বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সুমনা এমন পাগলপারা হয়ে গেছে, আশপাশের কিছুই তখন মাথায় নেই।
খিলখিল হাসিতে সুমনার সংবিৎ ফিরল। চোখ খুলে সুমনা বেশ লজ্জাই পেল। প্রায় ঘেঁষা পাশের বিল্ডিংয়ে এক ছেলে হাসছে। না জানি সুমনাকে সে পাগল ভাবছে কি না। ইশ্‌, মাঝেমধ্যে কী যে হয় আমার। মনে মনে সুমনা নিজে বকা দিল।

ছেলেটা হাসতে হাসতে হঠাৎ উধাও হয়ে গেল। অনেকক্ষণ উঁকিঝুঁকি দিল সুমনা। নাহ্! ছেলেটার আর দেখা নেই। অগত্যা সুমনাও হালকা বৃষ্টিভেজা আমেজ নিয়ে বাসায় চলে গেল।

রাত্রিবেলা বৃষ্টি আরও চেপে এল। পরদিন সকালে বাসার সামনে হাঁটুপানি। সুমনার আজ পরীক্ষা। যেতেই হবে কলেজে। কোনো গাড়িও নিচ্ছিল না। কারণ, গাড়িগুলো যাত্রীতে ভরা। এক রিকশাওয়ালার দয়া হলো। সুমনা দরদাম না করেই তড়িঘড়ি রিকশায় উঠে পড়ল।

‘ভাই, একটু তাড়াতাড়ি প্যাডেল মারেন। আমার খুব দেরি হয়ে গেছে। মাত্র আধঘণ্টা বাকি পরীক্ষার।’ সুমান তাগিদ দিল রিকশাওয়ালাকে।

‘টেনশন করিয়েন না, আপা। আমি ১৫ মিনিটে আপনাকে কলেজে পৌঁছে দিব। আগে আমি কার চালাতাম। করোনায় সব এলোমেলো হয়ে গেল। চাকরি না পেয়ে পেটের দায়ে এখন রিকশা চালাই। আমি ইন্টার পাস ছেলে, আপা।’ রিকশাওয়ালা তার কথা বলছে।

default-image

‘সেকি, আপনি রিকশা ছেড়ে গার্মেন্টসে কাজ করুন। এখন এগুলো খুলে দিয়েছে।’ সুমনার মন খুব নরম ও দয়ালু। ওর খারাপ লাগছে—একজন শিক্ষিত ছেলে রিকশা চালিয়ে সংসার চালায়।

একটু যেতেই রিকশাওয়ালাকে ডাক দিল একটা ছেলে। প্যান্ট হাঁটু পর্যন্ত গোঁজা। জুতা হাতে বৃষ্টিতে ভিজছে। রাস্তায় অথই পানির ঢেউ। মনে হচ্ছে নদী।

আরে, এই তো সেই ছেলে! কাল ছাদে সুমনার পাগলামি দেখে হাসছিল। সুমনা রিকশাওয়ালাকে দাঁড়াতে বলে। ‘উঠুন, গাড়ি আর নাই। আসুন, শেয়ার করে চলে যাই।’ সুমনা পানি থেকে ছেলেটাকে টেনেই তুলল। পানির ভেতর ভিজে একশা।

‘অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে। আজ কী যে বিপদে পড়েছি। এদিকে অফিসেরও দেরি হয়ে গেল।’ ছেলেটা রুমাল দিয়ে হাত–পা মুছে কোনোরকম একটু নিজেকে শুকানোর চেষ্টা করছে।

‘ধন্যবাদ দেওয়ার কিছু নেই। মানুষ মানুষের জন্য।’ সুমনা ছেলেটাকে আশ্বস্ত করল।

‘ঠিক বলেছেন আপা। মানুষের মাঝে আজকাল মানবিকতাবোধ কদাচিৎ দেখা মেলে।

মানুষ খুবই স্বার্থপর হয়ে উঠছে দিন দিন। আমার মা হাসপাতালে। কিডনি নষ্ট। অপারেশনের জন্য লাখ টাকা লাগবে বলছে ডাক্তাররা। অথচ তারা দেখছে আমি রিকশা চালিয়ে মায়ের চিকিৎসা করাতে পারব না। একটুও ছাড় দেয় না কেউ।’ রিকশাওয়ালা মাসুদ দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।

‘দুঃখ করবেন না। আল্লাহ সহায় হবেন। আপনার ফোন নম্বর দিন আমায়। আমি দেখি বন্ধুবান্ধবকে বলে কিছু টাকা জোগাড় করে দেব।’ সুমনার সহযোগী মনোভাব দেখে এবার পাশে বসা ছেলেটা মুখ খুলেছে। এতক্ষণ চুপচাপ ছিল সে।

‘আপনার নাম কী, তা জানতে পারি? আমি তারেক হাসান। পেশায় ব্যাংকার। জনতা ব্যাংকে জব করি।’ ছেলেটার কথায় চমকে যায় সুমনা।

‘আমি সুমনা। অনার্স থার্ড ইয়ার কেমিস্ট্রিতে পড়ি। আজ আমার পরীক্ষা সকাল ১০টায়। আর মাত্র ২০ মিনিট পর। দোয়া করবেন। আপনার সঙ্গে পরিচিত হয়ে ভালো লাগল। আমার বাবাও ব্যাংকার। আপনাদের ব্যাংকেই আছেন। ঢাকার উত্তরা শাখায়।’ সুমনা নিজের পরিচয় দিয়ে পরীক্ষার জন্য ভাবছে। ঠিক সময়ে পৌঁছাতে হবে তাকে।

‘ওহ্‌ তা–ই! তাহলে তো ভালো হলো আপনার সঙ্গে পরিচয় হয়ে। কালকের ঘটনার জন্য সরি। আসলে আপনি এত মজা করে বৃষ্টিতে ভিজেচ্ছেন, আমার খুব ভালো লেগেছে। তাই হাসছিলাম। অন্যভাবে নেবেন না বিষয়টা। একদিন আসুন আমাদের বাসায়।

default-image

আমার মা, বাবা, ভাই, বোন—সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব। আপনার ভালো লাগবে আশা করি। আমার বোন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। বেশ মিশুক সে। একদিন আসেন চায়ের আড্ডা হয়ে যাবে।’ তারেকের কথা বেশ সাবলীল। দেখতেও তেমন খারাপ নয়। সুদর্শন আর স্মার্ট। সুমনার কালকে থেকে আজকে আরও ভালো লাগছে ছেলেটাকে। বেশ ছটফটে স্বভাবের ছেলে সুমনার বরাবরই খুব পছন্দ।

‘ঠিক আছে। আমি একদিন আমার মাকে নিয়ে যাব। আসলে বাসায় একা একা আমার মা বিরক্ত হয়ে যান। আপনার মায়ের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলে ওনারা মাঝেমধ্যে গল্পগুজবে সময় কাটাবেন।’ সুমনার ঝরঝরে কথা তারেকেরও ভালো লাগল।

‘দেখেন আপা, মানুষের উপকার করেছেন। এখন একজন ভালো বন্ধু পেয়ে গেলেন। এ জন্যই মানুষের উপকার করা দরকার।’ রিকশাওয়ালার কথাটা বেশ মনে ধরল তারেকের।

বন্ধু! সুমনা আমার বন্ধু হবে! বেশ ভালো হবে। মনে মনে তারেক বন্ধুত্বের প্রপ্রোস করছে সুমনাকে। মুখে বলতে লজ্জা লাগছে। মেয়েটা অনেক কিউট, সুন্দরী। কিন্তু শিক্ষার্থী। তাই তারেক বেশি আগ্রহ দেখাল না। পাছে তার পড়ালেখার ক্ষতি হয়।

‘আমরা কি বন্ধু হতে পারি?’ রিকশা থেকে নেমে হঠাৎ সুমনার কথাটা শুনে বেশ ভালো লাগল তারেকের।

‘কেন নয়? আপনি আমার বন্ধু হলে আমিও আপনার মতো উদার, হৃদয়বান হতে শিখব।’ হাসতে হাসতে তারেক মিষ্টিমাখা কথায় সুমনার ফিদা একেবারে।

‘ওকে, আজ আসি।’ সুমনা মুচকি হেসে বিদায় নিল। তারেক কলেজের গেটে নামিয়ে দেয় সুমানাকে। আর বারবার পেছন ফিরে তাকায়। আজ অনেক বড় উপকার করল মেয়েটা। সঙ্গে একজন ভালো বন্ধুও পেয়ে গেল।

মাসখানেক পর শপিংমলে তারেকের সঙ্গে ফের দেখা। ছাদে খুব কম ওঠা হয়েছে সুমনার আজকাল। পড়ার টেবিল ছেড়ে কোথাও যাওয়ার সুযোগ ছিল না। ফাইনাল পরীক্ষা বলে কথা। শেষ পরীক্ষা দিয়ে মাকে নিয়ে শপিং করতে গিয়েছিল সুমনা।

কসমেটিকস ব্র্যান্ডের কিনতে হবে। পাড়ার ছোটখাটো দোকানে পাওয়া যায় না এসব। তা ছাড়া স্ক্রিনের জন্য সবচেয়ে ভালো জিনিসটা ব্যবহার করা উচিত। সুমনার মা সেদিকে খুবই খেয়াল রাখেন।

‘কেমন আছেন,’ বলে সুমনা তারেককে দেখে খুশিতে হ্যান্ডশেকের হাত বাড়ায়।

‘ভালো আছি,’ তারেক সুমনার মাকে দেখে ওনাকেই আগে কুশল বিনিময় করে। হাতটা সে বাড়ায়নি!

সুমনা একটু মনঃক্ষুণ্ন হলেও মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা দেখে অন্য রকম ভালো লাগল তার।ছেলেটা আসলেই ভালো ও অমায়িক।

ভালো আছি বাবা, হাসিমুখে জবাবের সঙ্গে সঙ্গে সুমনার মা ইশারায় সুমনাকে ছেলেটা কে জিজ্ঞেস করল।

মা, উনি আমাদের পাশের বিল্ডিংয়ে থাকেন। নাম তারেক, ব্যাংকার। বাবার অন্য ব্রাঞ্চের জুনিয়র কলিগ।

‘ওহ, তাই! খুব ভালো।’ কথার ফাঁকে সুমনার মা ফের ছেলেটাকে ভালো করে দেখে নিল। বেশ ভদ্র, স্মার্ট।

‘বাবা, তোমার বাসায় কে কে আছেন? মা–বাবা আছেন?’ সুমনার মা এবার পাত্র খোঁজার সুযোগ হাতছাড়া করল না। খোঁজ লাগাতেই হবে। মেয়েকে বিয়ে তো দিতেই হবে আজ না হোক কাল।

‘সবাই আছেন আন্টি। সুমনাকে বলেছি একদিন আপনাকে নিয়ে বেড়াতে আসতে। সে তো আর আমার খোঁজ রাখে না। ভাগ্যিস আজ দেখা হলো!’ সুমনার ডাগর চোখের দিকে তাকিয়ে এমন করে কথাগুলো বলছিল, সুমনা খুব লজ্জাই পেল। আসলে একটিবার ফোন দেওয়া উচিত ছিল।

‘আমার ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হয়েছে গতকাল। দম ফেলার সময় ছিল না। যাক, আজ দেখা হয়ে ভালোই হলো।’ সুমনার ফ্রেশ মুড মায়ের চোখ এড়াল না।

বড্ড খুঁতখুঁতে স্বভাবের এই মেয়েকে জীবনে কারও সঙ্গে সেধে কথা বলা দেখলেন তিনি এই প্রথম। মেয়েটা ঠিক তার বাবার ডুপ্লিকেট।

‘সুমনা, তোমার কি মনে আছে সেই রিকশাওয়ালার কথা? দেখো, ওকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরছি।’ তারেক সারপ্রাইজ দিল যেন।

‘সালাম আপা, কেমন আছেন?’ ওমা তাই তো!

সুমনা চমকে গেল হঠাৎ। ‘আরে, ওকে কোথায় পেলেন?আমি তো ওর মায়ের জন্য চিকিৎসার টাকা জোগাড় করেছি কিছু। ভালোই হলো।’

‘এই ধরো, ব্যাগে তোমার মায়ের টাকা নিয়ে ঘুরছি আজ অনেক দিন। কী খবর তোমার মায়ের?’ সুমনা টাকাগুলো রিকশাওয়ালা মাসুদকে গছিয়ে আমানত রক্ষার দায়িত্ব শেষ করল যেন। সুমনার মা মেয়েকে নিয়ে মনে মনে গর্ব করল। চ্যারিটি করা ওনারও খুব পছন্দের কাজ।

‘আপা, মাকে কয়েক দিন হলো বাসায় এনেছি। আবার কেমো দিতে হবে এক মাস পর। আপনাকে খুশির খবর দেব। আমার একটা ভালো মাইনের চাকরি জোগাড় করে দিয়েছেন তারেক ভাই। সংসারে মা আর আমি। ভাবছি গরিব ঘরের একটি অল্প শিক্ষিত মেয়েকে বিয়ে করে ঘরে তুলব। মায়ের দেখাশোনা করার লোক তো নেই। আপনারা যদি আমাকে একটু সহায়তা করতেন, তাহলে আমার মায়ের একজন সার্বক্ষণিক সঙ্গী পেতাম।’ মাসুদের চোখ পানিতে টলমল করছে। কথাগুলোতে কতটা কঠিন বাস্তবতা লুকিয়ে আছে, তা সবারই জানা।

সুমনার মা বললেন, ‘চিন্তা কোরো না, বাবা। আমি তোমার এই দায়িত্বটা নিলাম। আগামী সপ্তাহে তোমাকে বিয়ে দিয়েই ছাড়ব আমি।’

মাসুদ আর সুমনার মা কিছুক্ষণ একাকী কথা বলছেন সব তথ্য নেওয়ার জন্য। বিয়েশাদির বিষয়। সত্যতা যাচাই-বাছাইয়েরও ব্যাপার আছে।

‘এই যে, আজকাল ছাদ কি ভুলে গেলে? প্রতিদিন নিয়ম করে তোমাকে একপলক দেখার জন্য মন উচাটন হয়ে ছাদে দৌড়ায়। কী করব বলো?’ সুমনার দিকে নয়, এবার শপিং মলের ছাদেই তাকিয়ে তারেক দীর্ঘশ্বাস ফেলছে।

‘ফোন নম্বর কি হারিয়ে ফেলেছিলেন? একটিবারও কল করার ইচ্ছা হয়নি? আমি কেমন আছি, কেন ছাদে দেখা নেই—এসব ভেবেও তো মানুষ খোঁজ নেয়।’ সুমনার কণ্ঠে অভিমান।

‘ফোন করে প্রেমের মজা, আকুতি নষ্ট করতে চাইছিলাম না। এভাবেই দেখা হবে জানতাম একদিন। ভালোবাসা সৃষ্টি হয়েছে কি না দুজনের মাঝে—এখন এই শপিংমলও জানতে পেরে গেছে, ম্যাম।’ তারেক একঝলক হাসল আর সুমনা বেহুঁশ!

মানুষের কথা বলার ধরন এত মিষ্টি আর পরিশীলিত হয়, সুমনার জানা ছিল না। মনে মনে সে অনেক আগেই তারেকের প্রেমে পড়েছিল। তবু কন্ট্রোল, পারসোনালিটি বজায় রাখা চাই। কিন্তু সব তো ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে! আজ আর ঘুম হবে না। তারেকের চেহারা চোখে ভাসতে থাকবে।

‘এই, তোমার কী হলো, কোথায় হারালে?’ তারেক হাতের স্পর্শ দিলে আবার কেমন যেন হয়ে গেল সুমনা। জীবনে এই প্রথম কোনো ছেলের হাত নিজের মনে হলো তার।

‘কাল ছাদে দেখা হবে। এখন আসি।’ সুমনা মুচকি হেসে দৌড়ে মায়ের কাছে চলে গেল।

‘এই দাঁড়াও, পড়ে যাবে তো!’ তারেকের মনটা আজ থেকে সুমনার কাছেই আমানত রইল।

কনে দেখার পর্ব শেষ। আজ মাসুদের বিয়ে। তারেকের বাসায় ছোট্ট পরিসরে আয়োজন। তারেকই সব খরচ বহন করছে। সুমনার বাবা দিতে চাইলেও কিছু নেয়নি সে।

রুবি মাসুদের হবু বউ। সুমনাদের গ্রামের বাড়ির এলাকার মেয়ে। খুবই ভদ্র। এসএসসি পর্যন্ত পড়েছে। মাসুদের চাওয়ার চেয়েও ভালো মেয়ে, পরিবার পেয়েছে সে। তবে সব কৃতিত্ব সুমনার মায়ের। উনিই রুবিকে ছোটবেলা থেকেই নিজের কাছে রেখে পড়াশোনা করিয়েছেন। যোগ্য ও ভালো ছেলে তার কপালে আছে বটে। মাসুদ মায়ের একমাত্র ছেলে। খুবই মা–ভক্ত। তারেক–সুমনার পরিবারের এখন সেও সদস্য।

হালকা কমলা রঙের শাড়ির সঙ্গে শিউলি ফুলের তোড়া খোঁপায়—অপরূপ সুন্দরী এ কাকে দেখছে তারেক! শুধু সে নয়, তারেকের মা, বাবা, ভাই, বোনও হাঁ করে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ সুমনার দিকে।

তারা কিন্তু জানেই না এই মেয়েই সেই ছাদে দেখতে যাওয়া তারেকের পছন্দের মেয়ে। আজই প্রথম দেখল সবাই। তারেক বাকরুদ্ধ! নিজেকে বড্ড বেমানান লাগছে সুমনার পাশে! তারেক আফসোস করল, ইশ্‌, আরও আগে কেন ছাদে গেলাম না! আজ থেকে ওকে ছাড়া থাকাটাই মুশকিল হবে! হঠাৎ তারেকের অস্থিরতা মাসুদ বুঝতে পারে। সবাই যে যার কাজে ব্যস্ত। সুমনার কমলা রঙের লিপস্টিক মারাত্মক আকর্ষণ করছে সবাইকে।

মাসুদ এক টানে তারেক ভাইয়াকে আড়ালে নিয়ে গেল। কী যেন পরামর্শ করল।

‘কিন্তু কীভাবে সম্ভব এটা মাসুদ? কেউ মানবে না এই মুহূর্তে। সুমনাও না।’ তারেককে আরও বিচলিত দেখাল। এবার আর কারও চোখ এড়ানো সম্ভব হলো না। একেক করে সবাই বলছে, কী হয়েছে? অসুস্থ নাকি? সুমনা আর বসে থাকতে পারল না।

‘এই, কী হয়েছে তোমার? এত বিচলিত কেন? অসুস্থতা ফিল করছ না তো? কী সমস্যা?’ সুমনার লাস্যময়ী চেহারা তারেককে আরও যেন ক্রাশ করে ফেলেছে।

সে সুমনার হাতটা ধরে ওপরে ছাদে নিয়ে গেল। সবাই থ বনে গেল। ‘কীরে, কী হচ্ছে এসব।’ সুমনার মা কিন্তু মুচকি হাসছেন। যদি ওরা আজই এক হতে চায়, তবে ওনার কোনো আপত্তি নেই। পরে নাহয় ঘটা করে বিয়ের অনুষ্ঠান হবে। দুটি আত্মা এক হওয়ার আকুতি ব্যত্যয় হতে তিনি দেবেন না।

সুমনার মায়ের মাসুদের কথা শুনে বুঝতে বাকি নেই কী ঘটতে যাচ্ছে। তিনি তারেকের পরিবার ও নিজ পরিবার নিয়ে হুট করে ভেতরের রুমে চলে গেলেন। অবশেষে সবাই হাসিমুখে বের হলেন। মাসুদও অনেকটা স্বস্তি পেল। যাক, একটা অন্তত, আজ উপকারের সুযোগ হলো।

ছাদে সুমনাকে নিয়ে গিয়ে তারেক আর নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারল না। সুমনাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘তোমাকে ছাড়া আর একটা মুহূর্তও থাকতে পারব না, সখী। আজই আমরা বিয়ে করব। আমি ভীষণ রকম ডিপ্রেসড। তোমাকে আজ আমার বুকে চাই-ই চাই।’

তারেকের কথায় সুমনা আকাশ থেকে পড়ল যেন।

‘এই, কী বলছ! কেউ কি মেনে নেবে হুট করে, পাগল! সবার সামনে টেনেহিঁচড়ে কি এই কারণে নিয়ে এলে? তোমার ইমোশানের লা–জওয়াব!’

‘মা ছাড়া বাকিরা এই বিষয়ে জানে না। সবাইকে ম্যানেজ করার সময় তো দাও। মাসুদ–রুবির বিয়ে আজ। ওটা শেষ হোক। তারপর পারিবারিকভাবে আমরা বিয়ে করব।’ সুমনা তারেকের বুকে মাথা রেখে চোখ বুঁজে কথাগুলো বলছিল।

‘না, না, এত সময় আমার সইবে না। আমার ধৈর্যচ্যুতি হয়ে গেছে, ম্যাম। অসুস্থ হয়ে পড়ব, তখন বুঝবে। তোমারই কষ্ট বাড়বে। আমি পারব না বলছি, পারব না।’ তারেক অস্থির।

‘এবার তো ছাড়ো। কেউ এসে দেখে ফেলবে তো।’ সুমনা মুখ থেকেই কথাগুলো বলছে, মন থেকে নয়। পেছন থেকে সুমনার মা দরজায় ঢোকা দিলেন।

‘এসো, নিচে। তোমাদের বিয়ে আজ। দ্রুত এসো। সবাইকে আমি ম্যানেজ করেছি। পরে অনুষ্ঠান হবে।’ ওদের এ অবস্থায় নিচের দিকে তাকিয়ে সুমনার মা কথাগুলো বলে দ্রুত চলে গেলেন।

তারেক আর সুমনা দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে সেকি সুখের, মিলনের কান্না। সুমনার মাও ওদের আনন্দাশ্রুর ভাগীদার হলেন। কাঁদতে কাঁদতে তিনিও সিঁড়ি ভাঙছেন—এত আদর করে বড় করা পোষা ময়না পাখি সুমনাকে আজ অন্যের ঘরে ছেড়ে দিয়ে যেতে হবে! এটাই যেন নিয়ম জগৎসংসারের। সুমনা-তারেকের কপাল জোড়া লাগছে, সবকিছু কেমন যেন স্বপ্নের মতো মন হচ্ছে। অথচ আজ বিয়ে মাসুদ-রুবির।

বিয়েবাড়িতে হুট করে মানুষের আনাগোনা বেড়ে গেল। তারেকের অফিস স্টাফ, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজনকে ফোনেই খবর দেওয়া হলো। সুমনারও একই ব্যাপারস্যাপার। সুমনার বাবা খুব খুশি। তিনি মেয়ের জন্য যোগ্য পাত্র পেয়েছেন।
মাসুদ আর রুবিকে সুমনার রুমেই বাসর দেওয়া হলো। মাসুদ রিকশাওয়ালা হয়ে ব্যাংকারের বাসায় বাসর করছে। সততা আর লক্ষ্যে অবিচল থাকলে, মা বাবার দোয়া থাকলে জীবনে অসম্ভবও সম্ভব হয়ে ওঠে।

তারেকের রুম আজ থেকে সুমনার দখলে। নিখাদ ভালোবাসা নদীর মতো। ঢেউয়ের পর ঢেউ বুকে টেনে নেয়। তাদের ভালোবাসা ময়ূরাক্ষী নদীর মতোই। প্রগাঢ় ভালোবাসার ঢেউ কেউ কাউকে একটি মুহূর্তের জন্যও ছাড়তে দেয়নি। অবিচল প্রবাহিত প্রেমের ছলাৎ ছলাৎ ঢেউ যেন নোঙর ফেলছে ভালোবাসার ময়ূরাক্ষী নদীতে।

পাঠক থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন