বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

‘টেলকী গ্রামের একমাত্র মাংরুদামে শান্তিতে ঘুমিয়ে আছেন আমাদের চৌদ্দপুরুষ। আমারও বয়স হয়েছে, আমিও মরে যাব। আমার কবরের জায়গা কই, কবরের জায়গাটুকু কি আমরা পাব না? আমার নতুন প্রজন্মের কাছে আমার কবরের অস্তিত্ব বলে কিছু থাকবে না। হয়তো আদিবাসী নতুন প্রজন্মের অস্তিত্ব বলে কিছু থাকবে না তারও পরের প্রজন্মের কাছে। যেখানে আদিবাসীরা তাঁরা তাঁদের মাংরুদাম কিংবা কবরের জায়গাটুকু পান না, সেখানে আমার আশ্রয়ের অস্তিত্ব কতটুকু নিরাপদ? এমনিতেই উচ্ছেদ আর মামলার আতঙ্কে দিন কাটে আমাদের। তাই প্রধানমন্ত্রীর কাছে এ দেশের একজন নাগরিক হিসেবে আমার সবিনয় আবেদন, আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের জাতিসত্তার অস্তিত্ব মিশে আছে যে মাটিতে, সে মাটি আমাদের কাছে খাঁটি ও পবিত্র।

‘বৈশাখ–জ্যৈষ্ঠ শেষে প্রকৃতিতে চলছে শ্রাবণমেঘের খেলা। রাজ্যের অভিমান নিয়ে আকাশে মেঘগুলো ঝুলে আছে চুনিয়ার প্রতিটা উঠানের চারপাশে লাগানো নুয়ে পড়া জবা ফুলের মতো। আকাশ বড্ড অভিমানী, কখনো বুঝি বিষে নীল, আবার কখনো–বা হু হু করে কেঁদে বুক ভাসায়। এখানেও কাঁদে পাহাড়, গাছপালা, পাখি, মাটি, নদী ও খাল-বিল। সেই কবে প্রয়াত কবি রফিক আজাদ লিখেছিলেন, ‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’। কবির দীর্ঘ সময় কাটে মধুপুরের টেলকীর চুনিয়া গ্রামে। চুনিয়া নিজেই যেন অপরূপ সৌন্দর্য নিয়ে বেঁচে আছে এখনো। সত্যিই এ জন্য এক বনবাসী বেদনার নিদারুণ আর্কেডিয়া।’

এতক্ষণ ভারাক্রান্ত হৃদয়ের বেদনা ভরা আকুতিগুলো জানাচ্ছিলেন চুনিয়া গ্রাম, মানে টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার অরণখোলা ইউনিয়নের টেলকী নামের গ্রামের ষাটোর্ধ্ব আদিবাসী নারী সুপ্তি চিরান।

মধুপুর উপজেলার অরণখোলা ইউনিয়নের টেলকী গ্রামের বন বিভাগ আদিবাসী গারোদের প্রায় ১৫০ বছরের প্রাচীন শ্মশানে গড়ে তুলছে বন বিভাগের আরবোরেটাম বা স্থানীয় গাছের বিভিন্ন প্রজাতির সংগ্রহশালা। মধুপুরের সেই গহিন অরণ্য হয়তো এখন আর তেমন চোখে পড়ে না। একসময় মধুপুর বনে যেখানে ছিল গহিন পাতাঝড়া শালবন, সেখানে তথাকথিত সামাজিক বনায়নের নামে বন বিভাগ গড়ে তোলে প্রাকৃতিক বন, যার বেশির ভাগ স্থানীয় প্রভাবশালীরা দখলে নিয়েছেন বারবার। যেটুকু শালবনের অস্তিত্ব এখনো টিকে আছে, তা–ও প্রায় বিলীনের পথে। তাই বনবিনাশ রুখতে আর নিজেদের ভূমি অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে বারবার আদিবাসী সমাজ ফুঁসে উঠেছে যদিও শেষ রক্ষাটা সব সময় তাদের হয়ে ওঠেনি। এবারও টেলকী গ্রামের আদিবাসীদের চৌদ্দপুরুষের অস্তিত্বসংকটে গ্রামের ১৫০ বছরের পুরোনো শ্মশানের জায়গা রক্ষায় বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে আদিবাসী সমাজ।

default-image

ইকোটুরিজম উন্নয়নের নামে শাল–গজারিগাছ কেটে গেস্ট হাউস ও সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের প্রতিবাদে গত ৩০ মে মধুপুর টেলকী বাজারে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিলের ডাক দেয় মধুপুরের বিক্ষিপ্ত আদিবাসী ছাত্রসমাজ।

অরণখোলা ইউনিয়নের টেলকী, জলই, গায়রা, রাজবাড়ী গ্রামের স্থানীয় আদিবাসীদের কাছ থেকে জানা যায়, মধুপুরের এই ঐতিহাসিক অঞ্চল স্মরণাতীত কাল থেকেই গারো কোচ বর্মণ আদিবাসীরা হাজার বছর ধরে বংশানুক্রমে বসবাস করে আসছে। বন বিভাগ গঠন হওয়ার আগে আদিবাসীদের এই মধুপুর গড় অঞ্চলে বসবাস তৎকালীন ব্রিটিশ শাসনামল পেরিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার দীর্ঘ ৫০ বছরেও এখানে আদিবাসীদের ভূমির মালিকানা সমস্যা দূর হয়নি। বিভিন্ন সরকারের আমলেও বন বিভাগ নানা অপরিকল্পিত ও পরিবেশ আগ্রাসী প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই ঐতিহ্যবাহী মধুপুর গড় অঞ্চলের প্রাকৃতিক শালবনকে সংকুচিত ও চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। ফলে আদিবাসীদের জীবন–জীবিকায় পড়েছে বিরূপ প্রভাব। তারা এখন নানা সমস্যায় জর্জরিত।

আদিবাসী সমাজের অভিযোগ, বন বিভাগ সব সময় বনবিনাশের দায় ঠেলে দিয়েছে আদিবাসীদের ওপর। এর জন্য মামলা–হামলাসহ নানা হয়রানির শিকার হতে হয়েছে তাদের। তাই ভূমির অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে বন বিভাগের কার্যক্রমে স্থানীয় আদিবাসী সমাজ সব সময় প্রতিবাদ জানিয়ে এসেছে।

টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলায় ২০০০ সালে বন বিভাগ পরিকল্পনা করে ইকোপার্ক নির্মাণের। বিশ্বব্যাংক ও এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংক অর্থায়নের আশ্বাস দিলে মধুপুর বনে ইকোপার্ক বানানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জানা যায়, ইকোপার্কে গড়ে তোলা হবে ১০ পিকনিক স্পট ও ৬টি ব্যারাক। অথচ যুগের পর যুগ ধরে মধুপুর বনাঞ্চলে বসবাস করে আসা আদিবাসী গোষ্ঠীরা কিছুই জানত না এ বিষয়ে, জানানোর প্রয়োজনও মনে করেনি বন বিভাগ। তাই দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় আদিবাসীরা নামে আন্দোলনে, ভূমির অধিকার আদায়ের আন্দোলনে তখন নেতা ছিলেন টকবগে যুবক পীরেন স্নান। ২০০৪ সালের ৩ জানুয়ারিতে নিজেদের ভূমির ন্যায্য অধিকার রক্ষার্থে আন্দোলনে নামলে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীকে দমন করতে গুলি চালায় বনরক্ষীরা। বনরক্ষীদের গুলিতে নিহত হন পীরেন স্নান। আহত হন অনেক আদিবাসী নেতা। আজও বিচার হয়নি পীরেন স্নানের, এর পরপরই আদিবাসীদের কোনঠাসা করতে জড়ানো হতে থাকে শত শত মামলায়।

অপর দিকে গারোরাসহ আদিবাসী সমাজ ইকোপার্কের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। প্রাকৃতিক শালবন ধ্বংসের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ গড়ে তোলে বন বিভাগের বিরুদ্ধে, তখন আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন চলেশ রিছিল নামের এক দুঃসাহসী যুবক। জলছত্র, কাঁকড়াগনি, বেদুরিয়া, জয়নাগাছাসহ বিভিন্ন এলাকার আদিবাসীদের আশা-ভরসার আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেন তিনি। আন্দোলন সংগঠিত করে মধুপুরের আদিবাসীদের মনে আশার সঞ্চার করতে পেরেছিলেন তিনি। এ মাটিতে কাঠচোর বন বিভাগই একক ও শেষ কর্তৃত্বের অধিকারী নয়, বরং বনের ওপর আদিবাসীদেরই প্রধান অধিকার। শতসহস্র বছরের উত্তরাধিকার সূত্রে সেখানে বনজ সম্পদের ওপর তাদেরই প্রধান কর্তৃত্ব থাকা উচিত।

ফলে চলেশ রিছিল বনভূমি উজাড়ে প্রধান হুমকি বলে বিবেচিত হতে থাকেন। পরবর্তীকালে একসময় ওয়ান ইলেভেনের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে তিনি ভীতিকর হয়ে উঠেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৭ সালের ১৮ মার্চ ইকোপার্ক প্রতিরোধ আন্দোলনের নেতা চলেশ রিছিলকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারপর তাঁকে সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে বিনা বিচারে মেরে ফেলা হয়।
মধুপুর উপজেলায় মোট ১১টি ইউনিয়ন মধ্যে গোলাবাড়ী, আলোকদিয়া, আউশনারা, অরণখোলা, শোলাকুড়ী, মহিষমারা, ফুলবাগচালা, বেরীবাইদ ইউনিয়নে আদিবাসী ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষের বসবাস বেশি।

সম্প্রতী মধুপুর বনাঞ্চলের জয়েনশাহী গড়ের অরণখোলা মৌজার ৯১৪৫.০৭ একর ভূমি বন বিভাগ সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘোষণা করায় উচ্ছেদ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে কমপক্ষে ২৩ হাজার আদিবাসী গারোসহ ৩ হাজার কোচ বর্মণ সম্প্রদায়। বন বিভাগের মধুপুর ইকোটুরিজম মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের নামে বিনোদনকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা করলে আন্দোলনে নামেন আদিবাসী নেতারা। অন্যদিকে বনরক্ষার নামে দিন দিন কঠোর হচ্ছে সংশ্লিষ্ট বন বিভাগ, এমন দাবি আদিবাসীদের। এ ছাড়া প্রভাবশালীদের কাছেই জিম্মি তথাকথিত সামাজিক বনায়ন, কাগজে–কলমে আদিবাসীদের নাম থাকলেও বাস্তবে সামাজিক বনায়নের দোরগোরায় নেই আদিবাসী এই ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীরা।

২০১৯ সালে গৃহীত প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে আবারও প্রাকৃতিক শালবনে শতবর্ষী লতাগুল্ম–জাতীয় বৃক্ষ, ঔষধি গাছ কেটে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করা হচ্ছে। শালবনের গাছের নিচে তথাকথিত ফলদ গাছ লাগানোর পরিকল্পনা হাতে নেওয়ায় মধুপুর বনের অবশিষ্ট প্রাকৃতিক শালবন ধ্বংস হচ্ছে দিন দিন। অন্যদিকে বর্তমান বাস্তবতা (১ জুলাই ২০১৮ সাল থেকে ২০২১ সালের ৩০ জুন) পর্যন্ত গৃহীত ‘স্থানীয় জাতিগোষ্ঠী জনগণের সহায়তায় মধুপুর জাতীয় উদ্যানে ইকোটুরিজম উন্নয়ন ও টেকসই ব্যবস্থাপনা প্রকল্প’ বিষয়ে স্থানীয় আদিবাসীদের পক্ষ থেকে আপত্তি জানিয়ে আসছিল তারা। তাদের আপত্তির মূল বিষয়গুলো ছিল প্রকল্পের শিরোনামে স্থানীয় জাতিগোষ্ঠী জনগণের সহায়তার কথা উল্লেখ করা হলেও স্থানীয় আদিবাসী কোনো সুস্পষ্ট প্রকল্প বিষয়ে অবহিত ও পরিপূর্ণ কোনো আলোচনা না করেই এ প্রকল্পের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বন বিভাগ।

এ ছাড়া বর্তমানে টেলকী গ্রামে বন বিভাগের গাছপালা সংগ্রহশালা বা আরবোরেটাম নামের গবেষণাগার স্থাপনের জন্য আদিবাসীদের চৌদ্দপুরুষের বিদ্যমান প্রাচীন তথা সামাজিক কবরস্থান শ্মশানের জায়গায় কোনো ধরনের প্রাচীর নির্মাণ না করার দাবি জানিয়ে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে আদিবাসীরা। সম্প্রতি এ ধরনের বিভিন্ন দাবিসংবলিত একটি স্বারকলিপি বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কাছে পাঠিয়েছেন বলে জানান ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নেতারা।

স্মারকলিপিতে আদিবাসীদের সামাজিক কবরস্থান বা মাংরুদামে (শ্মশান) বন বিভাগের আরবোরেটাম বাগান নির্মাণ এবং প্রায় তিন হেক্টর এলাকায় শাল–গজারিগাছ কেটে তথাকথিত শিমুল, ফুলগাছ লাগিয়ে প্রাচীর নির্মাণের বিরোধিতা করে স্থানীয় লোকজন এই স্মারকলিপি প্রদান করেন বলে জানা গেছে।

মধুপুরের টেলকী গ্রামে বন বিভাগের পরিকল্পিত উদ্ভিদ সংরক্ষণ উদ্যান স্থাপন ও স্থানীয় আদিবাসীদের পূর্বপুরুষদের বিদ্যমান প্রাচীন সামাজিক কবরস্থান শ্মশানের স্থানে বহিরাগত ব্যক্তিদের অনুপ্রবেশ বন্ধ ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়াই এর মূল উদ্দেশ্য বলে দাবি করছেন সচেতন মহলের আদিবাসী নেতারা।
জানা যায়, তৎকালীন পাকিস্তান সরকার মধুপুর গড় অঞ্চলের আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে ১৯৫৫-৫৬ সালে সংরক্ষিত বন ঘোষণা ও পরবর্তীকালে ১৯৬২ সালে মধুপুর বনকে ন্যাশনাল পার্ক ঘোষণার মধ্য দিয়ে যে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল, সেই ধারাবাহিকতা বর্তমান সময়ে অব্যাহত রয়েছে। এ সমস্যার সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ এখনো পর্যন্ত কোনো আমলে নেওয়া হয়নি।

default-image

মধুপুর উপজেলার অরণখোলা ইউনিয়নের টেলকী গ্রামে আদিবাসীদের ১৫০ বছরের পুরোনো শ্মশানে বন বিভাগের আরবোরেটাম তৈরির জন্য যে প্রাচীর নির্মাণ হচ্ছে, সে বিষয়ে টাঙ্গাইলের সহকারী বন সংরক্ষক জামাল হোসেন তালুকদার বলেন, ‘আমাদের কৃষিমন্ত্রী মহোদয় ২০১৯ সালে একটি প্রকল্প আনেন, যার আলোকে আমরা স্থানীয় যে বৃক্ষগুলো রয়েছে, তার সমন্বয়ে একটি বাগান করে গবেষণাগার স্থাপন করতে চাই। আর সে গবেষণাগারের ওই জমিতে বাউন্ডারি করা হচ্ছে। এই জমিতে কখনো কোনো সময় আদিবাসীদের শ্মশান ছিল না। তারা মিথ্যা কথা বলছে। বরং বন বিভাগের সঙ্গে তারা গায়ে পড়ে ঝগড়া করছে। আসল কথা হলো আমরা বাউন্ডারি না করলেই তাদের জমি দখল করে ফসল করতে সুবিধা হয়।’

সরেজমিনে টাঙ্গাইলের মধুপুরে নির্মাণাধীন আরবোরেটাম এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, স্থাপন করা আছে আদিবাসীদের মৃতদের স্মরণে স্থাপন করা ‘খিম্মা’ (মৃত ব্যক্তির স্মরণে তৈরি স্মৃতিস্তম্ভ), গবেষণার জন্য শাল–গজারিগাছ কেটে লাগানো হয়েছে ফুলগাছ, শিমুলগাছসহ বেশ কয়েক প্রজাতির ফলদ বৃক্ষ। এ ছাড়া অরণখোলা ইউনিয়নের টেলকী, জলই, গায়রা, রাজবাড়ী গ্রামের বনাঞ্চল ঘুরে চোখে পড়ে বন বিভাগের হাতে গড়াঞ্চল বিনাশের ভয়াল চিত্র। নির্বিচারে কাটা হচ্ছে বনাঞ্চল ও গড়াঞ্চলের ঝোপঝাড়, শতবর্ষী পুরোনো লতাগুল্মগাছ এবং ধ্বংস করা হচ্ছে মহামূল্যবান ঔষধি বৃক্ষ। কারণ, এই শালগাছের নিচে লাগানো হবে ফলদ গাছ। টেলকীসহ আশপাশের গ্রামের হাজারো আদিবাসীকে চিকিৎসা নিতে যেতে হয় কমপক্ষে সাত কিলোমিটার দূরে জলছত্র এলাকা কমিউনিটি ক্লিনিকে। তাই ছোটখাটো রোগ–শোকে বনাঞ্চলের এই মূল্যবান ঔষধি বৃক্ষগুলো ছিল তাদের চিকিৎসার একমাত্র ভরসা। বনাঞ্চলে থাকার জন্য আদর্শ স্থান কমে যাওয়ায় বনের শিয়াল, কালোমুখো হনুমান, বানরসহ জীবজন্তুগুলো নেমে আসছে রাস্তায়। হানা দিচ্ছে স্থানীয় লোকজনের আবাদি ফসলের জমিতে।

আদিবাসীদের ভূমি অধিকার আন্দোলন-সংগ্রাম নিয়ে কাজ করা তরুণ নেতা গারো স্টুডেন্ট ফেডারেশনের (জিএসএফ) কেন্দ্রীয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক লিয়াং রিছিল বলেন, ‘ব্রিটিশ শাসনামল, পাকিস্তান শাসনামল পেরিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার দীর্ঘ ৫০ বছরেও মধুপুর গড়াঞ্চলের আদিবাসীদের ভূমির মালিকানা ও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। উপরন্তু বিভিন্ন সরকারের সময় জাতীয় উদ্যান, ইকোপার্ক, ইকোটুরিজম, ফায়ারিং রেঞ্জ ও সংরক্ষিত বনভূমি ঘোষণার নামে আদিবাসীদের নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদের নীলনকশা করেছে। বিভিন্ন সময় সরকারের বন বিভাগ অপরিকল্পিত, পরিবেশ আগ্রাসী ও বন বিনাশী প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। টেলকী গ্রামে তথাকথিত আরবোরেটামের নামে আদিবাসীদের শ্মশানের স্থানে প্রাচীর নির্মাণ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য স্থাপনাসহ প্রকল্প বাস্তবায়ন অবিলম্বে বন্ধ করা, আদিবাসীদের স্বত্বদখলীয় কৃষি ও ফসলি জমিতে কোনো ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন না করা, জাতীয় উদ্যান ও সংরক্ষিত বনভূমি ঘোষণা বাতিল করে আদিবাসী উচ্ছেদ বন্ধ করা এবং আদিবাসী প্রথাগত ভূমি অধিকারের স্বীকৃতি প্রদান ও সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠন করার জোর দাবি জানাচ্ছি আমারা সরকারের কাছে।’

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, শত শত বছর ধরে বৃক্ষের পূজা–অর্চনায় বেড়ে উঠেছে যে জাতিসত্তার মানুষ, তারাই রয়েছে আজ অস্তিত্বসংকটে। বনে আর জায়গা হচ্ছে না বনবাসী এই মানুষদের। বনের বহু জায়গা বেদখল হচ্ছে প্রভাবশালীদের হাতে, নির্বিচারে কাটা হচ্ছে বনের বৃক্ষ, আর গড়ে উঠছে প্রভাবশালীদের ইমারত–কলকারখানা, অথচ যার মাশুলও গুনতে হচ্ছে এসব বনবসী মানুষদের নানা মামলা–হামলার শিকার হয়ে। তাই আজকের বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আলোচনা হওয়া দরকার বনবাসী মানুষদের নিয়ে। কেননা, আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীদের টিকিয়ে রাখলেই বাঁচবে বনাঞ্চল, আর বনভূমিই পারে একমাত্র পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে একটি দূষণমুক্ত বাসযোগ্য পৃথিবী উপহার দিতে।
*লেখক: ইমতিয়াজ আহমেদ

পাঠক কথা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন