বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সামনের বেঞ্চে বসেছিলাম আমি। আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন সক্রেটিসের নাম আমি শুনেছি কি না। আমি বললাম, স্যার জানি। তাঁকে হেমলক বিষ দিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। স্যার বললেন, কে তাঁকে হত্যা করেছিল? আমি হত্যাকারীর নাম বলতে পারলাম না। স্যার একটু বিস্ময়ের সঙ্গে বললেন, যারা তাঁকে মেরেছিল, তারা খুব শক্তিশালী ছিল। রাজরাজড়া ছিল। তুমি সেই রাজাদের নাম জানো না, অথচ সক্রেটিসের মতো একজন সাধারণ মানুষের পরিচয় তুমি জানো। এর কারণ কী? স্যারের সেদিনের কথা আমাকে চিন্তায় ফেলে দিল। এরপর আমাকে বললেন, জ্ঞান কী বলতে পারো? খুব নার্ভাস ছিলাম। স্যার শুরু করলেন সক্রেটিসের জ্ঞানতত্ত্ব। স্যারের কথাগুলো মন্ত্রের মতো মনে হচ্ছিল। তিনি বললেন, প্রজ্ঞার ব্যূহ সাধন করে দিব্যানুভূতিতে কল্পনাতীতভাবে বিষয়ী চৈতন্যের গভীরতায় আত্মপ্রণিধান ঘটিয়ে থাকেন একজন জ্ঞানী। প্রায় দুই ঘণ্টা স্যার সেদিন আমাদের ক্লাসে ছিলেন। তারপর অনেক ক্লাস পেয়েছি স্যারের। স্যারের মৃত্যুর খবর শোনার পর সেই কথাগুলো খুব মনে পড়ছে। তখন বুঝতে না পারলেও এখন বুঝি, কত বড় মাপের একজন সাহিত্যিককে হারালাম আমরা। বাংলা সাহিত্যে এক বড় শূন্যতার সৃষ্টি হবে, এটা সহজেই অনুমেয়। স্যারের বেশ কয়েকটি সেমিনারে যোগ দেওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে একটি সেমিনার আয়োজন করা হয়েছিল। হাসান স্যার ছিলেন মুখ্য বক্তা। সেদিন তাঁর মুখে উচ্চারিত একটি লাইন আজও আমার মনে পড়ে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার অবস্থা কী—এমন একটি প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন, কৃমি কীটে খাওয়া দগ্ধ লাশের চেহারা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার আর এ ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা দিয়ে প্রকৃত মেধাবী জাতি গঠন সম্ভব নয়।

হাসান স্যার বাংলা সাহিত্যকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন আর সে ব্যাখ্যায় পরে আসি। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি কেমন মানুষ ছিলেন, সে সম্পর্কে কিছু বলতে চাই। যেহেতু স্যারের কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ আমার হয়েছিল, তাই তাঁর ব্যক্তিগত দর্শন, আদর্শ, চিন্তা, আবেগ ও অনুভূতি সম্পর্কে জানার কিছুটা সুযোগ হয়েছিল। হাসান স্যার অসাম্প্রদায়িক চেতনায় গভীরভাবে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাস করতেন। উগ্রবাদ ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান ছিল পরিষ্কার। তিনি উদার গণতান্ত্রিক ধারায় বিশ্বাস করতেন। জঙ্গিবাদসহ নানা ইস্যুতে তিনি কলম ধরেছেন এবং একটি সুষ্ঠু ও আদর্শ সমাজ নির্মাণে কী কী করণীয়, তা জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি ছিলেন দর্শনের একজন বড় মাপের অধ্যাপক। কাল মার্ক্সর দর্শনের প্রতি হাসান স্যারের এক ভিন্ন ধরনের দুর্বলতা ছিল। সাম্যবাদ মনেপ্রাণে ধারণ করতেন। তিনি ছিলেন একাধারে দার্শনিক, কথাসাহিত্যিক, ছোটগল্পকার, চিন্তাবিদ, শিক্ষাবিদ ও অধ্যাপক। লেখকদের প্রধান অবদান তাঁর সৃষ্টিকর্ম। তাঁর শিখরস্পর্শী রচনার উৎকর্ষ নিয়ে কারও কোনো মতপার্থক্য নেই। তাঁর জীবনসম্পৃক্ত লেখাগুলো তাঁকে বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য স্থান করে দিয়েছে। তিনি ছিলেন এমন একজন প্রগতিশীল লেখক, যিনি কখনোই তাঁর নিজের রাজনৈতিক দর্শন ও বিশ্বাসকে গোপন করেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন যে শিল্প-সাহিত্য কখনোই গণ্ডিবদ্ধ করা যায় না। এগুলো সব সময় তত্ত্বের গণ্ডি পেরিয়ে যায়। হাসান স্যারের অবদান শুধু লেখালেখিতে সীমাবদ্ধ ছিল না; নানাবিধ প্রগতিশীল ও গণবান্ধব কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। গণতান্ত্রিক সব আন্দোলনে তাঁর অংশগ্রহণ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। আদিবাসী অধিকার আন্দোলন এবং দুর্নীতিবিরোধী বিভিন্ন আন্দোলনে তাঁর অংশগ্রহণ ছিল নেতৃত্ব ও তাত্ত্বিক পর্যায়ে। অসংখ্য তরুণের মানসিক আশ্রয় ছিলেন তিনি। বটবৃক্ষের মতো এই মহান শিক্ষক ও লেখক সব সময় সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন, কলম ধরেছেন নানা প্রতিকূলতাকে মোকাবিলা করে। উচিত ও ন্যায় কথা বলতেন স্বভাবজাত ভঙ্গিতে। তিনি তরুণদের সব সময় বোঝাতেন, কোনো সমস্যাকে মোকাবিলা করতে হয় বুদ্ধি, প্রজ্ঞা, সাহস আর কৌশল দিয়ে। মার্ক্সবাদী দর্শনে বিশ্বাসী এই সাহিত্যিক মনে করতেন, জীবন একটি যুদ্ধক্ষেত্র, যেখানে চোখ বুজে সময় কাটানোর সুযোগ নেই। তিনি সক্রেটিস ও কাল মার্ক্সের দ্বান্দ্বিক তত্ত্বে বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর সামনের মানুষটি তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সেই মানুষকে তিনি সক্রেটীয় পদ্ধতিতে অনেক প্রশ্ন করতেন, তবে কখনোই বিব্রত করতেন না। সক্রেটিস তাঁর সামনে থাকা মানুষগুলোকে প্রশ্ন করতেন এবং তাদের ভেতরের অন্তঃসারশূন্যতাকে বের করে আনতেন। হাসান স্যার ঠিক তেমনই ছিলেন, যিনি দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিতে প্রকৃত সত্য তুলে আনতেন। মনের কথাগুলোকে জীবন্ত করে ফুটিয়ে তুলতে পারতেন তিনি। বাক্পটু ছিলেন আমাদের হাসান স্যার। সমাজের ক্ষতগুলোকে নান্দনিক, শৈল্পিক আর প্রতীকী ভাবধারায় ফুটিয়ে তুলতে পারতেন, যা খুব কম লেখকের মধ্যে দেখা যায়। ব্যক্তিগত কারিশমা অর্জন করেছিলেন এই দার্শনিক। তাঁর স্বভাবসুলভ বাচনভঙ্গি, সদাপ্রসন্নতা, অবিচলচিত্ত, মানবতাবোধ, উন্নত সংস্কৃতি ও শুদ্ধতা তাঁকে মহীয়ান করেছিল। ভোগবাদী সমাজব্যবস্থাকে অপছন্দ করতেন তিনি। নিজেকে মুক্ত রাখতে পেরেছিলেন ভোগের দাসত্ব থেকে। তিনি সক্রেটিসের ‘নিজেকে জানো’ তত্ত্বটি মনেপ্রাণে ধারণ করতেন। তিনি মনে করতেন, প্রত্যেক মানুষের উচিত নিজের ভেতরটা খোঁড়াখুঁড়ি করা, ভেতরে যা কিছু আছে, তার সবটাই বুদ্ধি ও যুক্তির পরিষ্কার আলোয় মেলে ধরা। হাসান স্যারের লেখনীর মূল ক্ষেত্র ছিল মানুষ। মানবতাবাদ, ধর্ম, নৈতিকতা, জ্ঞান—এসবই ছিল তাঁর আলোচনা আর অনুসন্ধানের বিষয়। হাসান স্যার আমাদের শেখাতেন যে সমাজের প্রতিটি স্তর এক গভীরতম অসুখে আক্রান্ত। সমাজের একজন হিসেবে এর নিদান খুঁজে বের করতে হবে। বিরতি দিলে চলবে না।

হাসান স্যার এমন একজন লেখক ছিলেন, যিনি কখনোই পুরস্কারের আশায় লিখতেন না। তবু তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক, স্বাধীনতা পুরস্কার, সাহিত্যরত্নসহ নানা সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। তিনি ২০০৪ সালে অবসর নেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ারে ছিলেন ২০০৯ সালে। মহান এই শিক্ষক ২০১২ সালে আসাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এবং ২০১৮ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডি-লিট ডিগ্রি পান। এ ছাড়া বহু পুরস্কার তিনি পেয়েছেন। তাঁর চলে যাওয়া বাংলা সাহিত্যের এক অপূরণীয় ক্ষতি। এত বড় সাহিত্যিক হয়েও তিনি সাদামাটা জীবনে অভ্যস্ত ছিলেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি প্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং পাকিস্তানি সেনাদের হাতে তাঁকে নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছিল।

১৯৬০-এর দশকে লেখালেখি শুরু করলেও প্রথম উপন্যাস লেখেন ২০০৬ সালে। সেই উপন্যাসের পটভূমি অবিভক্ত বঙ্গের রাঢ় অঞ্চল। এক বড় কালপর্বকে ধরে রেখেছে এই উপন্যাস, যেখানে মহামারি, অনাহার, সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও দেশভাগের বিন্দুগুলো স্পর্শ করে আখ্যান এগিয়েছে ভিন্নতর ধারায়। এ উপন্যাসের জন্যই ২০০৮ সালে আনন্দ পুরস্কার প্রদান করা হয় তাঁকে। ব্যক্তি, সমাজ, পরিবার, রাষ্ট্র প্রভৃতির সংকট, শিক্ষার দৈন্যদশা, মূল্যবোধের অবক্ষয়, চিকিৎসাব্যবস্থার অপ্রতুলতা, মানুষের অনুভবশক্তি, দুর্নীতি, অপসংস্কৃতি, অপরাজনীতি, মূল্যবোধহীন সমাজকাঠামো, অমানবিক স্বৈরতন্ত্রসহ নানাবিধ সমস্যা ও বিষয় সূক্ষ্ম সুতায় বুননে একজন দক্ষ কারিগর ছিলেন তিনি। ঔপন্যাসিক ও ছোটগল্পকার হিসেবে বাংলা সাহিত্যে এক বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছেন তিনি।
হাসান আজিজুল হকের ‘আগুনপাখি’ সৃষ্টিকর্মটি এক অনন্য চরিত্রে সমুজ্জ্বল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও রুশ বিপ্লবপরবর্তী সময়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও ফ্যাসিবাদ, ভারত বিভক্তি ও স্বাধীনতা আন্দোলন, ১৯৪৩–এর দুর্ভিক্ষ, ভয়ংকর ধর্মীয় দাঙ্গা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে তৈরি হয়েছে এর কাহিনি। হাসান আজিজুল হক সমকালীন জীবনের নানান জটিলতাকে আক্ষরিক শব্দচয়নে যেভাবে শৈল্পিক রূপদানে সক্ষম ছিলেন, তা অন্যান্য লেখকের লেখায় কম চোখে পড়ে। তিনি এমন একজন লেখক, যাঁর গণ্ডি শুধু দেশেই সীমাবদ্ধ ছিল না, দেশের সীমানা পেরিয়ে তাঁর পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে বহির্বিশ্বে। হিন্দি, উর্দু, রুশ, চেক প্রভৃতি ভাষায় অনূদিত হয়েছে তাঁর সৃষ্টিকর্ম। তাঁর কথাসাহিত্য ‘আগুনপাখি’ ইংরেজি ভাষায় রূপান্তরিত হয়েছে। প্রান্তিক মানুষের জীবনধারা, ব্যক্তিমনের সুপ্ত অনুভূতি, ধর্মীয় উগ্রবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, ফ্যাসিবাদ, রাজনীতির সংকট, বিপন্ন মানবতা ইত্যাদি বিষয়কে নিখুঁত কলমের আঁচড়ে এমনভাবে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন, যা পাঠকহৃদয়ে আলোড়ন তুলতে সক্ষম হয়েছে। গণতন্ত্র, সামাজিক বৈষম্য, সংবিধান, জাতিসত্তার বিকাশে নানা প্রতিবন্ধকতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে এক দার্শনিক পর্যবেক্ষণের প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর লেখায়।

হাসান আজিজুল হক নেই। তবে তাঁর সৃষ্টিকর্ম তাঁকে অমর করে রাখবে। ধ্রুপদি সাহিত্য নির্মাণের একজন দক্ষ কারিগরকে আমরা হারিয়েছি। কিন্তু সৃষ্টিগুণে তিনি যুগের পর যুগ অন্ধকার গগনের শুকতারা হয়ে বেঁচে থাকবেন।

*লেখক: মাজহার মান্নান, সহকারী অধ্যাপক, বি এ এফ শাহীন কলেজ কুর্মিটোলা, ঢাকা সেনানিবাস।

পাঠক থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন