বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বাইডেনের গণতান্ত্রিক সম্মেলনের দ্বিচারিতা এবং ভূরাজনৈতিক লক্ষ্যমাত্রার বিষয়টি অনেক বিশ্লেষণেই ফুটে উঠেছে। অতিথিদের সম্মেলনে আমন্ত্রণের ক্ষেত্রে বাইডেন প্রশাসন ‘পিক অ্যান্ড চুজ’ পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। তাদের নিজস্ব মানদণ্ডের ভিত্তিতে আমন্ত্রণ জানানোর কারণেই ‘চীনঘেঁষা’ অনেক রাষ্ট্রকেই সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। অনেক ক্ষেত্রেই, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডগুলোকে উপেক্ষা করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ তুরস্ক ও কঙ্গোর কথা বলা যেতে পারে। ডেমোক্রেসি ইনডেক্সে তুরস্ক ও কঙ্গোর তুলনায় ৬২ ধাপ এগিয়ে থাকা সত্ত্বেও তুরস্ককে সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।

অন্যদিকে সাংবাদিক দেবাশীষ রায় চৌধুরী টাইম ম্যাগাজিনের কলামে সম্মেলনের আরেকটি দ্বিচারিতার বিষয় তুলে ধরেছেন। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট বলসোনারো, ফিলিপিনের রদ্রিগো দুতার্তে কিংবা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মতো ‘পপুলিস্ট’ বা জনতুষ্টবাদী নেতারা মানবতা ও গণতন্ত্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকার প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও সম্মেলনে আমন্ত্রণ পেয়েছেন। অন্যদিকে হাঙ্গেরির প্রেসিডেন্ট অর্বান কিংবা তুরস্কের এরদোগানের মতো নেতাদের সম্মেলনের অতিথি তালিকায় রাখা হয়নি। তিনি আরও মনে করেন, এ ধরনের পিক অ্যান্ড চুজের পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ। এ ছাড়া আমন্ত্রণ পাওয়ার পরও তাইওয়ানের অংশগ্রহণের প্রশ্নে পাকিস্তানের যোগদান থেকে বিরত থাকার বিষয়টি এই সমালোচনাকে আরও বেগবান করেছে। উল্লেখ্য, চীন ছাড়া রাশিয়া ও ইরানকেও এই সম্মেলনে উপেক্ষা করেছেন বাইডেন।

অন্যদিকে নতুন করে আরোপিত নিষেধাজ্ঞাসংক্রান্ত বিষয়ের বিশ্লেষণে দেখা যায়, এখানেও যুক্তরাষ্ট্র ‘পিক অ্যান্ড চুজ’ নীতি গ্রহণ করে। এ কথা অস্বীকারের সুযোগ নেই, একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বব্যপী মানবতার অবক্ষয় ঘটেছে এবং আন্তর্জাতিক বিষয় হিসেবে গণতন্ত্র এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের বিপক্ষে দাঁড়ানোর সুযোগ সবারই রয়েছে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার দিকে তাকালে দেখা যায়, নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রে ভূরাজনৈতিক স্বার্থও ‘পিক অ্যান্ড চুজ’–এর ক্ষেত্রে কাজ করেছে। আরোপিত নিষেধাজ্ঞার বেশির ভাগ লক্ষ্যই ছিল তথাকথিত ‘চীনঘেঁষা’ এবং চীনা অর্থায়নে ঝুঁকে যাওয়া দেশগুলোর ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। এসব দেশ ও ব্যক্তির বাইরেও বিশ্বের নানা প্রান্তে মানবতাবিরোধী অপরাধ হলেও সেসব ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র নীরব ভূমিকা পালন করছে। উদাহরণস্বরূপ, ইয়েমেনে চলমান সংঘাত ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘনের জন্য সৌদি বা সৌদিপন্থী জোটের কাউকে কোনো নিষেধাজ্ঞা না দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা যেতে পারে।

খোদ বাইডেন প্রশাসনের আমলেই যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, নিজ স্বার্থের বিপক্ষে কোনো ইস্যু এলে যুক্তরাষ্ট্রই মানবাধিকারের তোয়াক্কা করেনি। আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের সময় এবং পরবর্তীকালে চলমান খাদ্যসংকটের চিত্র গোটা বিশ্বই দেখেছে। আফগানিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ব্যর্থ চেষ্টার পর গোটা দেশকে মৌলবাদীদের হাতে তুলে দেওয়ার পেছনে তাদের প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ইয়েমেনে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘনের নেপথ্যে থাকা তার মিত্র সৌদি আরবের কাছে নতুন করে প্রায় সাড়ে ৬০০ মিলিয়ন ডলারে মিসাইল ও লঞ্চার বিক্রি করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরব কিংবা ইসরায়েলের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই নীরব থেকেছে। এমনকি ২০ বছর ধরে, ৯/১১ পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র নিজ স্বার্থে ড্রোন হামলা, টার্গেট কিলিং এবং গুয়ানতানামোর মতো গুপ্ত কারাগারের মাধ্যমে ক্রমাগত মানবাধিকারের লঙ্ঘন করেছে। তাহলে প্রশ্ন জাগে, তবে এখন কেন বিশ্বে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং মানবতা ছড়ানোকে যুক্তরাষ্ট্র এত গুরুত্ব দিচ্ছে? উত্তরের খোঁজে আমাদের দৃষ্টি দিতে হবে বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব বিস্তারের দিকে।

চলমান বিশ্বরাজনীতিতে গত দশকের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনসমূহের একটি চীনের উত্থান। চীনের উত্থানের পর থেকেই, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দ্বন্দ্ব এবং প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। চীনের সঙ্গে ইরান কিংবা রাশিয়ার মতো যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধী শক্তিগুলোর যথেষ্ট ভালো সম্পর্ক রয়েছে। উপরন্তু ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চায়নার ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি এবং চায়নার বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) ব্যাপক বিস্তার যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদেশগুলোকে চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। এর ফলে কোয়াড, অকাস এবং ‘ফ্রি অ্যান্ড ওপেন ইন্দো-প্যাসিফিক ডকট্রিন’সহ (এফওআইপি) নানা ভূরাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক জোটের উত্থান হয়েছে। এদের মূল লক্ষ্য ক্রমবর্ধমান চীনা প্রভাবকে রোধ করা এবং নিজেদের প্রভাবকে বিশ্বরাজনীতিতে মুখ্য অবস্থানে রাখা।

কিন্তু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নব্য এ স্নায়ুযুদ্ধের দুই পক্ষের মধ্যে আদর্শিক দ্বন্দ্বের জায়গা খুবই সামান্য, যা স্নায়ুযুদ্ধের সময় অত্যন্ত প্রকট ছিল। বরং অর্থনৈতিক দ্বন্দ্বের বিস্তারই বেশি। ফলে নিওলিবারেলিজম বা নব্য উদারবাদী ব্যবস্থায়, পরাশক্তিদের এই দ্বন্দ্ব মূলত বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের স্বার্থেই সূচনা হয়েছে। অর্থনৈতিক দিক থেকে বিবেচনা করলে এটি একধরনের ‘মার্কেন্টাইল ওয়ার’ বা ‘বেনিয়া যুদ্ধ’।

আধিপত্য বিস্তারের এ প্রতিযোগিতায় চীনের মূল শক্তি এখন পর্যন্ত অর্থনৈতিক অবস্থান। চীনের শক্ত অর্থনীতির কারণেই ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক মন্দার পর থেকে দেশটি অন্য দেশগুলোর কাছে সে ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এ ছাড়া চীন গত দশকে ‘ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স’ বা উন্নয়ন সহায়তার জায়গায় পশ্চিমা দেশগুলোর যে একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল, তা কমাতে সক্ষম হয়েছে। বিশ্বব্যাংকসহ অন্যান্য বহুজাতিক উন্নয়ন সহায়তা প্রদানকারী ব্যাংকগুলোর থেকে বর্তমানে চীনা ‘সফট লোনের’ চাহিদা এখন অনেক বেশি। সহজ শর্ত, সহজলভ্যতা এবং প্যাকেজ ডিলের কারণেই চীনের জন্য এটি অনেকটা সহজ হয়েছে। এর ফলে বিভিন্ন দেশে চীনের প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে। এবং একই সঙ্গে, বিশ্বের নানা প্রান্তে, এই উন্নয়ন সহায়তার সুযোগ নিয়ে কর্তৃত্ববাদেরও প্রসার ঘটছে। অন্যদিকে ব্যয়বহুল মধ্যপ্রাচ্য নীতি এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসন আমল থেকেই দক্ষিণ এশিয়ার মতো ‘পেরিফেরি’ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমতে শুরু করেছে।

এমন অবস্থায়, বাইডেনের লক্ষ্য হলো চীনের প্রভাব বলয় থেকে রাষ্ট্রগুলোকে বের করে এনে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। চীনের অর্থনৈতিক জনপ্রিয়তার বিপরীতে বাইডেন চান ‘গ্লোবাল সাপোর্ট’ বা বৈশ্বিক সমর্থন। যেহেতু আদর্শিক দ্বন্দ্বের জায়গা খুবই সামান্য, তাই বৈশ্বিক সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে বাইডেনকে এগোতে হচ্ছে ‘গণতন্ত্র’ ও ‘মানবাধিকারের’ মতো মূল্যবোধগুলোকে কেন্দ্র করে। তাই বাইডেন একে ‘গণতন্ত্র বনাম কর্তৃত্ববাদ’–এর মোড়কে বাঁধতে চান। কানাডার বামপন্থী বুদ্ধিজীবী ও অধ্যাপক রাধিকা দেশাইয়ের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক এবং সামরিক সক্ষমতা যে হ্রাস পাচ্ছে, তা আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়েছে। আর এ জন্যই ‘সক্ষমতা’ সমস্যাকে কাটিয়ে উঠতে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘গণতন্ত্র’ ও ‘মানবাধিকারের’ মতো মূল্যবোধগুলোকে ‘ব্যবহার’ করতে হচ্ছে।

বাইডেনের নীতি এবং জোট গঠনে এসব মূল্যবোধের ওপর বিশেষ গুরুত্ব প্রদানের মাধ্যমে উল্লিখিত বিষয়সমূহের ব্যবহারিক প্রয়োগ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ফলে গণতান্ত্রিক সম্মেলন এবং আরোপিত নিষেধাজ্ঞাগুলোতে একদিকে যেমন বাইডেন প্রশাসনের দ্বিচারিতা ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থের বিষয়টি স্পষ্ট, অন্যদিকে মূল্যবোধের ব্যবহারের মাধ্যমে চাপ প্রয়োগের যে চেষ্টা তা–ও সহজেই অনুমান করা যায়। এটি মূলত ‘গণতন্ত্র’ ও ‘মানবাধিকারের’ একধরনের ‘ওয়েপনাইজিং’ বা ‘অস্ত্রায়ণ’; যেখানে এসব মূল্যবোধকে শুধুই স্বার্থ হাসিলের তাগিদেই ব্যবহার করা হচ্ছে।

সুতরাং ‘রিয়াল পলিটিকস’ বা ‘স্বার্থবাদী রাজনীতি’র এ জমানায় যুক্তরাষ্ট্রের এই মানবতা মোটেও জনস্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়; বরং নিজস্ব ভূরাজনৈতিক স্বার্থ তথা চীনের বিরুদ্ধে নব্য স্নায়ুযুদ্ধের হাতিয়ার মাত্র। জনস্বার্থে এসব করা হলে যুক্তরাষ্ট্র একক সিদ্ধান্তের প্রতিফলনে ‘পিক অ্যান্ড চুজ’ ও করত না; বরং একটি মাল্টিল্যাটেরাল বা বহুপাক্ষিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগই গ্রহণ করত।

তবে এ কথা বলাই যায়, নব্য এ স্নায়ুযুদ্ধে রাষ্ট্রগুলোকে আজ না হোক কাল তাদের অবস্থান পরিষ্কার করতেই হবে। সেটা হোক যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে বা বিপক্ষে কিংবা নিরপেক্ষ কোনো অবস্থান। যুক্তরাষ্ট্রের এমন ‘হিপোক্রেসি’ বা ‘ভন্ডামি’ নীতিসমূহ রাষ্ট্রগুলোকে কাছে টানার পরিবর্তে আরও দূরে ঠেলে দিচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দ্রুতই মেরুকরণ শুরু হবে, বৃদ্ধি পাবে কর্তৃত্ববাদ। পরিশেষে ‘গণতন্ত্র’ এবং ‘মানবাধিকার’ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন জনস্বার্থে মনোযোগী হওয়া, দ্বিচারিতা বর্জন করা এবং আত্মকেন্দ্রিকতা পরিহার করা, যা বিশ্ব ‘চ্যাম্পিয়ন অব ডেমোক্রেসি’ তথা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আশা করে।

পাঠক থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন