলা অনেকটা নির্জন থাকে রাস্তাটা। আজ একটিও মানুষ দেখা যাচ্ছে না। রিমি তবুও বুকে সাহস নিয়ে বলল, ‘নাম দিয়ে কাজ কী? কী চান আপনি? আপনাকে তো চিনি না।’

‘আমারে কিছুক্ষণ পরই চিনবা’, এটা বলেই রিমির মুখে একটি রুমাল চেপে ধরল যুবক। মুহূর্তেই রিমি বেহুঁশ হয়ে যায়। তারপর কী হয়েছে, সে জানে না।

কেয়া তার বাড়িতে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গিয়ে মাকে ঘটনাটা বলল। রেনুকা আর দেরি না করে রিমির মাকে খবরটা দিতে গেলেন।

‘আপা, রিমির কাণ্ড দেখেছেন! একটা বখাটে ছেলে ওদের উত্যক্ত করছিল চৌরাস্তার মোড়ে। কেয়া রিমিকে এত করে বোঝাল বাড়ি চলে আসতে, সে এল না। কেয়া ভয়ে চলে এসেছে। দেখেন আমার মেয়েটা এখনো হাঁপাচ্ছে।’

কথাটা শুনে রত্নার পিলে চমকে ওঠে। মাত্র ১০ বছরের মেয়ের এত সাহস দেখানোর কী দরকার?

‘রিমি কোথায়, কেয়া?’
রত্না রান্নাঘর থেকে দৌড়ে আসেন।

রিমির বাবা ড্রয়িংরুমে পেপার পড়ছিলেন। চেঁচামেচি শুনে তিনিও বাইরে এলেন।
‘কী হয়েছে, এত হড্ডগোল কিসের?’ রিমির বাবা বাশার সাহেব পুলিশে চাকরি করেন। কিছুক্ষণ আগেই বাসায় এসেছেন ডিউটি থেকে। বেচারা একটু বিশ্রামও নিতে পারেননি।

‘শুনছ, তোমার মেয়ে বখাটেদের সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডা করছে চৌরাস্তার মোড়ে। একটু যাও, আমার মেয়েটাকে নিয়ে এসো। কেয়া এসেছে এইমাত্র। কিন্তু রিমি স্কুলে যাবেই। দেখে এসো, আমার মেয়েটা স্কুলে ঠিকমতো গেছে কি না।’

‘এখনই যাচ্ছি।’ তাড়াহুড়োয় সিভিল ড্রেসেই বের হলেন বাশার সাহেব।
চৌরাস্তার মোড় তো ফাঁকা। কোথাও কেউ নেই। গাড়ি চলছে মাঝেমধ্যে, দুই–একটা আসছে–যাচ্ছে। স্কুলের গাড়ি এসেছে কি? বাশার সাহেব মেয়েকে এদিকে–সেদিক খোঁজেন। না, কোথাও নেই মেয়ে। অগত্যা তিনি রিমির স্কুলের দিকে ছুটলেন।
দারোয়ানকে গেটেই পেলেন।

‘রিমি কি স্কুলে এসেছে?’ বাশার সাহেব খুবই দুশ্চিন্তা করছেন।
‘না, ও তো আজ স্কুলে আসেনি ভাই। আমি তো সবাইকে হ্যান্ড স্যানিটাইজ করে ভেতরে ঢোকাই। রিমিকে তো দেখলাম না।’

দারোয়ানের কথায় যেন বাশার সাহেবের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল।
‘কী বলেন, আমার মেয়ের তো স্কুলেই আসার কথা। আজ কি স্কুলবাস যায়নি?’
‘হ্যাঁ, গিয়েছে তো। সব বাচ্চাকে আমিই তো নামালাম বাস থেকে। সেখানে তো রিমি ছিল না।’

‘ইয়া আল্লাহ, আমার মেয়েটা কোথায় গেল? এখন কোথায় খুঁজব মাবুদ!’ বাশার সাহেব কেঁদেকেটে অস্থির। তিনি যে ডিফেন্সের লোক, এসব এখন এক বাবার কাছে তুচ্ছ বিষয়। কলিজার টুকরা মেয়েটাকে কে নিয়ে গেল? হঠাৎ কেয়ার কথা মনে পড়ে বাশার সাহেবের। দ্রুত তিনি বাড়িতে আসেন কেয়ার কাছে।

‘কোন বখাটে ছেলের কথা বলছিস বল তো? কোনদিক থেকে এসেছে? আমাদের এখানকার নাকি?’

‘আমাদের এলাকার হলে চিনতাম আঙ্কেল। মিষ্টিভান্ডার দোকানের সামনের। গলি থেকে রিকশাটা বের হয়েছিল। সে রিকশাওয়ালাকে দিয়ে আমাদের চকলেট পাঠাল। আমরা খাইনি। ছেলেটা আমাদের দিকে আসছে দেখে রিমিকে বললাম, “আজ স্কুলে গিয়ে কাজ নেই। চল, বাড়িতে চলে যাই। ছেলেটা এদিকে আসছে।” রিমি আমার কথা শুনল না। উল্টো আমি ভীতু বলে বকে দিল। উপায়ন্তর না দেখে ভয়ে আমি বাড়ির দিকে দৌড় দিয়েছি। রিমি ওখানে দাঁড়িয়ে ছিল গাড়ির জন্য।’ কেয়া সবিস্তার বলল।
মেয়েটার এত সাহস দেখানো উচিত হয়নি। আজকালকার ছেলেদের মন–মানসিকতা খারাপের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়েছে। ইন্টারনেটে আজেবাজে ভিডিও দেখে নিজের জীবন নষ্ট করছে। ‘ইয়া খোদা, আমার মেয়েটাকে রক্ষা করো।’ বাশার সাহেব দেরি না করে ইউনিফর্ম কোনোরকম গায়ে দিয়ে গাড়ি নিয়ে বের হলেন। রিমির মা রত্না কান্নাকাটি করে বুক ভাসাচ্ছেন। কোথায় গেল তাঁর একমাত্র মেয়েটা! মুহূর্তেই এলাকার লোকজনের মধ্যে খবর ছড়িয়ে পড়ল। সবাই যে যার মতো রিমিকে খুঁজতে বের হলো।
কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে রিমিকে বড় একটা বাড়ির চিলেকোঠায় পাওয়া গেল। বিরাট বাড়ি, বিরাট গাছপালা ঘেরা রহস্যময় জায়গাটি খুঁজে পেতে দারোগা মহসিন সাহেবের টিমকে বেশ বেগ পেতে হলো। রিমি ‘বাঁচাও, বাঁচাও’ বলে চিৎকার করছিল অনর্গল, যাতে আশপাশের কেউ শুনতে পায়।

সর্বনাশ! ওখানে রিমি একা নয়, আরও বেশ কিছু শিশু আছে, যাদের বয়স আট থেকে দশ বছর হবে। সবার চেহারায় কালো ছায়া। বুঝতে অসুবিধা হয় না কারও, ওদের সঙ্গে কী আচরণ করা হয়েছে। কারও মুখ ফোলা, কারও পায়ে, হাতে, পিঠে নখের আঘাত।
কেমন হায়েনা এরা! এই শিশুদের সঙ্গে এমন যৌনাচার করল কীভাবে? দারোগা মহসিন সব বাচ্চাকে গাড়িতে তুলতে তাঁর টিমকে নির্দেশ দিলেন।

ঘরটির আশপাশে চেক করার জন্য পুলিশ ফোর্সকে তাগাদা দেওয়া হলো, যদি কোনো ক্লু পাওয়া যায়। যে সময় পুলিশ বাড়িটি ঘিরে ফেলেছিল, তখন দুষ্ট শিশু পাচার চক্র বেরিয়ে পড়েছিল। ঘরের ভেতর কেউ আছে কি না, খোঁজাখুঁজি চলমান ছিল।
সব শিশু গাড়িতে উঠল, কিন্তু রিমি কোনোভাবেই ওঠে না। সে ভয়ে গোঙাতে থাকে। পাশে তার মা–বাবা। সে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে।
‘আমাকে ছেড়ে দাও, আমার ভয় করছে।’ কাঁদতে কাঁদতে মেয়েটা পাগলের মতো প্রলাপ বকছিল।

অথচ আজ সকালেও রিমির জীবন ছিল স্বাভাবিক।
‘কী হয়েছে মা? আমরা আছি তো। কোনো ভয় নেই তোমার।’
‘ওরা আসছে, আবার এসে.....’
রিমির কান্নায় দারোগা মহসিনসহ সবার বুঝতে বাকি নেই, রিমির সঙ্গে খুব খারাপ কিছু হয়েছে।

মাত্র ১০ বছর বয়স। কতটুকুই বা বাস্তবতা বুঝেছে সে?
যে ছেলেটা ওকে এখানে নিয়ে এসেছিল, সে ছিল এক দালাল। রিমিকে ওদের হাতে তুলে দিয়েই কেটে পড়েছে।

তবে ওকে ধরতে সময় লাগবে না। রিমি একটু সুস্থ হলেই জানা যাবে কীভাবে, কী হয়েছে।

রাত তিনটা। হঠাৎ রিমির চিৎকার–চেঁচামেচির শব্দ। ‘আমাকে ধরবে না। হাত সরাও দয়া করে।’ হাউমাউ করে কান্নাকাটি। লোকটার সেই বিকট শব্দের হাসিটা যেন কান ফাটিয়ে দিচ্ছে রিমির।

‘রিমি, কী হয়েছে মা? এমন করে না মা। সব ঠিক হয়ে যাবে।’ মেয়ের গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে একসময় সে কোনোরকম বালিশের একপাশে মাথা রাখে।
এমন করে কত কিশোরীর জীবন ধ্বংস হচ্ছে, তা কে খবর রাখ! কেবল ভুক্তভোগী মানুষই বোঝে এই জ্বালার মাত্রা কত তীব্র লেলিহান শিখার মতো।

পরদিন সকালে রিমিকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান তার মা। শরীরের কয়েকটা জায়গায় ক্ষতচিহ্ন। হয়তো মেয়েটা আত্মরক্ষার চেষ্টা করেছে।

ভিসেরা পরীক্ষার ফলাফল পেলেই ডাক্তার একটা সিদ্ধান্ত দেবেন। এখন আপাতত ঘুম দরকার রিমির। প্রয়োজনে তাকে কয়েক দিনের জন্য সমুদ্রপাড়ে ঘুরিয়ে আনতে পরামর্শ দিলেন ডাক্তার।

বাশার সাহেব খুবই চিন্তায় পড়লেন। সেই ছেলেকে বিশেষ অভিযানে পুলিশ গেপ্তার করেছে। ওর সামনে দাঁড় করালে রিমি চিনবে কি না, এখন সেই দুশ্চিন্তায় পড়েছে সবাই। রিমি খুব অসুস্থ।

দারোগা মহসিন ওই দালাল ছেলেকে জেলে ভরে রামধোলাই দিয়ে হাত–পায়ের ভালোই ব্যায়াম করলেন। এতটুকু বাচ্চাগুলোকে নিয়ে কতই না ছিনিমিনি খেলছে এরা!
‘এবার বল, তুই কেন এত অল্প বয়সে এসব অপরাধমূলক কাজে জড়ালি? কিসের অভাবে? কাউকে কিছু বলেছিলি যে অভাবে তোর স্বভাব নষ্ট হয়েছে?’
ছোকরা এত পিটুনি খাওয়ার পরও মুখ খোলে না। দারোগা সাহেব ওকে আগে থেকেই চেনেন মনে হয়। যেসব কথা জিজ্ঞেস করছেন উনি; এগুলো ঘরের মানুষদের জানার কথা।

বারবার জেলে আসা আসামি সম্পর্কে পুলিশের ভালো অভিজ্ঞতা থাকা স্বাভাবিক।
রিমিকে ছেলেটার সামনে আনার পর যে দৃশ্য দেখল সবাই, তাতে রীতিমতো ভীমরতিতে পড়ে গেল।

রিমি ছেলেটাকে এলোপাতাড়ি মারতে মারতে একসময় নিজেই ক্লান্ত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। ওর রাগ নিবারণের সুযোগও দিয়েছে পুলিশ। হয়তো ট্রমাটাইজ হয়ে যাওয়া রিমিকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে এই ঘটনা সাহায্য করবে।

রিমিকে ধরাধরি করে সোজা বাসায় নিয়ে যাওয়া হলো। বিকেলে ভিসেরা রিপোর্ট আসবে। কী হয় আল্লাহ জানেন! রিমির মা রত্না একাই ডাক্তারের কাছে গেলেন, যাতে কেউ টের না পায়। হাজার হোক মেয়েটা তো নিজের।

ভিসেরা রিপোর্টে রিমিকে ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে। মায়ের দুশ্চিন্তা আরও বেড়ে গেল। কী হবে এখন? মেয়ে তাঁর খুবই আপসেট। সমাজটা কবে সুস্থ হবে, কে জানে। একটা বাচ্চা মেয়ের এমন নাজুক হাল কেউ করে! বেচারি কাঁদতে কাঁদতে পাগল হওয়ার জোগাড়। রিমি চুপচাপ। কখনো কথা বলে, আবার কখনো খুব খেপে যায়। অল্প বয়সে এত বড় ধাক্কা সে নিতে পারছে না। ডাক্তার বলেছে, ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠবে।
দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারে আসামিদের ফাঁসির রায় হয়। অভিযুক্ত ব্যক্তিরা এক এক করে ধরা পড়ে সিআইডি পুলিশের অক্লান্ত পরিশ্রমে। রিমির দেওয়া তথ্য আর আস্তানা দুটোতেই যথেষ্ট তথ্য–প্রমাণাদি ছিল।

রিমি এখন অনেকটা সুস্থ জীবনে ফিরেছে। মেয়েটা ভাগ্যগুণে বিরাট ক্ষতির হাত থেকে বেঁচে গেছে। হয়তো গুম করে ফেলত, না হয় পাচার করত অন্য দেশে অথবা কিডনি নিয়ে মেরে ফেলত। কিছু ঘটার আগেই রিমির চাতুর্যে নিজেও বেঁচে গেল আর সঙ্গের অন্য শিশুরাও তাদের মা–বাবার কোলে ফিরে গেল। বিপদে মানসিক শক্তি হারাতে নেই। তবে শঙ্কায় থাকা রিমি এখনো ঘরের পুরুষ মানুষ ছাড়া বাইরের কাউকে দেখলে চরম ভয় পায়। ভয়ে গোঙাতে থাকে। হয়তো এই আতঙ্ক থেকে রিমির মতো মেয়েদের কখনোই মুক্তি হবে না। কী বীভৎস অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছে সেই শিশুসন্তানেরা! রত্না মেয়েকে দেখে কাঁদেন আর মনে মনে বলেন,
‘এই পৃথিবী শিশুদের তরে নিরাপদ হোক,
আসুক অবারিত শান্তির বারতার সুখ।’

*লেখক: পারভীন আকতার, শিক্ষক ও শিশুসাহিত্যিক।

পাঠক থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন